২৬ মার্চ ১৯৭১। স্বাধীনতা দিবস; ৫৪ বছর পূর্ণ হলো স্বাধীনতার। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত জাতীয় দিবস। বিশ্বের বুকে লাল সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন। এ দিনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় দখলদার বাহিনী। গণহত্যার শিকার পূর্ব বাংলার জনগণ গড়ে তোলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়ের লাল সূর্য। আমরা স্বাধীন হলাম। পেলাম স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ও অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণমুখী, মানবিক, প্রগতিশীল স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা, শোষণ, বৈষম্য, অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ২০২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সূত্রপাত হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। এখনই সময় নতুন অঙ্গীকারের পথে হাঁটার। তাই মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন হোক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।
সূচনালগ্নে বাংলাদেশের সম্পদের প্রাচুর্য তেমন ছিল না। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের পুঁজিপতি ও শোষক শ্রেণী দেশ থেকে সম্পদ পাচার করেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। উপরন্তু যুদ্ধকালীন এক ধরনের ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছে যায় দেশ। সে অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। এরপর পেরিয়েছে ৫৪ বছর। ২০২৪ সালে এসে আমাদের বলার মতো অনেক অর্জন, সফলতা ও উন্নয়নের গল্প রয়েছে। কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, যে বৈষম্যহীন ও সমঅধিকারের রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় দেশ মুক্ত হলো আজও তা অপূরণীয় রয়ে গেছে। এখানে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাও বারবার ব্যাহত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিশেষত সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে। আইন-শৃঙ্খলার স্থান দখল করেছে দলীয় শাসন, অপশাসন ও অনিয়ম-দুর্নীতি যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রের সর্বত্র। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাভোগী হয়েছে মুষ্টিমেয় ধনকুবের। এর সুবিধার ন্যায্য ও সুষম বণ্টন হয়নি। টানাপড়েনের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক কষ্টে দিনযাপন করছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এ স্বাধীনতা দিবসে অঙ্গীকার হোক মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যানুসারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন। মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। বাকি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার থাকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট চাকরির প্রতি ঝোঁক এবং কৃষি বা শিল্প খাতে কিংবা স্ব-উদ্যোগে কাজ করার অনীহা ও দক্ষতাহীনতা শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে।
এদিকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান বাড়েনি। বিবিএসের হিসাবে, এক দশক ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বিনিয়োগ ২২-২৩ শতাংশেই আটকে আছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে বিদেশী সহায়তা বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়। অথচ চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বৈদেশিক ঋণের নতুন প্রতিশ্রুতি কমে গেছে। দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬৮ শতাংশ। কমে গেছে অর্থছাড়ও। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশের উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের নতুন প্রতিশ্রুতি আশানুরূপ হবে না। নির্বাচিত সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করেই মূলত বিদেশীরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করেন। আর নতুন প্রকল্প তৈরি করা না গেলে বিদেশী প্রতিশ্রুতি মেলে না। দাতারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পরবর্তী কোন সরকার আসবে, তাদের নীতি কেমন হবে—এসব দেখে হয়তো তারা সহায়তা করবে। এখনো সামাজিক অস্থিরতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী বিনিয়োগ বা অর্থায়ন কম হয়।
এছাড়া দেশে রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যাদের রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এসব ব্যবসায়ী দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে এবং পাচার করেছে বিপুল অংকের অর্থ। লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তীব্র হয়েছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের মতো ঘটনায় অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বোনাস ও বকেয়া বেতনের দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দেখা দিয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ। কিছু কিছু কারখানায় যথাসময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করায় শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে। বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের মতোও ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্তরায়। আর কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনই টেকসই হয় না।
অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনমন হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব ক্রমেই প্রকট হয়েছে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধ সমাজে বেড়েছে। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প করা হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনমান এখনো উন্নত হয়নি। বরং চলমান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী। প্রতিদিন সড়কে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অবৈধ ভবনে আগুনে মানুষ পুড়ছে। উচ্চ মূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ হারাচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস হারিয়েছে দেশের চিকিৎসা খাতের ওপর। চিকিৎসা নিয়ে বেড়েছে মানুষের ভোগান্তি। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে দরকার মেধাভিত্তিক, শোষণহীন ও বৈষম্যহীন সমাজ কাঠামো। তাহলেই দেশের মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে এ প্রত্যয় জাগ্রত হোক—এটিই প্রত্যাশা।