অর্থনীতি-ভাবনা

নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতির বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের রাজনৈতিক জোটের অংশীজনরা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের রাজনৈতিক জোটের অংশীজনরা। এটা অনস্বীকার্য যে একটি নাজুক অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়েই দায়িত্ব শুরু করতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থনীতির অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে সরকারকে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে আর্থিক খাতের সংস্কার, বিভিন্ন খাতে উৎপাদন বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় পর্যায়ক্রমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ এ মুহূর্তে দেশে কর্মসংস্থান নেই, বিধায় বেকারত্ব বাড়ছে। বিনিয়োগে খরা, বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতিহীনতা, দেশী-বিদেশী ঋণের দায় পরিশোধে সক্ষমতা কমার ফলে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেরও গতি কম। বাণিজ্যের গতি কম হওয়ায় রফতানি আয় নেতিবাচক এবং এতে মূল্যস্ফীতিও কমছে না। দেশের অর্থনীতিতে এসব চ্যালেঞ্জ থাকায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে। দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপূর্ণ চিত্র পাওয়ার জন্য আমরা পরিসংখ্যানগত প্রাক্কলন করতে পারি। কিন্তু সেগুলো বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমনটি বলা যাচ্ছে না।

আমরা দেখেছি, গত কয়েক বছর দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে নাজুক হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুমান করা যায়, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাতারাতি দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। দীর্ঘমেয়াদে শিল্প-কারখানায় গতি ফিরতে সময় প্রয়োজন। আবার রাজস্ব খাতে ক্রমবর্ধমান অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ায় বাড়তি অর্থ সংগ্রহ কিংবা জনকল্যাণমূলক নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজটি সরকারের জন্য কঠিন হবে। এটি স্পষ্ট, অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট দূর না হলে রাজস্ব আদায় ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে না। অর্থনীতির স্থবিরতা দূর করার স্বার্থেই বেসরকারি খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে বেকারত্ব কমবে এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা নেয়া সহজ হবে। এ মুহূর্তে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর প্রায় সবই নিম্নগামী। এক্ষেত্রে সরকারকেই সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিতে ধাপে ধাপে গতি বাড়ানোর কাজ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনাও রয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি (সাময়িক) ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর সাময়িকভাবে দেশের অর্থনীতিতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’-এর জানুয়ারি সংস্করণের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। তবে অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেড় বছর পর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেয়ার যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে। এর কারণগুলো চিহ্নিত করে দেখা জরুরি।

দেশে প্রতি বছর শ্রমবাজারে অন্তত ৩০ লাখ নতুন মানুষ অন্তর্ভুক্ত হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের গুণগত মান কমায় শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটটি বাড়ছে। অদক্ষ ও অপুষ্টিতে ভোগা বেকারদের ভারে ন্যুব্জ হচ্ছে অর্থনীতি। বেশকিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নানা কারণে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। নতুন করে অনেকে বেকার হওয়ায় অর্থনীতির ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। সংশোধিত শ্রম আইনের কারণে ব্যবসার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের শিল্প খাতে মোটাদাগে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ে খরচ বেড়েছে। অথচ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৬ শতাংশে আটকে আছে। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দূরত্বও বেড়েছে। বাণিজ্যের পরিবেশের মানোন্নয়নের জন্য আর্থিক খাতে সংস্কার অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে সংস্কার বেশি প্রয়োজন। কারণ এ খাতের বর্তমান অবস্থা সংকটজনক। ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র সুশাসনের অভাব, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, জবাবদিহি, পেশাদারত্ব ও দক্ষতার অভাব থাকায় উচ্চ খেলাপি ঋণ এখনো বিষফোঁড়া হয়ে আছে। এজন্য আর্থিক খাতের সংকট কাটাতে বেসরকারি খাতের ব্যাপক ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পথ সুগম করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অর্থাৎ বেসরকারি খাতের বাণিজ্যকে গতিশীল করার জন্যই ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে সুসংগঠিত করে শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ আর্থিক অবকাঠামো গড়তে হবে। আবার সরকারকে বিদেশী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কঠিন শর্তে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ নেয়ার প্রবণতা এড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক ঋণ নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আহরণে বাঞ্ছিত উন্নয়নের বিকল্প নেই। অথচ কয়েক দশক ধরেই দেশের অর্থনীতি যে অবস্থায় তা থেকে বোঝা যায়, রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় বরাবরই পুশ ফ্যাক্টরের ভেতরে ছিল এবং এখনো আছে। রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাড়ানোর কথা কাগজ-কলমে ও রাজনৈতিক বয়ানে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের চিত্র হতাশাজনক। এখনো করদাতাদের একটি বড় অংশকে করজালের আওতায় আনা যায়নি। এদিকে করজালের বাইরে থাকা কর ও শুল্কায়নযোগ্য খাতগুলোকে শুল্ক ও করের আওতায় আনার চেষ্টাও চলছে। করদাতাবান্ধব ও উৎসাহ প্রণোদনামূলক পদ্ধতি গড়ে তোলা বা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই অনুভূত হচ্ছে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি বড্ড ধীর। এ ধীরগতি এড়ানোর জন্য রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনার সংস্কার বিষয়ে অনেক সুপারিশ সরকারের কাছে রয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি। করদাতাদের কর দেয়ায় উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন, কিংবা করদানের নাগরিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারকে আইনগতভাবে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কর প্রদান ও আহরণের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা বা জটিলতা, এসব জটিলতা দূর করার জন্য নব্বই দশক থেকেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নানা প্রচেষ্টা রয়েছে। ওই সময় দেশের অর্থনীতি ট্রেডিং বা মুনাফা অর্জনমুখী খাতের ওপর বেশি নির্ভর করত। তবে নব্বইয়ের দশকেই বিভিন্ন খাত উৎপাদনমুখী হওয়ায় শুল্কের বদলে আয়করের কলেবর বাড়ার কথা। দেখা যাচ্ছে, প্রত্যক্ষ করের বদলে পরোক্ষ কর অভিমুখী যাত্রা বাড়ছে। এ অবস্থায় কর এবং জিডিপির অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে আরো অনেক পথ বাকি, এমনটিই প্রতীয়মান হচ্ছে। দেশের কর ও জিডিপির অনুপাত বরাবরই নিম্নমুখী। অথচ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কর রাজস্ব আহরণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা বহু আগে থেকেই নির্ধারিত। এক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হলেও তা পূরণে সফলতার গতি গজেন্দ্রগামী।

প্রযোজ্য করদানে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রণোদনামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করা জরুরি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, কর আহরণ পরিবেশ-পরিস্থিতিকে স্বয়ম্ভর ও অভিজ্ঞ মনে করে কঠিন পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে। এভাবে কর আদায়ে অহেতুক চাপ বাড়ায় করদাতারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। কর আহরণের পদ্ধতি জটিল হলে যারা এখনো করজালের আওতায় আসেননি, তারা সঠিকভাবে কর দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। আবার যারা নিয়মিত কর দেন, তারাও অনুৎসাহিত হবেন। এজন্যই কর আদায়ের আইন সংস্কারের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থাকে করদাতাবান্ধব করতে হবে। কর আদায়ের নীতিনির্ধারণী মনোভঙ্গি কিংবা উপলব্ধি এক্ষেত্রে জরুরি। উন্নত অর্থনীতির মতো আমাদের দেশের করদাতারা দায়িত্বসচেতন, প্রচলিত কাঠামো ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ, কর আইন সম্পর্কে তাদের ধারণাও স্পষ্ট—এসব উপলব্ধি থাকলে কর আদায়ের পদ্ধতি ভিন্নরকম হবে। যেহেতু বাস্তবতা এমন নয় এবং নতুন করদাতারাও করজালের আওতা এড়াতে চাচ্ছেন, তাই যারা কর দিচ্ছেন তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় কর ফাঁকি দিয়ে তারা চাপ এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এজন্য কর আদায়ের উপলব্ধিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে হবে।

আমাদের অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পুঁজিবাজার প্রায়ই নানা কারণে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারান এবং পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়। গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আমাদের পুঁজিবাজারে অবধারিতভাবে পড়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ ও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বহুজাতিকসহ ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর দীর্ঘদিন স্থিতিশীল ছিল। পুঁজিবাজার থেকে এ সময়ে যৎসামান্য রিটার্নও এসেছে। ডলারের বিনিময়ে টাকার মূল্যমানের ভারসাম্য ফিরিয়ে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করতে হবে। এছাড়া পুঁজিবাজারের সংকটগুলো চিহ্নিত করে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করার পরিকল্পনায় মনোযোগ বাড়ালে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দেশী-বিদেশী ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে। পুঁজিবাজারে অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এজন্য পুঁজিবাজারের গতি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও তার সুফল মিলছে না। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ধারণা করেন, এ বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলেই নানা কারসাজির ঘটনা ঘটছে। বিশেষত ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধসের পর থেকেই একটি অভিযোগ রয়েছে যে একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এ বাজারকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। এজন্য পুঁজিবাজারের সমস্যা নিরসনে সুচিন্তিত পদক্ষেপগুলো সর্বজনীন স্বার্থে প্রয়োগ করতে হবে। দেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। কিন্তু পুঁজিবাজারে তাদের উপস্থিতি একেবারেই কম। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে আসা উচিত। বেসরকারি খাত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। বেসরকারি খাতই উদ্ভাবন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। নিজেদের বাণিজ্য পরিবেশ উন্নত করা এবং মুনাফার হার বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। নতুন নতুন খাত বাড়ানো এবং বিদ্যমান খাতগুলোর মানোন্নয়নের সুযোগ চিহ্নিত করা জরুরি। বেসরকারি খাতের অবকাঠামো অর্থায়নে সরকারের পাশাপাশি এ খাতের অংশীজনদের সহযোগিতাও জরুরি। বর্তমানে বাণিজ্যনীতির অধিকাংশই ব্যবসাবান্ধব নয়। বিনিয়োগের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা না পেলে অভ্যন্তরীণভাবে পুঁজিপ্রবাহ বাড়বে না, এমনটিই স্বাভাবিক। গত বছর নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনকে সংশোধন করে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ব্যাংক ঋণের সুদহারে ছাড় নেই। এলসি (ঋণপত্র) খোলায় কড়াকড়ি আরোপ হয়েছে। এসব নীতিমালার ফলে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়েছে। বন্দরের সংবাদ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রচার হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-সংক্রান্ত প্রকাশনাগুলোয়ও দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতাগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এসব সংবাদ দেখে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সংগতই এ দেশে বিনিয়োগে অনুৎসাহিত হবেন। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য এদিকে নজর দিতে হবে।

রফতানি আয় বাড়ার ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। দেশে পরিবহন ও পণ্য সংরক্ষণের ব্যয় অনেক। এছাড়া পণ্য সরবরাহে দক্ষতার অভাব থাকায় রফতানি আয় বাড়ছে না। পণ্য সরবরাহের পথ সুগম করতে স্থলপথে চার লেন সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে। স্থল ও জলপথে অবকাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে পণ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালা প্রণয়ন এবং সুসংহত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণের আর সুযোগ নেই। এও মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এ ভূখণ্ড পরিবেশগত অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত টেকসই অবস্থা নিশ্চিত করতে মূলধারার উন্নয়ন নীতির সঙ্গে পরিবেশ সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে একীভূত করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সহায়তা তহবিল এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত সমাধানের সম্ভাবনা ও সুযোগ ব্যবহার করতে হবে। ৭৫-পরবর্তী সরকারের সময় খাল কাটা কর্মসূচি সে সময়েই ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত। অথচ কর্মসূচিটি পরিত্যক্ত হওয়ার পর এরই মধ্যে গত ছয় দশকে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিকর প্রভাব বেড়েছে। তাই এ ধরনের সংকট সমাধানে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হবে, সেগুলোয় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সামাজিক কল্যাণমুখী নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারলে রাজস্ব আদায়ের সুযোগ অনেকাংশেই বাড়বে এমনটি বলাই যায়।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান

আরও