বর্তমান প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল ও বহুমুখী। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সফলতা এলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং রফতানি খাতে গতি ফেরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও ভর্তুকি কমিয়ে আর্থিক ঘাটতি সামলানোর উদ্যোগ চলছে।
ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে কিছুটা শ্লথ হয়েছে, যদিও বৈশ্বিক মানদণ্ডে তা এখনো ভালো। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো নেস্লে থেকে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার—বড় কোম্পানিগুলো ভোগ্যপণ্যের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কথা বলছে। এ সমস্যা শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের আয় কমছে, চাকরির বাজারে চাপ বাড়ছে—এগুলো ভারতীয় অর্থনীতির জন্য নতুন মাথাব্যথা।
পাকিস্তান তার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ চুক্তি ও কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বোঝা এখনো প্রধান সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এ নতুন ভাবনার জন্য আমরা তাকাতে পারি ইউরোপের দিকে, যেখানে আঞ্চলিক সহযোগিতা অসাধ্য সাধন করেছে। ইউরোপের এয়ারবাস মডেল আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনাময় পথ দেখাতে পারে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা বর্তমানে বেসামরিক বিমান শিল্পে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের মেলবন্ধনে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা এয়ারবাস শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো অনেকটাই একই রকম। ভারতে যেমন দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, তেমনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও একই অবস্থা। অথচ এ তিন দেশের মধ্যে রয়েছে পরিপূরক দক্ষতা—ভারতের সফটওয়্যার প্রযুক্তি, বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমশক্তি, এবং পাকিস্তানের কৃষি ও শিল্প প্রকৌশল।
এয়ারবাস যেভাবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে বোয়িংকে টেক্কা দিয়েছে, সেভাবেই দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যৌথ উদ্যোগে তৈরি হতে পারে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, যা তিনটি দেশেরই কৃষক ও শ্রমিকদের উপকার করবে।
চীনের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। মাত্র চার দশকে ৮০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে সেই দেশ। এ সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। দক্ষিণ এশিয়ার সামনেও রয়েছে একই রকম সুযোগ। তবে এখানে বড় সমস্যা হলো ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতার অভাব। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একটি স্টার্টআপ সহজেই ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ পেতে পারে, সেখানে আমাদের অঞ্চলে উদ্যোক্তাদের সামনে রয়েছে অনেক বাধা।
পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা—এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক বিনিয়োগের দরকার। এ বিনিয়োগ শুধু বজায় রাখা নয়, বরং উন্নয়নের জন্যও জরুরি। এখানেই এয়ারবাস মডেলের প্রাসঙ্গিকতা আরো বেড়ে যায়।
এখন যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ছায়া, তখন আঞ্চলিক সহযোগিতার এ মডেল আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। ওয়ার্ল্ড ইনইকোয়ালিটি ল্যাবের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আয়-বৈষম্য ক্রমে বাড়ছে। শীর্ষ ১ শতাংশের আয় সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এ বৈষম্য কমাতে হলে দরকার যৌথ শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
এয়ারবাসের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা। প্রতিটি অংশীদার দেশ নিজেদের সেরা দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ফলে আজ এয়ারবাসের বিমানগুলো শুধু নিরাপদই নয়, যাত্রী আরামের দিক থেকেও অনেক এগিয়ে। এ মডেল অনুসরণ করে দক্ষিণ এশিয়াও তৈরি করতে পারে নিজস্ব সাফল্যের গল্প। বিশেষ করে এয়ারবাস ফ্লাই-বাই-ওয়্যার প্রযুক্তির মতো নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেখিয়েছে কীভাবে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যায়। এমনকি চীনও এখন এয়ারবাসের জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি করছে, যা প্রমাণ করে এ ধরনের সহযোগিতা ক্রমে বিস্তৃত হতে পারে।
এখন ভালো মানের কর্মসংস্থান যখন কমছে—ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়ছেন, তখন এ ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা নতুন পথ দেখাতে পারে। এয়ারবাস যেভাবে ইউরোপীয় প্রতিভা ও সম্পদকে একত্র করেছে, সেভাবেই দক্ষিণ এশিয়াও একসঙ্গে করতে পারে তার বিশাল জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা। তবে এর জন্য দরকার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সদিচ্ছা। যেমন ইউরোটানেল ফ্রান্স-ব্রিটেনের হাজার বছরের দ্বন্দ্বকে পেছনে ফেলে সহযোগিতার নতুন অধ্যায় লিখেছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াও তার ঐতিহাসিক বিভেদ ভুলে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোতে পারে।
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার বিভিন্ন লেখায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, এ অঞ্চলের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে যে উন্নয়ন সম্ভব, আলাদাভাবে তা কখনই অর্জন করা যাবে না। সার্কের বিভিন্ন নেতৃত্বও বারবার জোর দিয়েছেন যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য।
আজ বিশ্ব যখন অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা তীব্র, তখন একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে সাফল্যের চাবিকাঠি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে ইউরোপের এয়ারবাস থেকে এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আঞ্চলিক সহযোগিতা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এ পথ খোলা। শুধু দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর দূরদর্শী নেতৃত্ব।
সৈয়দ আবুল বাশার: অর্থনীতিবিদ ও স্বতন্ত্র গবেষক