গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা করে অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস: বাংলাদেশের সামনে নতুন বাস্তবতা ও সম্ভাবনা

শিল্প-কারখানায় জ্বালানিসাশ্রয়ী মোটর, আধুনিক বয়লার, উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বর্জ্য তাপ পুনর্ব্যবহার এবং নিয়মিত জ্বালানি নিরীক্ষার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বিদ্যুতের অপচয় কমানোর উদ্যোগও বাড়াতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমরা অনেক দিন ধরেই আলোচনা করছি। নীতি তৈরি করেছি, পরিকল্পনা নিয়েছি, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছি। কিন্তু এখন আমাদের সামনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবেলায় আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত?

আমি মনে করি, প্রশ্নটি এখন শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নয়। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন, জ্বালানি খাতের প্রশ্ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন। সর্বোপরি এটি আমাদের বেসরকারি খাতেরও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বেসরকারি উদ্যোগ ও বাজারমুখী সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে বেসরকারি উদ্যোগের প্রসারে নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নতুন গতি পায়। বিভিন্ন সরকারের সময়ে নেয়া নীতি ও উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামুখী হয়েছে।

আমাদের কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। প্রবাসী আয় ও রফতানি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এ অর্জন ধরে রাখতে হলে উন্নয়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ যে অর্থনীতি বারবার জলবায়ুর অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সবসময় বড় কোনো দুর্যোগের মাধ্যমে আসে না। অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অনিয়মিত বৃষ্টিতে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। লবণাক্ততা কৃষিজমি ও পানীয় জলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আর বন্যায় কারখানা, সড়ক ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আনুমানিক ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এ পরিসংখ্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে ব্যয় করতেই হবে। কিন্তু দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নিয়ে কতটা ক্ষতি এড়ানো যায়, সেই হিসাবও আমাদের করতে হবে।

আমার কাছে অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মূল কথা হলো জলবায়ু ঝুঁকিকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে রাখা যাবে না। প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ভেতরেই এ ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিতে হবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং জ্বালানি খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের হালনাগাদ পূর্বাভাসে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি পূর্বাভাস, চূড়ান্ত হিসাব নয়। তবে এ পূর্বাভাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় অর্থনীতির সহনশীলতা আরো বাড়াতে হবে।

জলবায়ু ঝুঁকি এ অর্থনৈতিক চাপকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। বন্যায় কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হলে রফতানি ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু ঝুঁকি কোনো একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থা পরিকল্পনার সময় শুধু নির্মাণ ব্যয় বিবেচনা করলে চলবে না। ভবিষ্যতের বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও পানি সংকট মোকাবেলার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

আজ কিছুটা বেশি বিনিয়োগ করে যদি আগামী দিনে বড় ক্ষতি এড়ানো যায়, তাহলে সেটি বাড়তি ব্যয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাশ্রয়। জ্বালানি খাতেও আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সবই আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

শিল্প-কারখানায় জ্বালানিসাশ্রয়ী মোটর, আধুনিক বয়লার, উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বর্জ্য তাপ পুনর্ব্যবহার এবং নিয়মিত জ্বালানি নিরীক্ষার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বিদ্যুতের অপচয় কমানোর উদ্যোগও বাড়াতে হবে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ছিল ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর দক্ষতাও বাড়াতে হবে। তবে শিল্পকে শুধু নতুন পরিবেশগত শর্ত দিলেই হবে না। প্রযুক্তি পরিবর্তনে অর্থ লাগে, দক্ষ জনবল লাগে এবং বিনিয়োগের নিশ্চয়তা লাগে। তাই সরকার, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পোদ্যোক্তাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন ব্যয় কমবে, জ্বালানি অপচয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি: আমাদের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো কৃষি। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সবই জড়িত। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি রয়েছে। হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ফসল নষ্ট হতে পারে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও পানি সংকট, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কৃষিকাজকে কঠিন করে তুলছে।

তাই কৃষিনীতি শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কৃষক যাতে উৎপাদন ধরে রাখতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য অঞ্চলভিত্তিক লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু ফসলের জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ, নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার, উন্নত বাজার ব্যবস্থা এবং কৃষকের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত, হিমাগার, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপ্রযুক্তিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, খাদ্যের অপচয় কমবে এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

কৃষকের জন্য ফসল বীমা, দুর্যোগের পর সহজ শর্তে ঋণ পুনর্গঠন এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা দরকার। আমরা চাই না, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে একজন কৃষক বারবার ঋণগ্রস্ত হন, একটি পরিবার খাদ্যনিরাপত্তা হারাক কিংবা কোনো অঞ্চল উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ুক। তাই কৃষি, খাদ্য, পানি ও সামাজিক সুরক্ষাকে একই সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

রফতানি প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে।

তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতির একটি বড় শক্তি। এ শিল্প অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার শর্ত বদলে যাচ্ছে। অনেক ক্রেতা এখন পণ্যের দাম, মান ও সরবরাহের সময়ের পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় বিবেচনা করছেন। উৎপাদনে কত জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে, পানি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে এবং বর্জ্য কীভাবে শোধন করা হয়েছে—এসব বিষয়ও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ পরিবর্তনকে শুধু বাধা হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিচ্ছন্ন উৎপাদন, পানি পুনর্ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করলে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য এ পরিবর্তন সহজ নয়। তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং যৌথ বর্জ্য পরিশোধন অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। একই সঙ্গে সবুজ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি নিরীক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়তে পারে। এজন্য কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণকে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

প্রযুক্তির পরিবর্তনে কাজের ধরন বদলে গেলে বিদ্যমান শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, শিল্প আরো প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা আরো নিরাপদ হবে।

কপ৩১: আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের পথে আগামী ৯-২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্টালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এ সম্মেলন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অভিযোজন এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অঙ্গীকার যেন বাস্তব অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভিযোজনের কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ নেয়। শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করলেই হবে না। অর্থায়ন কখন আসবে, কী শর্তে আসবে এবং কোন প্রকল্পে পৌঁছাবে—এসব বিষয়েও স্পষ্টতা দরকার।

বাংলাদেশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তার তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩ শতাংশ জমা দিয়েছে। এতে ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৬-৩৫ সময়কালে আনুমানিক ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার দেশীয় সম্পদ থেকে এবং ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিসংখ্যান কাজের ব্যাপকতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব—দুটিই তুলে ধরে।

কপ৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট, বাস্তবভিত্তিক এবং ফলাফলমুখী। আমরা নিজেরাও কার্যকর পদক্ষেপ নেব। একই সঙ্গে ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বিশেষ করে অভিযোজনের অর্থায়ন, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থপ্রাপ্তি, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সহযোগিতা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে এমন প্রকল্পে রূপান্তর করা, যার সুফল সরাসরি কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।

জলবায়ু বাজেট: বরাদ্দ থেকে ফলাফল: এখন প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক আলোচনার পাশাপাশি দেশে আমরা কী করব? ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জলবায়ুসংশ্লিষ্ট বাজেটে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ। তবে বরাদ্দের অংকই সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। কত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, কত মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা কমছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানতে হবে।

আমার প্রস্তাব হলো জলবায়ু বাজেটের বাস্তবায়ন ও ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা হোক। বড় সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু সহনশীল সড়ক, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নগর অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে। এখানে আমি কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই। প্রথমত, বড় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও মূল্যায়নে জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য জ্বালানি দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের উপযোগী অর্থায়ন চালু করতে হবে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু বাজেটের ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাস্তব ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ মূল্যায়নের সময় প্রকল্পের জলবায়ু ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা বিবেচনায় নিতে হবে।

পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পোদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে তা জানা নয়; সেই অর্থ দিয়ে কী ফলাফল অর্জিত হয়েছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা।

সবশেষে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাকে আমরা যদি শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখি, তাহলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। আবার শুধু প্রবৃদ্ধির হিসাব করে পরিবেশগত ঝুঁকি উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই কঠিন হবে। আমাদের এমন অর্থনীতি গড়তে হবে, যেখানে শিল্প কম জ্বালানি ব্যবহার করেও বেশি উৎপাদন করতে পারে; কৃষক প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও উৎপাদন ধরে রাখতে পারেন; রফতানিকারক আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন শর্ত পূরণ করতে পারেন; তরুণরা নতুন দক্ষতা অর্জন করে কাজ পান এবং দুর্যোগের পর কোনো পরিবারকে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে না হয়। এজন্য তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, নীতি ও পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয় ও বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে অর্থবহ সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি উদ্যোগের ফলাফল পরিমাপ করতে হবে। শুধু কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা নয়; সেই অর্থ দিয়ে মানুষের জীবন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ বড়, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের উদ্যোক্তা আছেন, পরিশ্রমী শ্রমশক্তি আছে, কৃষিতে অভিজ্ঞতা আছে এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় দীর্ঘদিনের অর্জিত জ্ঞান আছে। এখন প্রয়োজন এসব শক্তিকে আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর অর্থায়ন এবং সুস্পষ্ট নীতির সঙ্গে যুক্ত করা।

বণিক বার্তার এ আলোচনা যেন শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এখান থেকে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব আসুক, সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ুক এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ার কাজে নতুন গতি তৈরি হোক। আমাদের লক্ষ্য কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সামাল দেয়া নয়। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়া, যার অর্থনীতি আরো উৎপাদনশীল, শিল্প আরো প্রতিযোগিতামূলক, কর্মসংস্থান আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়ন আরো টেকসই হবে।

আসুন, জলবায়ু ঝুঁকিকে শুধু সংকট হিসেবে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সহনশীল করে গড়ে তোলার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখি। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

আবদুল আউয়াল মিন্টু: মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ প্রধান অতিথির পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা]

আরও