গত এপ্রিলে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ থেকে জানা যায় কীভাবে এসব আকস্মিকতা উদীয়মান ও উন্নত অর্থনীতির ভাগ্যকে প্রভাবিত করেছে।
২০০১ সালে গোল্ডম্যান সাকসের তৎকালীন অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল সর্বপ্রথম ‘ব্রিক’ শব্দটির ধারণা দেন। ওই সময় তার উল্লেখ করা চার উদীয়মান দেশ অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। গত এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশে এ অগ্রগতি ভীষণ অসম রূপ ধারণ করেছে।
সবচেয়ে বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশ দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির তুলনায় চলতি মূল্যে চীনের জিডিপির মাধ্যমে পরিমাপকৃত আপেক্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষমতা ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। মূলত তাদের জিরো-কভিড নীতি ও আবাসন খাতে মন্দাবস্থার কারণে ২০২২ সালে এ অর্থনৈতিক ক্ষমতা ৭০ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে। গত বছর তা আরো কমে ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে এটি সামান্য বেড়ে ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে যেতে পারে। চীনের রফতানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের সীমাবদ্ধতা এবং একই সঙ্গে দেশটির উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টা—দুটো মিলে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এক ধরনের স্পষ্ট বাধা তৈরি হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আপেক্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিচারে আমরা হয়তো এরই মধ্যে ‘পিক চায়না’ বা চীনের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক শক্তির রূপ দেখে ফেলেছি।
এদিকে জীবনযাত্রার মান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) সামঞ্জস্যপূর্ণ জিডিপির হিসেবে পরিমাপ করা হয়। এক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারছে। ২০২১-২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের মাথাপিছু জিডিপি ২৯ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ দুই অর্থনীতির আয়ের ব্যবধান প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্ট হারে কমছে। এ ধারায় চললে ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই চীনের মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের স্তরের ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এটি আপেক্ষিক বিচারে চীনকে উচ্চ আয়ের দেশের শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করবে।
পরম বা সুনির্দিষ্ট পরিমাপের ভিত্তিতে চীন আরো আগেই এ মাইলফলক স্পর্শ করবে। দেশটি ২০২৫ সালে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ১৪ হাজার ২৩০ ডলারে উন্নীত করেছে এবং ২০২৬ সালে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ১৪ হাজার ৮৭৪ ডলারে পৌঁছবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এ সংখ্যা বিশ্বব্যাংকের উচ্চ আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত সীমা ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলারের চেয়ে অনেকটাই বেশি। এর মাধ্যমে চীন মধ্যম আয়ের ফাঁদ (মিডল-ইনকাম ট্র্যাপ) এড়াতে পেরেছে বলেই মনে হচ্ছে।
ভারত এক্ষেত্রে বিপরীত ধারার সমন্বয়ের মধ্যে রয়েছে; দেশটি অর্থনীতির আকারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছলেও জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়ে বেশ পিছিয়ে। ২০০০ সালে ভারত ছিল বিশ্বের ১৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি, যা বৈশ্বিক জিডিপিতে ১ দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রাখত। ২০২২ সালের মধ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি ও জাপানের পরই পঞ্চম স্থানে উঠে আসে। যদিও রুপির দুর্বল মান এবং জিডিপি পর্যালোচনার কারণে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ভারত যুক্তরাজ্যের পেছনে পড়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে, তবে দেশটি শিগগিরই র্যাংকিংয়ে আবার ওপরের দিকে উঠে আগামী বছর বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে ভারতের ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা ও সামঞ্জস্যপূর্ণ মাথাপিছু জিডিপির অনুপাত গত এক দশকে সামান্যই বেড়েছে। দেশটিতে এ অনুপাত ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্তরের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে চলতি বছর ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি বার্ষিক গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ার দিকে ইঙ্গিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় রাশিয়ার অর্থনীতির আকার ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। সেটাও ছিল ২০১৪ সালের কথা। ক্রাইমিয়া দখলের আগের বছর। ক্রাইমিয়া দখলের পর পশ্চিমারা নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল রাশিয়ার ওপর। ২০১৬ সালের মধ্যে এটি কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ সত্ত্বেও গত পাঁচ বছরে এটি ৭ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। এ সময়ে রাশিয়ার ক্রয়ক্ষমতার সমতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ মাথাপিছু জিডিপিও ৫৪ দশমিক ৭ থেকে ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে স্থির রয়েছে।
ব্রাজিল আপেক্ষিক অর্থনৈতিক আকার এবং জীবনযাত্রার মান—এ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এর আপেক্ষিক জিডিপি ২০১১ সালের হার ১৬ দশমিক ৮ থেকে কমে ২০১৯ সালে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। বর্তমানে তা ৮ দশমিক ১ শতাংশে ঠেকেছে। একইভাবে ব্রাজিলের আপেক্ষিক মাথাপিছু জিডিপি ২০১১ সালের ৩০ দশমিক ৮ থেকে কমে ২০১৯ সালে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে যায়। এখনো তা ওই সংখ্যারই আশপাশে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ সালে ব্রিকসে যোগ দেয়। গত এক দশকে তারাও আপেক্ষিক আয়ে ক্রমাগত অবনতি দেখেছে। উভয় দেশই মধ্যম আয়ের ফাঁদে শক্তভাবে আটকে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
বিশ্বের প্রধান উন্নত অর্থনীতিগুলোও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও আয়—এ দুই ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোর অবমূল্যায়ন, জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চ প্রযুক্তিগত উৎপাদন, মোটরযান ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাসের কারণে জার্মানির আপেক্ষিক জিডিপি ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছর ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১১ সালে দেশটির ক্রয়ক্ষমতার সমতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের স্তরের ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২০ সালে ৯১ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে তা ৮১ শতাংশে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে জাপান নব্বইয়ের দশক থেকেই পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাদের আপেক্ষিক জিডিপি ওই দশকের শুরুতে থাকা ৭৪ শতাংশ থেকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। চলতি বছরে এ হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দেশটির ক্রয়ক্ষমতার সমতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের ৮৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তাদের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদন ২০০৭ সালের ২১ দশমিক ৫ থেকে কমে ২০২৬ সালে ১৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। এদিকে আপেক্ষিক মাথাপিছু জিডিপি ২০১৬ সালের হিসেবের ৮১ দশমিক ৩ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশে ঠেকেছে।
কিছু সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে উন্নত অর্থনীতিগুলো দ্রুত তাদের উদীয়মান প্রতিপক্ষদের কাছে জায়গা হারাচ্ছিল। ২০০০ সালে জি৭ ও ব্রিকসের মধ্যে জিডিপির ব্যবধান যেখানে ৫৭ শতাংশ পয়েন্ট ছিল, ২০১৬ সালে তা কমে ২৫ শতাংশ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপিতে জি৭ জোটের অবদান ছিল ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে ব্রিকসের অবদান ছিল ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে ব্রিকসের অগ্রগতি থমকে গেছে। এমনটা জি৭ দেশগুলোর ভালো পারফরম্যান্সের কারণে নয়, বরং সব দেশেরই পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হওয়ার কারণে ঘটেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স বজায় রেখেছে। ২০০১ সালে বৈশ্বিক জিডিপিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। এরপর কিছুটা কমলেও পাঁচ বছর ধরে তা ২৫ শতাংশের ওপরেই আছে। চলতি বছর তা ২৬ শতাংশের ঠিক ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মেলবন্ধন বা সমতার যত কথাই বলা হোক না কেন, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ দেশ যখন গতি বজায় রাখতে হিমশিম খেয়েছে, তখন আমেরিকা উল্টো আরো এগিয়ে গেছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৬ থেকে অনুদিত]
কিউন লি: দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান; সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এবং সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘ইনোভেশন-ডেভেলপমেন্ট ডিট্যুরস ফর লেটকামারস: ম্যানেজিং গ্লোবাল-লোকাল ইন্টারফেসেস ইন দ্য ডি-গ্লোবালাইজেশন এরা’ গ্রন্থের লেখক