ন্যায্যতার সহজপাঠ

জন রলসের ন্যায্যতা তত্ত্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে জন রলসের আলোচনা কম। জন রলসের গুরুত্ব না বোঝার কারণ, এ দেশে যারা বিদ্যাচর্চা করেন তাদের অধিকাংশই রলস পড়েননি। বাংলা ভাষায় রলসের আলোচনা কিছু চোখে পড়লেও বাংলাদেশে রলস উপেক্ষিত বললে অত্যুক্তি হবে না। এ দেশে রলসের কাজের গুরুত্ব না বোঝার কারণ অনেক। বাংলা ভাষায় রলসের কোনো বই অনূদিত না হওয়াটা এ দৈন্যকে

বাংলাদেশে জন রলসের আলোচনা কম। জন রলসের গুরুত্ব না বোঝার কারণ, দেশে যারা বিদ্যাচর্চা করেন তাদের অধিকাংশই রলস পড়েননি। বাংলা ভাষায় রলসের আলোচনা কিছু চোখে পড়লেও বাংলাদেশে রলস উপেক্ষিত বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশে রলসের কাজের গুরুত্ব না বোঝার কারণ অনেক। বাংলা ভাষায় রলসের কোনো বই অনূদিত না হওয়াটা দৈন্যকে আরো স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এজন্যই আমরা বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় জন রলসের আলোচনায় আগ্রহী। 

গত ৫০ বছরে সারা বিশ্বের জ্ঞানকাণ্ডে জন রলসের কাজ বিপুল প্রভাব ফেলেছে। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন রলসের কাজের কারণে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হয়েছেন, সে কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেছেন তার দি আইডিয়া অব জাস্টিস গ্রন্থে। রাজনৈতিক দর্শনে জন রলসের কাজ, বিশেষ করে ন্যায্যতার দর্শনের তাত্ত্বিকদের থেকে শুরু করে সংবিধান আইন, সামাজিক বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের অন্য অনেক অনুষদকে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। গত কয়েক দশকে রলসের কাজের কারণেই ন্যায্যতার দর্শন সমসাময়িককালে এতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এজন্যই রলসের কাছে আমাদের ঋণ স্বীকার করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ জ্ঞানচর্চার মহাসড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই বৈশ্বিক জ্ঞানের পথপরিক্রমার তার নতুন নতুন বাঁকের খবর এখানকার বেশির ভাগেরই গায়ে লাগে না। আমাদের বিদ্যাচর্চার ধরন বিষয় (কন্টেন্ট) বেশ সেকেলে। দেশে এখনো জ্ঞানবিজ্ঞান ব্যক্তি পারিবারিক জীবনযাপনের পরিধির গুণগত রূপান্তরের অংশ হয়ে উঠছে না।

জন রলসের কাজ নিয়ে প্রথমেই জানতে হবে তার কাজের উদ্দেশ্যটাই-বা কী ছিল অথবা তিনি কী করতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট করে বোঝা। প্রশ্নের সঙ্গে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি চলে আসে তা হলো, রলস কেন এই বিপুল শ্রমের কাজ হাতে নিয়েছিলেন? জন রলসের জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ থিওরি অব জাস্টিসে প্রথমেই তিনি কাজের বৃহত্তর লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন। স্পষ্টভাষী রলস তার কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, তাকে এমন একটি ন্যায্যতা তত্ত্বের সন্ধান তাড়িত করেছে, যেটি হবে ন্যায্যতার একটি কার্যকরী বিকল্প তত্ত্ব। এখন প্রশ্ন হলো, কার বিকল্প তত্ত্ব? এর জবাব রলস নিজেই দিয়েছেন। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে সুদীর্ঘ মতবাদ পরম্পরায় ন্যায্যতা ভাবনার যে তত্ত্বীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে, রলস তার বিকল্প কার্যকর তত্ত্ব নির্মাণ করবেন এমন সংকল্প থেকেই তিনি কাজ শুরু করেছেন। পাশ্চার্ত্য দর্শনে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, হিউম, অ্যাডাম স্মিথ, লক, লাইবনিজ, কান্ট, হেগেল, বেন্থাম, কনদরচে, রুশো, ভলতেয়ার, মন্টেস্কো, উলস্টোনক্রাফট, মার্ক্স, স্টুয়ার্ট মিল, রাসেলসহ অনেক দার্শনিক জাস্টিস বা ন্যায্যতা নিয়ে তাদের নিজস্ব মতবাদ দিয়েছেন। ন্যায্যতা সম্পর্কে তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা দর্শন রয়েছে।

কিন্তু সুদূর অতীতের ন্যায্যতা ভাবনায় যেন কিছুটা পলি জমেছিল। আধুনিক কালে জাতিরাষ্ট্রগুলোর অভ্যুদয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসারের প্রেক্ষাপটে ন্যায্যতা চিন্তার নবায়নের প্রয়োজন অনুভব করেন রলস। ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বীয় উন্নয়নে রলসের কাজ পথপ্রদর্শকের অবদান রেখেছে। রলস তার কাজের লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের জানাচ্ছেন, তিনি মূলত তৃপ্তিযোগবাদের (উপযোগবাদ, ইউটিলিটেরিয়ানিজম) বিপরীতে ন্যায্যতা চিন্তার বৃহৎ পরিসর নির্মাণ করতে যাচ্ছেন। রলস তৃপ্তিযোগবাদী চিন্তাধারা পছন্দ করতেন না। শুধু তাই নয়, রলস মনে করেন সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গরূপে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে তৃপ্তিযোগবাদী চিন্তাভাবনা রয়ে গেলে তা বহু সমস্যার জন্ম দেবে। এসব সমস্যা সামাজিক ন্যায্যতা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে। ফলে রাজনীতি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্রটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এজন্যই রলস জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরে অনুসন্ধান করে বিকল্পের সন্ধান করেছেন এবং ন্যায্যতার তত্ত্বে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।

আমরা যে পৃথিবীটায় বাস করি তা কেবল ত্রুটিপূর্ণই নয়, ভয়ানক রকমের অন্যায্য অসম। সম্প্রতি অক্সফামের রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পারছি চলমান ভয়াবহ করোনা মহামারীর সময়েও বিশ্বে শীর্ষ ১০ জন ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। গত দুই বছরে প্রতিদিন তাদের সম্পদ ১৩০ কোটি ডলার বেড়েছে। ফলে করোনা-পূর্বে তাদের ৭০ হাজার কোটি ডলার দ্বিগুণ হয়ে দশমিক ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে। অন্যদিকে অর্থের অভাবে করোনায় কাজ হারিয়ে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গরিবরা। মহামারীর কারণে বিশ্বে ১৬ কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলোর ৮৫ শতাংশ মানুষ এক ডোজ টিকাও পায়নি। বৈষম্যে ভরা চিত্র আমরা কেউই মেনে নিতে পারি না। এমনতর প্রকট অন্যায্য ব্যবস্থার বিপরীতে কীভাবে আমরা একটি ন্যায্য সমাজ পেতে পারি তার অনুসন্ধান আমাদের করতেই হবে।

জন রলসের তাত্ত্বিক প্রতিবাদী অমূল্য কাজটি ভীষণ অনুপ্রেরণার উৎস। একটি ন্যায্য সমাজ পেতে গেলে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ন্যায্যতার কার্যকর ধারণা নির্মাণ তার প্রয়োগ দুটোই জরুরি। এছাড়া তৃতীয় আরেকটি পথ রয়েছে, যেটি অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বাতলেছেন। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবস্থার মধ্যে তুলনা করে দেখতে চাওয়া সমাজ ন্যায্যতার অভিমুখে এগিয়েছে নাকি তার বিপরীতে পিছিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ তিনি ন্যায্য সমাজের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করার চেয়ে বাস্তবে আসলে কী পাওয়া গেল তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বাস্তবে আমরা দেখি ন্যায্যতা পাওয়ার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতা রয়েছে, সেজন্য অধ্যাপক সেনের অনুসন্ধান সম্পূর্ণ ন্যায্য প্রতিষ্ঠান কেমন চেহারা নিচ্ছে বা কী কী বৈশিষ্ট্য সে ধারণ করবে; প্রশ্ন অনুসন্ধানের চেয়ে বরং তিনি প্রশ্নের অনুসন্ধান করেছেন—‘কীভাবে ন্যায্যতার প্রসার ঘটানো যায়? আমরা বুঝতে পারছি অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের দেখার লেন্স আরো বড় ব্যাপক। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠাননির্ভর ন্যায্যতা খোঁজেননি, কারণ প্রতিষ্ঠানের মারাত্মক সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমতা অসম প্রয়োগের বাইরে ন্যায্যতার অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপক ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সামাজিক নানা পরিসরে এমনকি ব্যক্তিকেও তিনি তার ন্যায্যতার তত্ত্বে জায়গা দিয়েছেন। রলসের চিন্তাধারাকে অধ্যাপক সেন নাম দিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠান্বেষী প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ। অমর্ত্য সেনের ন্যায্যতার অনুসন্ধানের পদ্ধতি হলো রলসের বিপরীত। পরিষ্কার করে বললে, অধ্যাপক সেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধান না করে বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে তুলনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন।

অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের তুলনাভিত্তিক চিন্তাধারার ফলে ন্যায্যতা তত্ত্ব সমৃদ্ধ হলো এবং এখানে তার মৌলিক অবদান যুক্ত হলো। রলসের রিজিড ফ্রেম-কে তিনি ভেঙে দিয়েছেন এবং তাকে আরো বৃহৎ পরিসর, বিচিত্র সব অবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিকে ন্যায্যতা তত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের ন্যায্যতার তাত্ত্বিক প্রায়োগিক স্বাধীনতা সক্ষমতার পরিধি বাড়িয়ে তুলেছে। তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়েছে ন্যায্যতার তুলনাভিত্তিক চিন্তাধারারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তুলনার দায়িত্ব আসলে কারা পালন করবেন? কোন অবস্থাগুলো তুলনার সময় আমলে নেয়া হবে আর কোনগুলোকে বাদ দেয়া হবে? তুলনা-উত্তর ন্যায্যতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবে? আর তার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই-বা কী হবে? ন্যায্যতার তুলনাভিত্তিক চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ন্যায্যতার প্রয়োগের কর্তৃত্ব কার হবে? আমি মনে করি, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর বাইরেও কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন প্রবর্তিত ন্যায্যতার তুলনাভিত্তিক চিন্তাধারা রলসীয় সর্বশ্রেষ্ঠান্বেষী প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদী ন্যায্যতা তত্ত্বের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীটাকে আমাদের করে নিতে হলে অন্যায্যতা কমাতে হবে। অসমতা অন্যায্যতা কমাতে জন রলস অমর্ত্য সেন দুজনকেই আমাদের দরকার। তাদের কাউকে বাদ দিলে চলবে না আর তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ প্রশ্নেরও কোনো মানে হয় না।

 

আহমেদ জাভেদ: দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি

আরও