আলোকপাত

আকবর আলি খানের সঙ্গে কিছু স্মৃতি কিছু কথা

আকবর আলি খান একজন প্রথিতযশা লেখক ও আমলা। আমার সঙ্গে তার পরিচয় প্রথমে নামে, আমাদের গ্রামের ঠিক পার্শ্ববর্তী গ্রামে তাদের বাড়ি। আমার বাবার কাছ থেকে তাদের পরিবার সম্পর্কে শুনেছি। আমাদের থেকে বড় এবং অত্যন্ত মেধাবী একজন ছাত্র। এভাবেই আমি আকবর আলি খানকে জানতাম। আইএতে তিনি খুবই ভালো রেজাল্ট করলেন। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন।

আকবর আলি খান একজন প্রথিতযশা লেখক আমলা। আমার সঙ্গে তার পরিচয় প্রথমে নামে, আমাদের গ্রামের ঠিক পার্শ্ববর্তী গ্রামে তাদের বাড়ি। আমার বাবার কাছ থেকে তাদের পরিবার সম্পর্কে শুনেছি। আমাদের থেকে বড় এবং অত্যন্ত মেধাবী একজন ছাত্র। এভাবেই আমি আকবর আলি খানকে জানতাম। আইএতে তিনি খুবই ভালো রেজাল্ট করলেন। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। কাকতালীয়ভাবে আমার আব্বা ইউনিভার্সিটির প্রশাসনে ছিলেন এবং আমরা এসএম হলের ভেতরের একটি কোয়ার্টারে থাকতাম। সে সময় হলে যাতায়াত করতেন . আকবর আলি খান।

আমি যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব, সে সময় তাকে দেখেছি। অন্যান্য সময়ও হলে থাকতেন, আব্বার সঙ্গে একবার কথা বলতে এসেছিলেন। সেখান থেকে তাকে দেখতে পেলাম। পরবর্তীকালে তিনি ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হলেন, ছাত্র হিসেবে দেখেছি। আমরা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই, তখন তিনি আমাদের সিনিয়র। তিনি সিএসএস পরীক্ষা দিয়ে সিএসপি হলেন, তারপর প্রশিক্ষণের জন্য চলে গেলেন।

আকবর ভাইয়ের বাড়িতে গিয়েছি। তার বাড়ি নবীনগরে, সেখানে আমরাও ছিলাম একবার কি দুবার। তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে যান। তখন আমিও কানাডায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে যাই। আমার বাসা থেকে তার বাসার ব্যবধান ছিল ১৫০-২০০ মাইলের মতো। আমি প্রায়ই প্রিন্সটনে যেতাম, সেখানে আমার অন্য বন্ধু তিনি আসতেন। কারণ তারও অনেক পরিচিত বন্ধুবান্ধব ছিলেন আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে। তখন আমরা দুজনই পিএইচডির ছাত্র। আমি তখন বিয়ে করিনি, আকবর আলি খান ভাবিকে নিয়েই ছিলেন। তিনি খুব আমুদে লোক ছিলেন। অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট, কার্ড খেলতে ভালোবাসতেন, আড্ডা মারতেন। তিনি ইতিহাসের ছাত্র, কিন্তু তিনি পিএইচডি করেছেন অর্থনীতিতেএটা একটা বিশেষ দিক। পিএইচডি শেষে তিনি দেশে ফিরে এলেন, আমিও পিএইচডি করে ফিরলাম ১৯৭৮ সালে। আকবর আলি খান কিছুদিন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন। সেখান থেকে আবার সরকারে চলে আসেন।

এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে তার একটা বই প্রকাশিত হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ডিসকভারি অব বাংলাদেশ। আমি এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য। তখন থেকেই আমাদের সঙ্গে পরিচয়।

আকবর আলি খান যখন অর্থসচিব ছিলেন আমি তখন পিকেএসএফে ছিলাম। তখন তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। সে সময় তার সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক হতো। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার পর তার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো। তবে তার লেখার সঙ্গে অনেক আগে থেকেই পরিচয়। তিনি অনেক বই লিখেছেন। বিষয় হিসেবে সেগুলো স্বতন্ত্র। তার লেখাগুলো বহুমাত্রিক।পরার্থপরতার অর্থনীতিবইয়ের মোড়ক উন্মোচনে আমিও ছিলাম। তিনি রবীন্দ্রনাথের ওপর লিখেছেন। অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং গবেষণামূলক একটা বই। বল্লাল সেনের ওপর একটা বই লিখেছেন, বইটা খুব রেয়ার। তারপরঅবাক বাংলাদেশনামক একটা বই লিখেছেন। আমাকে বললেন, রিভিউ করো তো, ইন্টারেস্টিং একটা বুক। রাজনীতি, অর্থনীতির নানা রকম মারপ্যাঁচের কথা তিনি লিখেছেন।

. আকবর আলি খানের জ্ঞানের গভীরতা ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি প্রচুর এনার্জিটিক ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতাও তাকে লেখা পড়া থেকে বিরত করতে পারেনি। তিনি একজন ভালো গবেষক, অত্যন্ত সফল শিক্ষক। তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন, আমিও পড়াই। তিনি অত্যন্ত সফল একজন শিক্ষক। প্রশাসনেও তিনি ছিলেন সফল। কেবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন, এর আগে ছিলেন ফাইন্যান্স সেক্রেটারি। সে সময় আমি দেখেছি অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন এবং তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন না। বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত তাড়াতাড়ি দিতেন, কোনো রকম দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপার ছিল না। মন্ত্রীরা তার ওপর নির্ভর করতেন। অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। তিনি খুব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথাবার্তা বলতেন না। যা বলার একেবারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতেন। এমনকি মাঝেমধ্যে আমরা দেখতাম তিনি অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতি নিয়েও কথা বলতেন। যেগুলো বলতেন সেগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। তার সততা, দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। তিনি খুব কড়াভাবে কথা বলতেন না, যেটা বলতেন স্পষ্টভাবে বলতেন; কিন্তু অত্যন্ত পরিশীলিত এবং শালীনভাবে বলতেন। ব্যবহারও অত্যন্ত শালীন। সে দিক দিয়ে আকবর আলি খান আদর্শ অনুকরণীয় ব্যক্তি। ধরনের ব্যক্তি আমাদের সমাজের জন্য খুব প্রয়োজন। আছেন অনেকেই, কিন্তু আকবর আলি খানের মতো ব্যক্তি পাওয়া যায় না।

তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। অনেক কথাবার্তা বলতেন, কিন্তু অনেক স্বল্প সময়ে মিটিং শেষ করতেন। আমরা অনেক সময় দেখি আমাদের দেশে সরকারিভাবে মিটিং-সভা হয়, উল্টাপাল্টা কথাবার্তা হয়। তিনি বক্তব্য শুরুর আগেই বলতেন আমরা বিষয়ে আলোচনা করব, এই এই হবে। ফলে বিষয়ের মধ্যে সভাটি হতো, সময়ও ব্যয় হতো কম। তার সঙ্গে সময় কাটানো ছিল সুন্দর একটি মুহূর্ত।

আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তার মেয়ে যখন মারা গেল, সেদিন আমি তাকে টেলিফোন করেছিলাম। তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। হঠাৎ টেলিফোন করায় তিনি মনে করেছিলেন তার এক মামা ফোন করেছেন, তিনি বললেন মামা আমার মেয়েটা মারা গিয়েছে। তখন আমি বললাম, আমি সালেহউদ্দিন, তিনি বললেন, সালেহউদ্দিন শোনো আমার মেয়েটা তো আজ সকালে মারা গিয়েছে। এমনভাবে বললেন আমি তো আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি। আমি সেদিনই বিকালবেলা তার বাসায় গেলাম। আমি বসলাম, আরো অনেক লোকজন ছিল। তিনি গোসল করে এলেন।

. আকবর আলি খান খুব গুছিয়ে কথা বলেন। অনেক কথা বলেন গড়গড় করেকথা বললেও রেলিভেন্ট ওয়েতে বললেন। তার স্ত্রী মারা যাওয়ার সময়ও তার পাশে ছিলাম। তারা পুরো জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নার্ভের জটিল অপারেশন করিয়ে দেশে এলে তার বাসায় যাই। তিনি তখন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, অপারেশনের এক্স-রে সবকিছু দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন অপারেশন না করলে কিন্তু আমি একেবারে পঙ্গু হয়ে যেতাম। আমার শরীরের নিচের দিকটা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যেত। আমি আর চলাফেরা করতে পারতাম না।

ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়তে খুব ভালোবাসতেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েই অধিকাংশ বই লিখেছেন। সম্প্রতি একটা বই লিখেছিলেন, আমার সঙ্গে দেখা হলে বলেছিলেন, তোমাকে আমি বইটা দেব, আনতে ভুলে গিয়েছি। আমার অটোবায়োগ্রাফি। আমার সঙ্গে তার অনেক বিষয় নিয়ে কথা হতো। তবে সিনিয়রদের সঙ্গে তিনি ফরমালি কথা বলতেন।

গত সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই মৃত্যুবরণ করেন . আকবর আলি খান। তার মতো দক্ষ আমলা, লেখক, গবেষক খুব কমই দেখা যায়। তিনি প্রশাসনে যেমন দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন ঠিক তেমনি বাকি জীবন কাটিয়েছেন। সত্য কথা বলতে কখনো তাকে ভীত হতে দেখিনি। আজীবন সৎ ছিলেন, অন্যায়ের কাছে কখনো নতি স্বীকার করেননি। তার মৃত্যুতে আমরা একজন আইকনিক ব্যক্তিকে হারালাম।

 

. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

আরও