বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা ২০২২ সালের অধিকাংশ
সময় নিজেদের
এভাবে আশ্বস্ত
করেছেন, যদি
বৈশ্বিক অর্থনীতি এরই মধ্যে মন্দার
কবলে পড়ে
তাহলে এটি
একটি ক্ষেত্রে পতিত হয়েছে। কিন্তু
এ বছরের
শেষে বৈশ্বিক
মন্দা ২০২৩
সালের দিকে
ধাবিত হয়ে
গেছে।
স্পষ্টভাবে মন্দার সময়ের প্রতিবেদনে বছরের অর্ধেকটাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক পরিপক্বতার কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। বিশেষ
করে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার যেভাবে সংকটপূর্ণ ছিল সেটি প্রণিধানযোগ্য। এছাড়া আত্মবিশ্বাস থাকা
সত্ত্বেও অনেকে
আবার মন্দার
অনিবার্যতা দাবি
করছে। এক্ষেত্রে আগামী বছরে মন্দার
সম্ভাবনা শতভাগের
কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ইউএস ফেডারেল
রিজার্ভ এবং
অন্যান্য প্রধান
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে দ্রুত সুদের
হার বাড়ছে।
ফলে ২০২৩
সালে মন্দার
৫০ শতাংশ
সম্ভাবনা রয়েছে
এবং কিছু
ক্ষেত্রে পরবর্তী
দুই বছরে
এটি ঘটার
৭৫ শতাংশ
সম্ভাবনা থেকে
যাবে।
ইউরোপে
জ্বালানির মূল্য
একাধারে বেড়ে
যাওয়া মন্দার
প্রধান সম্ভাব্য কারণ বলে গণ্য
হচ্ছে, যা
প্রথাগত জ্ঞানের
ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে জিডিপির দুই প্রান্তিক হ্রাসকে নিরূপণ করে।
চীনের ক্ষেত্রে এটি মন্দভাবে দেখা
গেছে। দেশটিতে
ইউরোপের মতো
একই সমস্যা
রয়েছে। এর
সঙ্গে ভূসম্পত্তির মালিকানা পতন, কভিড-১৯ সংক্রমণের ঢেউ, পর্যাপ্ত টিকা
প্রদান ব্যতীত
অর্থনীতি পুনরায়
উন্মুক্ত করে
দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও জড়িত।
যখন
আগামী বছর
চার দশক
ধরে স্থিত
ঐতিহাসিক অবস্থানের তুলনায় চীনের প্রবৃদ্ধি অনেক ধীরগতির হবে
বলে ধরে
নেয়া হচ্ছে,
যার ফলে
দেশটির জিডিপি
দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হয়ে যাবে
বিষয়টি এমন
নয়। সর্বোপরি এমনকি চীনে ২০০৮
সালে বৈশ্বিক
অর্থনৈতিক সংকটের
চূড়ান্ত সময়ে
জিডিপি বৃদ্ধি
৮ শতাংশে
নেমে এসেছিল,
এটি স্থানীয়
উৎপাদন সংকুচিত
হওয়ার চরম
সময়ের জন্য
যথেষ্ট ছিল
না। যা
এখন পর্যন্ত
মন্দা নিরূপণের ত্রুটির ক্ষেত্রে নেতিবাচক জিডিপির প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক দুটি প্রান্তিকের প্রভাব
বিস্তারের আরেকটি
উদাহরণ হিসেবে
গণ্য হয়।
তাছাড়া
অনেক দেশের
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
স্থানীয়ভাবেই তৈরি
হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতিগত ত্রুটি যেভাবে
অনুমিত ছিল
সেভাবেই ক্ষতিকর
থেকেছে। উদাহরণ
হিসেবে বলা
যায়, ২০১১-২১ সালের
মধ্যে প্রয়োজন
ছাড়াই গভীরভাবে ইউরোপ রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। যখন ক্রেমলিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
ঘোষণা করল,
তখন প্রক্রিয়াটি খুবই দুর্বল হয়ে
যায়। চীনের
কঠোর শূন্য
কভিড নীতির
ক্ষেত্রে উচ্চ
অর্থনৈতিক মূল্যের
প্রয়োজন হয়েছে।
যখন দেশটিতে
মহামারীর বিধিনিষেধ কীভাবে শিথিল করা
হবে এটির
জন্য পরিকল্পনার অনুপস্থিতি থাকে, তার
অর্থ দাঁড়ায়
চীনের নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিছক কভিডের
মৃত্যুহারকে স্থগিত
করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার দিক থেকে
অনেক ভুল
করেছে। এর
মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক অকুণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়া
এবং বিশ্ব
বাণিজ্য সংস্থা
ও সংস্থাটির বাণিজ্য কাঠামো যা
সংস্থার সদস্যরা
অনেক বছর
সমঝোতার মাধ্যমে
উপনীত হয়েছে,
সেটিকে উপেক্ষা
করেছে। দেশটির
সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক
নীতি ভুল
ছিল। বর্তমান
প্রেসিডেন্ট জো
বাইডেনও সেগুলো
পরিবর্তনে খুব
সামান্য ভূমিকাই
রেখেছেন। যদিও
বিশ্ব বাণিজ্য
সংস্থার নির্দেশনা অবজ্ঞা করে ‘আমেরিকান পণ্য’ ক্রয়ের নিয়মের
ক্ষেত্রে তার
মূল্যস্ফীতি হ্রাসের
কাজটি প্রশংসনীয় হয়েছে।
যদিও
উচ্চ সুদহারের ক্ষেত্রে অনুমিত প্রভাব
এখনো প্রতীয়মান হয়নি। এক্ষেত্রে অবশ্য
সবকিছুর বুদ্বুদ
চূড়ান্তভাবে বিস্ফোরিত হওয়ার সংকেত পাওয়া
গেছে। ২০২২
সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের মূল্য
শীর্ষে পৌঁছলেও
এটি আবার
তখন থেকেই
নিম্নগামী হয়েছে।
বন্ড, রিয়েল
এস্টেট ও উদীয়মান বাজারসম্পদও সে বছর নিম্নগামী ছিল।
২০২১
সালের জুলাইয়ে
আমি যুক্তি
দেখিয়েছিলাম অর্থনৈতিক বাজারে প্রভাব বিস্তারকারী সম্পদের বুদ্বুদগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার ৯০ শতাংশ
সম্ভাবনা রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে উচ্চমূল্যায়নের ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড, উপার্জন
বা আয়
সুস্পষ্টভাবে নির্দেশক ছিল। যদিও এ সময়ের ক্ষেত্রে গত বছর প্রকৃত
এমনকি নামমাত্র সুদের হার শূন্য
অথবা নেতিবাচক ছিল। এক্ষেত্রে নিম্নছাড়ের মূল্য কার্যত যেকোনো
সম্পদের মূল্যের
মাত্রাকে বোঝায়,
যা ভবিষ্যতের আয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান
ছাড়কৃত মূল্যকে
যৌক্তিক করে
তোলে।
এ বছর গেমস্টপ,
ক্রিপ্টোকারেন্সি, এনএফটিএস এবং
বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের মিম স্টক
কোম্পানিগুলোর চার
ধরনের সম্পদ
‘আমি একটি
বুদ্বুদ’ বলে
আওয়াজ করার
মধ্য দিয়ে
শুরু হয়েছিল।
প্রতিটিই উদ্ভাবনীমূলক ছিল, যদিও এটি
ভালো কোনো
উপায়ে প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়নি এবং
সবকিছুই বছর
শেষে বন্ধ
হয়ে যায়।
কিন্তু
বুদ্ধিমান উদ্যোক্তারা এসব প্রত্যাখ্যানকে কি
সুযোগ এবং
‘খাদ ক্রয়
করা’ হিসেবে
দেখছেন? পুঁজির
মূল্য তিন
বছর আগে
যে জায়গায়
ছিল সেখানে
এখনো প্রত্যাবর্তন করেনি। বস্তুত মহামারীর কোনো এক সন্ধ্যায় কল্পনা করা যৌক্তিক
যে এটি
অর্থনৈতিক মূলনীতির সমান্তরালে ফেরার আগেই
নিম্নগামী হতে
পারে। ঠিক
একইভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির বেলায়ও হয়, যার
কোনো ভিত্তিমূল্য নেই বলা যায়।
আগামী
বছর বিশ্ব
অর্থনীতি কঠিন
হবে বলা
হচ্ছে। তবে
এ আসন্ন
অতিমন্দা ভাব
সম্ভবত মন্দা
হিসেবেও গণ্য
হবে না।
এমনকি দুটি
ধারাবাহিক প্রান্তিকের মানদণ্ড খুবই সংকীর্ণ
ছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক
প্রবৃদ্ধি একক
প্রান্তিকে কদাচিৎ
শূন্যের নিচে
নেমে এসেছিল।
এখন দুটি
প্রান্তিকের কথা
গণ্য করা
হলে তেলের
গুরুতর বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট ১৯৭৪
ও ১৯৮১
সালের মন্দা
কিন্তু বৈশ্বিক
মন্দা হিসেবে
সাব্যস্ত হয়নি।
এমনকি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান, মন্দার সময়েও
উদীয়মান এবং
উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে উন্নত অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতায় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা
যায়। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুটি ব্যতিক্রম হচ্ছে ২০১৮ সালে
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২০
সালে কভিড-১৯-এর
সংকট। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড
ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)
ও ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৩ সালে ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ২৭
শতাংশে উন্নীত
হওয়ার প্রত্যাশা করছে, যা বিশ্ব
অর্থনীতিকে ধারাবাহিক প্রান্তিকগুলোয় সংকুচিত হওয়া
অসম্ভব করেছে।
এমনকি
যদি আমরা
জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস ২ দশমিক
৫ শতাংশের
নিচে শিথিলভাবে রয়েছে এভাবে বৈশ্বিক
মন্দাকে নির্ধারণ করতে যাই, তাহলে
২০২৩ সালে
বৈশ্বিক মন্দা
কঠোরভাবে অতীত
উপসংহারে রূপান্তরিত হবে। এটি কি
সম্ভব? অবশ্যই।
কিন্তু এটি
সামগ্রিকভাবে বর্জনীয়
বটে।
[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক
রিসার্চের গবেষণা
সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেছেন
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: তৌফিকুল ইসলাম