দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জানুয়ারি এক মহাসন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমাদের অর্থনীতিকে যখন উন্নত বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি, তখন এক বিস্ময়কর সত্য ফুটে ওঠে। লন্ডনভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩৯ সালের মধ্যে বিশ্বের ২১তম বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে। এ তথ্য আমাদের নির্দেশ করে যে আগামী এক দশকে আমরা ইউরোপের শক্তিশালী বেশকিছু দেশকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের জিডিপি প্রায় ৪৫৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি নির্দেশ করে বিশ্ব মন্দার মধ্যেও আমাদের অর্থনীতি সুসংহত। এ গতিধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা শীর্ষ ১০-এ স্থান পেতে পারি।
বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম এবং তাদের গড় বয়স ২৭ দশমিক ৯ বছর। এ তথ্য নির্দেশ করছে, জাপান বা জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলো যখন ‘এজিং পপুলেশন’ বা বার্ধক্যজনিত জনশক্তিতে ভুগছে, তখন বাংলাদেশের জনশক্তির একটি বড় অংশই তরুণ।
দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর নতুন করে ২১ লাখ তরুণ যুক্ত হচ্ছে। এ জনশক্তিকে যদি সঠিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া যায় তাহলে আমরা পুরো বিশ্বে দক্ষ শ্রমশক্তিতে পরিণত হব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪) অনুযায়ী দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা আমাদের মেধাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অর্থনীতির অন্যতম খাত রফতানি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৬ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট রফতানি আয়ের চেয়ে যা ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে মোট রফতানির পরিমাণ ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। রফতানি আয় বাড়াতে হলে রফতানি বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিটি সেবা রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৭২৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। রফতানির এ পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় একেবারেই তা নগণ্য। এ সময় রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার। রফতানির এ প্রবৃদ্ধি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায়ও অনেক কম।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বিগত বছরগুলোর তুলনায় কমেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসীরা অর্থ পাঠাতে শুরু করেছেন।
নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রভাব বিস্তার করতে হবে। বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারলেই বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশ। আমাদের প্রতিটি ধাপে সুসংহত বিজয় অর্জন করতে হবে। আমাদের এ অর্থনৈতিক বিদ্রোহই হবে আগামীর মুক্তিকামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ
দাউদ ইব্রাহিম হাসান: গবেষণা সহকারী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়