পর্যালোচনা

মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিতে আর কত দিন?

২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়েছে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। বিশ্বে এ দিবস বেশ আগে থেকে পালন করা হলেও বাংলাদেশে দিবসটি বেসরকারি উদ্যোগে ২০০৬ সাল থেকে পালন করা হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ

২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়েছে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। বিশ্বে দিবস বেশ আগে থেকে পালন করা হলেও বাংলাদেশে দিবসটি বেসরকারি উদ্যোগে ২০০৬ সাল থেকে পালন করা হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সরকারি উদ্যোগে অনেক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বেসরকারি সংস্থাকে নিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে। ডিটিসিএর উদ্যোগে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের বছরের প্রতিপাদ্য ছিলগণপরিবহনে হেঁটে চলি, ব্যক্তিগত গাড়ি সীমিত করি। প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ডিটিসিএর উদ্যোগে ২২ সেপ্টেম্বর আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল নগরে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে নীতিনির্ধারক অংশীজনদের নিয়ে ভবিষ্যত্ কর্মকৌশল নির্ধারণ করা। সেমিনারে একজন আলোচক আলোচনা অনুষ্ঠানে আসা বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন রাখেন, ‘শেষ কবে আপনি নগরের গণপরিবহনে চড়েছেন?’

যাত্রীবাহী সিটি বাস, বিভিন্ন ধরনের প্যারা ট্রানজিট তথা টেম্পো, ম্যাক্সি, অটো প্রভৃতি গণপরিবহন আমাদের নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত নাগরিকদের ঢাকা মহানগরীতে চলাচলের অন্যতম প্রধান বাহন। সিএনজি, রিকশা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সাধারণ কাজে ক্ষেত্রবিশেষে জরুরি প্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবে কাজ করে। ইদানীং এয়ারপোর্ট থেকে নগরের ফার্মগেট-খিলগাঁও-মতিঝিল আসতে অনেকে ট্রেনও ব্যবহার করে। সবই সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের বাহন। আমাদের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক ব্যবহারের কারণে গণপরিবহনগুলোর বর্তমান অবস্থা জানা থাকলেও নগরের অনেক বিশিষ্টজনের যেহেতু কালেভদ্রেও লোকাল বাসে চড়তে হয় না, সে কারণেই তাদের জানা থাকার কথা নয় আমাদের লোকাল বাসগুলো কিংবা গণপরিবহনগুলোর দীন-হীন দশার কথা। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আমাদের দেশের তিলোত্তমা রাজধানীর লোকাল বাসগুলোর অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ফিটনেসবিহীন, ট্যাপ খাওয়া, চলটে ওঠানো, যার জানালার ভাঙা কাচ দিয়ে গরম রোদ কিংবা অতিবর্ষণের বৃষ্টি কোনো কিছুর প্রবেশই বাদ যায় না; যার ভেতরে চলাচল করে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ সাধারণ জনগণ।

যখন গণপরিবহনের চিত্র, তখন বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসে আমাদের যাতায়াত-যানবাহন-গণপরিবহন সম্পর্কিত নীতি, কর্ম-কৌশল নির্ধারণ বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যাদের কেউই অন্তত নিম্নবিত্ত বা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়তো নয়, তাদের জন্যই প্রশ্নশেষ কবে আপনি নগরের গণপরিবহনে চড়েছেন?’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই হয়তো অন্তর্নিহিত ঢাকার গণপরিবহনের অন্তহীন দুর্দশার ব্যাখ্যা একই সঙ্গে তার সমাধান সূত্র।

আমাদের নির্মম করুণ বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে সেমিনারে কলাম লেখক সেমিনার অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের অধিকাংশই অনুষ্ঠান শেষে গণপরিবহনে না চড়ে, ব্যক্তিগত গাড়ি করে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরত গেছেন। এর অন্যতম কারণ যদিও একটি বিশেষ দিনের জন্য। অনুষ্ঠানের আলোচকরা আন্তরিকভাবে আগ্রহী হলেও বাংলাদেশের গণপরিবহনের বর্তমান বাস্তবতার ন্যূনতম ধারণা থাকার কারণে হলেও গণপরিবহনে চড়ে বাড়ি ফেরার সাহস করতে অতিমাত্রায় আন্তরিকজনও এক্ষেত্রে পিছপা হবেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের বছরে আমাদের রাজধানী শহরের গণপরিবহনের চিত্র পুরো জাতির জন্যই নির্মম হতাশার। 

মহানগরের গণপরিবহনের চিত্র কতটা দুর্বিষহ, তা বোঝাতে আমাদের নগরের নীতিনির্ধারকদের একটু এয়ারপোর্ট এলাকায় ঘুরিয়ে নিয়ে আসা যেতে পারে। এলাকায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থাকার কারণে এটি একটি মাল্টিমোডাল হাব (বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের মিলনস্থল) বিশ্বের যেকোনো আধুনিক কিংবা গড় মানের শহরেও ধরনের এলাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা হয়। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশনে নেমে আপনি বাস কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ঢাকা শহরের বিভিন্ন গন্তব্যে যাবেন, এমন কোনো ব্যবস্থাই এখনো নেই। অথচ কয়েক বছর আগেও বিমানবন্দর এলাকায় অন্তত অনেক সিটি বাসের কাউন্টার ছিল। নগর কর্তৃপক্ষের কাছে এর জবাব চাইলে হয়তো উত্তর পাওয়া যাবে, বিআরটি কিংবা অন্য কোনো মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে, তাই বাস কাউন্টার এখন উধাও। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পৃথিবীতে আর কোনো দেশে কিংবা কোনো শহরে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না, শুধু আমাদের সোনার বাংলায়ই জনগণকে সেবা দিতে এমন কর্মযজ্ঞের আয়োজন হয়, যেখানে গণপরিবহনের কাউন্টার নির্মূল করে দিয়েই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।

আমাদের যারা নীতিনির্ধারক কিংবা অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (যাদের আমরা ভিআইপি বলি) তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের জানালা ভেদ করে সাধারণ মানুষের গণপরিবহনের হাহাকার হয়তো তেমন পৌঁছে না। তাই বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে বিআরটিসির প্রতিনিধি অকপটে স্বীকার করে নিলেন, গত ১০ বছরে ঢাকা শহরে সরকারি বিআরটিসি বাসের সংখ্যা যেমন বাড়েনি, তেমনি প্রাইভেট বাসের সংখ্যাও বাড়েনি। অথচ দুই কোটি লোকের রাজধানী শহরে মানসম্মত প্রয়োজনীয় বাস সার্ভিস হওয়ার কথা ছিল। কারণ নগর পরিবহন ব্যবস্থার বিজনেস মডেল টেকসই হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক গণমানুষ এখানে প্রতিদিন নগর এলাকায় যাতায়াত করে, যা বিশ্বের অনেক শহরের জন্য টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়তে কাঙ্ক্ষিত ছিল। ঢাকা শহরে কয়েক হাজার মানসম্মত বাস নামানো হবেকথাটি নগর কর্তৃপক্ষগুলোর কাছ থেকে অনেক বছর শোনা গেলেও সে বাসগুলোর দেখা এখনো নগরবাসী পায়নি। কিন্তু এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-শীতলক্ষ্যায় অনেক পানি বয়ে গেছে, ঢাকার রাস্তা হাজার হাজার মোটরসাইকেলে সয়লাব, গণপরিবহন না পেয়ে আমাদের তরুণ-তরুণীরা সাইকেলে চড়তে গিয়ে বেপরোয়া ট্রাক-বাসের ধাক্কায় বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। এদিকে মেট্রোরেল-এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে নগর সয়লাব, মেট্রোরেলের বগি আগমনের ঘটা অনুষ্ঠানও হয়েছে ঢাকঢোল পিটিয়ে, নগরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে নগরে মেট্রোরেলের লাইন--এর কাজও চলছে পুরোদমে। শুধু নগরে আমাদের অতিসহজসাধ্য পাবলিক বাস নামানোর কাজ করা যায়নি এতসব মেগা প্রকল্পের তোড়জোড়ের ভেতর। 

যেকোনো আধুনিক নগরের মেট্রোরেল থাকুক আর না থাকুক, মানসম্মত বাস সার্ভিস নগরের পরিবহন ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রে থাকে; সেটা প্যারিস, লন্ডন, বেইজিং, সাংহাই, নিউইয়র্ক, দিল্লি কিংবা কলকাতাযে শহরের কথাই বলি না কেন। আমাদের বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ চলছে বহু বছর ধরে, কিন্তু এর বাস্তবায়নের শম্বুকগতি আমাদের নগরবাসীর গণপরিবহন নিয়ে অন্তহীন দুর্ভোগ বাড়িয়েই চলেছে। অথচ আমাদের বাস সার্ভিস উন্নতকরণের চেষ্টা পরিবহন পরিকল্পনার একদম পেছনের প্রাধিকারে আছে। আমাদের নগরের পরিবহন সমস্যার একমাত্র রেসিপি হিসেবে বলা হচ্ছে মেট্রোরেল আসছে...হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো মেট্রোরেল আমাদের নগরের যানবাহন সমস্যার সব সমস্যাকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসবে। ঢাকা শহরের মতো মহানগরে যেখানে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই শহরের প্রাণ, সেখানে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মানসম্মত বাস সার্ভিস, কমিউনিটিভিত্তিক প্যারাট্রানজিট সার্ভিস, অযান্ত্রিক বাহন সাইকেল-হাঁটাপথ পরিকল্পনা প্রভৃতি বহু মাধ্যমের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা আমাদের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা ২০০৫- নির্দেশিত ছিল।

রাজধানীতে যানজট কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম অভিজাত এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহন প্রবেশের সময় ফি আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। যদিও ভিআইপি এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কোন পদ্ধতিতে ফি আদায় করা হবে, স্পষ্ট করা হয়নি এখন পর্যন্ত। নগর এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোর জন্য বিশ্বের অনেক শহরেই ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর কনজেশন চার্জ আরোপ করা হয়, যা দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রেটে হতে পারে। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম কমানোর জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করার সিদ্ধান্তকে আমরা নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে শুধু অভিজাত এলাকায় সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করলে বিষয়টি ফলপ্রসূ হবে না। ফলে পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঢাকা শহরের কোন কোন সড়ক নগর এলাকায় কনজেশন চার্জ প্রয়োগ করা যেতে পারে, তা নির্ধারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি ধরনের সিদ্ধান্তের সুফল পেতে গণপরিবহন হাঁটাপথ তথা ফুটপাত ব্যবস্থার দ্রুত পরিকল্পিত উন্নয়ন করা একান্ত প্রয়োজন।

বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস উদযাপনের পর নাগরিকদের পক্ষ থেকে নগর পরিকল্পনাবিদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের খুব ছোট্ট একটা দাবি তুলতে চাই, আমার প্রৌঢ় বাবা এয়ারপোর্ট থেকে আজিমপুর যেতে চান, আমার আদরের বোনটি হয়তো যেতে চান রামপুরা থেকে যাত্রাবাড়ী; তাদের জন্য মানসম্মত বাস সার্ভিস দিন।

রাষ্ট্রের নাগরিকরা গণপরিবহনের ন্যায্য ভাড়া দিতে প্রস্তুত, অর্ধশত বছর পার করা রাষ্ট্রের মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিতে আর কত দিন লাগবে?

লেখক: . আদিল মুহাম্মদ খান, নগর পরিকল্পনাবিদ সাধারণ সম্পাদক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এবং অধ্যাপক, নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও