ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ আপাতত থেমে যাওয়ার পর, ফিলিস্তিন প্রশ্নকে ঘিরে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ আবারো নতুন করে জোরদার হয়েছে। এ অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা, দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্নটি আবারো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় এবং জি-৭ গোষ্ঠীর একাধিক রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা অন্যতম। এ পদক্ষেপগুলো শুধু প্রতীকী নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার মতো কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছে যে তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। এ ঘোষণার মাধ্যমে ফ্রান্স ইউরোপীয় কূটনীতিতে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেছে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি সমাধানে ফিরে আসার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বৃদ্ধির পথে হাঁটছে। এটি শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং একটি পরিপক্ব কূটনৈতিক কৌশল, যা দীর্ঘদিনের স্থবির শান্তি আলোচনাকে পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ফ্রান্স ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাজ্য জানিয়েছে—তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে, যদি না ইসরায়েল চারটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে: গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে, মানবিক সহায়তার প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে, পশ্চিম তীরে দখল ও নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি কাঠামোর প্রতি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। যুক্তরাজ্যের এ অবস্থান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে তারা মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখার মধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
অন্যদিকে কানাডা জানিয়েছে—তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে, তবে তা কয়েকটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কারের শর্তসাপেক্ষে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন এবং সেই নির্বাচনে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে অপসারণ নিশ্চিত করা। এভাবে কানাডা একদিকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব গঠনের ওপরও জোর দিচ্ছে।
এ পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউরোপ ও জি-৭ রাষ্ট্রগুলো এখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়াকে কেবল কূটনৈতিক সহানুভূতি হিসেবে নয় বরং ইসরায়েলের প্রতি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পেছনে রয়েছে একাধিক প্রেক্ষাপট: গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষ, শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিক অভিযোগ এবং পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপন ও দখলদারত্বের প্রসার এবং এসব দেশে প্রবলভাবে ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি জনমত গড়ে উঠেছে ও এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে এক গভীর দোদুল্যমান অবস্থানে এনে ফেলেছে। অতীতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান মধ্যস্থতাকারী কিন্তু এখন ইউরোপের একতরফা কূটনৈতিক অগ্রগতি মার্কিন নেতৃত্বকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে—একটি বাস্তবমুখী, সুসংগঠিত কূটনৈতিক রূপরেখা গ্রহণ করা, যা গাজা উপত্যকার অবনতিশীল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেই শুধু নয় বরং সামগ্রিক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমাধান খুঁজে পেতেও সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর আসন্ন বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে।
তবে এ সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকবে—যদি যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ় ও সুপরিকল্পিত কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপথ এমনভাবে রূপ নিতে পারে, যা মার্কিন স্বার্থ ও প্রভাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে এবং এ প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য—আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ—প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলা চালানোর আগমুহূর্তে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো—যারা বহুদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তাদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ছিল। এর কারণ ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতির পতন, পুনরায় সশস্ত্র সংঘর্ষের শুরু এবং পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব ও সহিংসতার ক্রমবৃদ্ধি। ইউরোপীয় কূটনীতির ভাষা তাই ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে উঠছিল এবং অনেক দেশ ইসরায়েলি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা স্থগিতের ঘোষণা দিচ্ছিল।
একই সময়ে, ইসরায়েলের আরব মিত্র রাষ্ট্রগুলোও জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করে। মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়, যা ছিল এক স্পষ্ট বার্তা যে আব্রাহাম চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কও ইসরায়েলের দমননীতির অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে প্রস্তুত নয়।
এ প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও ফ্রান্স একটি নতুন কূটনৈতিক সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের অংশগ্রহণ বা সম্মতি ছাড়াই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার একটি পথ তৈরি করা। ঠিক এই সময়েই ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। ইউরোপ ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার সমর্থন করে একত্রিত হয়, আরব রাষ্ট্রগুলো চরম উদ্বেগে পড়ে যায় এবং সৌদি-ফ্রান্স উদ্যোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে জোরালো সহায়তা প্রদান করছে। আরব রাষ্ট্রগুলো এখনো ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া নিয়ে শঙ্কিত, তবে এ সংঘাত সীমিত পরিসরে রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে এখনো তার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবু, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের চরম অবনতি, গাজায় মানবিক সংকটের ধ্বংসাত্মক পরিণতি, বসতকারীদের সহিংসতার প্রসার এবং পশ্চিম তীর দখলের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক জনমতকে পুনরায় আন্দোলিত করেছে।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের পুরনো হতাশা থেকে সরে এসে এখন আবারো স্থগিত সম্মেলনগুলো পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে। এ মুহূর্তে যদি ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ না করে এবং একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান না নেয়, তাহলে বৈশ্বিক কূটনীতি এমন এক পথে চলে যেতে পারে যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।
গাজা সংকট
গাজায় চলমান যুদ্ধের অবসান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর তাৎপর্য কেবল মানবিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের যে কোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। ইরান যুদ্ধ সাময়িকভাবে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি গাজার বাইরে সরিয়ে নিলেও এ সংঘাতই গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—এ নতুন সুযোগের পথ আগের চ্যালেঞ্জগুলোয় বাধাগ্রস্ত এবং সেসব বাধা এখনো বহাল রয়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যে শর্তগুলো নির্ধারিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: গাজায় বন্দি ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজায় হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে অপসারণ। এ শর্তগুলো রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে কঠিন, কিন্তু ইসরায়েল তা বাস্তবায়নের জন্য অনড়। বিপরীতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা গাজায় অবস্থানরত হামাস নেতৃত্বের হাতে, যারা এখন পর্যন্ত বাইরের কোনো চাপেই উল্লেখযোগ্যভাবে সাড়া দেয়নি। তাদের প্রতিরোধ-নীতি, কঠোর অবস্থান এবং কৌশলগত জটিলতা গাজায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে দুরূহ করে তুলছে।
এ প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কাতার ও মিশরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে আরো সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা এবং তাদের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে হামাসের বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা উপরের শর্তগুলো খোলাখুলিভাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এ ধরনের চাপ গাজায় অবস্থানরত মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের ওপরও মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতির পথ খুলে দিতে পারে।
একই সঙ্গে প্রধান আরব রাষ্ট্রগুলো যেমন সৌদি আরব, জর্ডান, মিসর—তাদের কাছ থেকেও একটি নির্ভরযোগ্য, সরাসরি ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে আরব রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান যুদ্ধবিরতির শর্তগুলোকে আন্তর্জাতিক মান্যতা দেবে। এ প্রসঙ্গে, প্যালেস্টাইনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ২০২৫ সালের জুন মাসে সৌদি আরব ও ফ্রান্সকে যে চিঠি দিয়েছেন—তাতে এ ধরনের একটি অবস্থানকে সমর্থন করা হয়েছে, যা এ প্রচেষ্টার বৈধতা ও গতি বাড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য যে ‘ডে আফটার প্ল্যান’ বা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার প্রয়োজন—তা এখনো স্পষ্ট নয় অথচ অত্যন্ত জরুরি। গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে, কে প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করবে, পুনর্গঠনের অর্থায়ন কে করবে—এ প্রশ্নগুলো এখনো ঝুলে আছে। যদিও কিছু আরব রাষ্ট্র (বিশেষ করে মিসর ও কাতার) এরই মধ্যে গাজায় পুনর্গঠনে অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তারা তখনই সম্পদ, অবকাঠামো ও জনবল বিনিয়োগে রাজি হবে যদি কয়েকটি কৌশলগত শর্ত পূরণ হয়।
প্রথমত, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা গাজা অঞ্চল অনির্দিষ্টকালের জন্য দখলে রাখবে না। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে প্যালেস্টাইন অথরিটির(পিএ) ভূমিকাকে স্বীকার করতে হবে—এমনকি যদি তা প্রতীকী বা সীমিত প্রশাসনিক দায়িত্বে হয়। এ গ্যারান্টিগুলো ছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলো গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে ইতস্তত করবে।
এছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলো চাইছে যে গাজায় তাদের অংশগ্রহণ ও সহায়তা কেবল একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগ হিসেবে না থেকে, বরং এটি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে পৌঁছানোর বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হোক এবং এ প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন ইউরোপ, আরব রাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র ও প্যালেস্টাইনি নেতৃত্ব—সব পক্ষ একযোগে একটি সমন্বিত কাঠামোতে কাজ করবে।
নীতিগত সুপারিশ: স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ
কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীদের সক্রিয় করতে হবে
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কাতার ও মিসরের ওপর তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যেন তারা গাজায় অবস্থানরত হামাস নেতাদের সঙ্গে সরাসরি ও ফলপ্রসূ আলোচনায় বসে। তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতির পূর্বশর্তগুলোর বিষয়ে (যেমন: জিম্মি মুক্তি, অস্ত্র সংবরণ) স্পষ্ট অগ্রগতি আনা। বিশেষ করে কাতার-ভিত্তিক হামাস নেতৃত্বকে এ বার্তা দিতে হবে, যদি তারা আন্তর্জাতিক চাহিদার প্রতি সাড়া না দেয়, তবে তারা শুধু রাজনৈতিক বৈধতা নয়, আঞ্চলিক সমর্থনও হারাবে।
মানবিক যুদ্ধবিরতির জন্য ইউরোপ ও আরব মিত্রদের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা
গাজার মানবিক পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একটি সর্বজনীন যুদ্ধবিরতির জন্য সম্মিলিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নেয়া। ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে মিলে একটি সমন্বিত বিবৃতির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির দাবি এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। এতে শুধু আন্তর্জাতিক ঐক্য প্রদর্শিত হবে না বরং এটি যুদ্ধপীড়িত জনগণের জীবন বাঁচানোর একটি বাস্তব পদক্ষেপ হবে।
মধ্যমেয়াদি কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘Day After’ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন
গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই নেতৃত্ব নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন একটি অন্তর্বর্তী ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে: প্যালেস্টাইন অথরিটি, আরব রাষ্ট্র (যেমন সৌদি আরব, জর্ডান, মিসর) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি।
এ প্লাটফর্ম গাজার প্রশাসনিক পুনর্গঠন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক সহায়তার একটি বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করবে।
ইউরোপীয় স্বীকৃতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সমন্বয়
ইউরোপ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার পথে এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এ প্রক্রিয়া থেকে আলাদা হয়ে না থেকে, তা নিজের কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা। এতে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে শর্তসাপেক্ষ ও ধাপে ধাপে স্বীকৃতির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে, যা আলোচনার জন্য বাস্তব ভিত্তি স্থাপন করবে।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
আব্রাহাম চুক্তিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির কাঠামোয় রূপান্তর
বর্তমানে আব্রাহাম চুক্তি ইসরায়েল ও কিছু আরব রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বীকৃতির চুক্তি। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অন্তর্ভুক্ত না করলে এই চুক্তি ভবিষ্যতে বৈধতা হারাতে পারে। তাই এখন দরকার, আব্রাহাম চুক্তিকে একটি আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা প্লাটফর্মে রূপান্তর করা, ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্পষ্ট অন্তর্ভুক্তির রোডম্যাপ সংযুক্ত করা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে দুই-রাষ্ট্র সমাধানে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য মাইলফলক নির্ধারণ
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল। এজন্য দরকার: সম্মতিসূচক সময়সূচি, পর্যবেক্ষণযোগ্য ও যাচাইকৃত পদক্ষেপ (যেমন: যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, নির্বাচনের আয়োজন, বসতিস্থাপন বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত সহায়তা কাঠামো এই ধাপভিত্তিক কাঠামো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি করবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাস্তব অগ্রগতি আনবে।
সানজিদা বারী : ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো