পাকিস্তান এখন ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা ধারণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। দেশটির অর্থনীতি প্রায় শ্রীলংকার মতো দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু চীন ও সৌদি আরবও এখন আর পাকিস্তানের দুরারোগ্য ভিক্ষাবৃত্তির ভার নিতে নারাজ। দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভয়ানক লোডশেডিংসহ প্রায়ই গ্রিড-ফেইলিউরের শিকার হচ্ছে। পাকিস্তানি রুপিতে ডলারের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে ১ ডলার এখন ২৯০ রুপিতে বিক্রয় হচ্ছে। অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এমন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন এক কেজি আটার দাম ১৬০ রুপি ছাড়িয়ে গেছে, এক কেজি চিনির দাম ৩০০ রুপির বেশি।
পাকিস্তান যে অনেকটা ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত হচ্ছে সেটা বেশ আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এর প্রধান কারণ সাড়ে পাঁচ লাখ সদস্যের সেনাবাহিনীসহ সাত লাখের একটি সশস্ত্র বাহিনীর বোঝা বহন করা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অবশ্য জন্মশত্রু ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য এত বড় সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলেছে তারা। কিন্তু এত বড় একটি সশস্ত্র বাহিনী পোষার খেসারত হলো, বাংলাদেশের জন্মের আগেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটির প্রকৃত শাসনক্ষমতা ১৯৪৮-৫৮ পর্বে পর্দার আড়াল থেকে এবং ১৯৫৮-৭১ পর্বে সরাসরি সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের করতলগত হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশকে হারানোর পর ১৯৭১-২০২৩ পর্বেও পাকিস্তানের শাসকের ভূমিকা থেকে সামরিক বাহিনীকে বেশি দিন দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, কিছুদিন পরপর সামরিক একনায়করা পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করছে। আবার যখন কিছুদিনের জন্য সামরিক বাহিনী সিভিলিয়ান শাসকদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে তখনো শাসনক্ষমতার প্রকৃত লাগাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিয়েছে তারা। বর্তমান পর্বে ইমরান খান নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রিয়পাত্র হিসেবে তাদের মদদে, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেনাপ্রধান কমর বাজওয়ার সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে ২০২২ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহবাজ শরিফকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনেও যে সামরিক এস্টাবলিশমেন্টই কলকাঠি নেড়েছে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি।
১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তান সরকারের বাজেটের প্রধান খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিরক্ষা খাত, গত ৭৫ বছরেও ওই অবস্থান থেকে সে খাতকে সরানো যায়নি। কিন্তু এ অসহনীয় বোঝা যে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে ‘মেল্টডাউনের গিরিখাতে’ ধাবিত করছে সেই সত্যটা বিশ্বের সামনে নগ্নভাবে উদ্ভাসিত হতে চলেছে। বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ পাকিস্তানের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে এখন ২৩ কোটি অতিক্রম করেছে, যাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার জোগান দেয়া এত বড় সশস্ত্র বাহিনীর ভরণপোষণ মেটানোর পর কোনোমতেই পাকিস্তানের কোনো শাসক দল বা জোটের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। দেশটির বার্ষিক রফতানি আয় এখনো ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়ে গেছে, অথচ আমদানি ব্যয় ৮০-৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাচ্ছে প্রতি বছর। প্রতিরক্ষা খাতের বিপুল ব্যয় বরাদ্দ মেটানোর পর জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা সরকারের সাধ্যের বাইরে থেকে যাচ্ছে প্রতি বছর। ফলে এ দুটো খাতে পাকিস্তান ক্রমে পিছিয়ে পড়ায় জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকের বিশ্ব রÅাংকিংয়ে পাকিস্তানের অবস্থান প্রতি বছর নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যেখানে এক্ষেত্রে ক্রমোন্নতির ধারায় ১২৯ নম্বর অবস্থানে উন্নীত হয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান নেমে গেছে ১৬১ নম্বরে। ১৯৪৭-৭১ পর্বে পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে শোষণ, বঞ্চনা, সীমাহীন বৈষম্য ও লুণ্ঠনের অসহায় শিকারে পরিণত করেছিল পাকিস্তানের শাসকরা, যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে ৭০ শতাংশ কম ছিল। অথচ ২০১৫ সালেই মাথাপিছু জিডিপির বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তুলনাটা দেখুন: ১) মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের তুলনায় ৬৫ শতাংশ এগিয়ে গেছে; ২) বাংলাদেশের রফতানি আয় পাকিস্তানের দ্বিগুণেরও বেশি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৫৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে; ৩) বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৩ সালের নভেম্বরে আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি মোতাবেক ১৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও সেটা পাকিস্তানের ছয় গুণেরও বেশি; ৪) বাংলাদেশের জনগণের গড় আয়ু ৭৩ বছর, পাকিস্তানের ৬৬ বছর; ৫) বাংলাদেশের জনগণের সাক্ষরতার হার ৭৬ শতাংশ, আর পাকিস্তানের ৫৯ শতাংশ; ৬) বাংলাদেশের মোট জিডিপি ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার, আর পাকিস্তানের ৩৪৬ বিলিয়ন ডলার; ৭) বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ, আর পাকিস্তানের ২ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৩ কোটিতে, আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ; ৮) বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ১১৫ টাকায় ১ ডলার পাওয়া যায়, পাকিস্তানে ১ ডলার কিনতে ২৯০ রুপি লাগে। অথচ ২০০৭ সাল পর্যন্ত রুপির বৈদেশিক মান টাকার তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি ছিল; ৯) বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ জিডিপির ২২ শতাংশ, অথচ পাকিস্তানে তা জিডিপির ৪৬ শতাংশ (ওয়াকিবহাল মহলের মতে আরো বেশি); ১০) বাংলাদেশের নারীদের ৪১ শতাংশ বাড়ির আঙিনার বাইরে কর্মরত, পাকিস্তানে এ অনুপাত মাত্র ১৪ শতাংশ; ১১) বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ২১ আর পাকিস্তানের ৫৯; ১২) বাংলাদেশের শতভাগ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে, অথচ পাকিস্তানের ৭৩ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
উপরের তথ্য-উপাত্তগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে আর কখনই বাংলাদেশের নাগাল পাবে না। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০২০-২২ পর্বে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার কমে গেলেও তা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার আবার ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে। দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অতিদ্রুত উচ্চমধ্যম আয়ের ক্যাটাগরিতে উন্নীত হবে সে ব্যাপারে উন্নয়ন চিন্তকরা আশাবাদী।
পাকিস্তানের আরেকটি মারাত্মক ভুল তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে লালন-পালন। আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনীকেও গড়ে তুলেছে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এমনকি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিএনপি-জামায়াতের মদদগার হিসেবে তৎপর রয়েছে আইএসআই। ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকেও ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহ করে আইএসআই। পাকিস্তানে অদূরভবিষ্যতে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণের কোনো সম্ভাবনা নেই। সেনাবাহিনী পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং দেশটির অর্থনীতিকে অজগর সাপের মতো গিলে খাচ্ছে। ড. আয়েশা সিদ্দিকা তার আলোচিত বই মিলিটারি ইন্ক্-এ বলছেন, ২০০৫ সালেই সামরিক অর্থনীতি পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে। চারটি সশস্ত্র বাহিনীসৃষ্ট সংস্থা—ফৌজি ফাউন্ডেশন, আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, শাহীন ফাউন্ডেশন এবং বাহারিয়া ফাউন্ডেশন দেশটির সর্ববৃহৎ চারটি ব্যবসায় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে গেছে। আর সরকারের খাসজমি বা হুকুমদখল করা গ্রামীণ বা শহুরে জমি ইজারা নেয়ার ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিরংকুশ অগ্রাধিকারের কারণে পাকিস্তানের সর্বত্র এখন নব্য ভূস্বামী শ্রেণী হিসেবে সামরিক অফিসাররা পাকিস্তানে অন্য সবাইকে টেক্কা দিয়েছে। সারা পাকিস্তানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ একর জমি সামরিক বাহিনীর চাকরিরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ও কর্মচারীদের মালিকানায় চলে গেছে, যা বাংলাদেশের মোট কৃষিযোগ্য জমির অর্ধেকেরও বেশি। পাকিস্তানের যেকোনো বড় বা মাঝারি নগরে এখন সবচেয়ে বড় আবাসিক এলাকা হয়ে গেছে একাধিক ডিওএইচএস কিংবা ‘ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি’র আবাসিক এলাকা। ড. আয়েশা সিদ্দিকা পাকিস্তানের জন্য এমন মিলিটারি আধিপত্যের ‘চরম মূল্য’ এবং সুদূরপ্রসারী অভিঘাত কী হতে পারে তা বিশ্লেষণ করে বলছেন, রাষ্ট্রটি অদূরভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীর দখলদারি এবং জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে মুক্তি পাবে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদ্দিন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ‘সাদা হাতি’ পোষার অসহনীয় বোঝা থেকে নিষ্কৃতি পাবে না তত দিন অনুন্নয়নের দুষ্ট চক্র থেকে দেশটির মুক্তি মিলবে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রটিও সেনা এস্টাবলিশমেন্টের ডি-ফেক্টো শাসন থেকে মুক্তি পাবে না। এ ভুল থেকে বাংলাদেশের শিক্ষণীয় হলো, ভোটের রাজনীতিতে সংঘাত ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করে যেন সেনাশাসনকে সংকট থেকে উদ্ধারের দায়িত্ব প্রদান করা না হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ম্যানিপুলেট করে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচন করে ক্ষমতায় ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনকে ব্যবহার করে নিজের পছন্দমাফিক সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ নিয়োগের খবরটি আগেভাগে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ক্ষমতা দখল করে নিয়ে তার পছন্দমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সমর্থ হয়েছিলেন। ওই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজিত নির্বাচনে ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েছিল বিএনপি, ২০২৩ পর্যন্ত আর ক্ষমতায় যেতে পারেনি তারা।
বিরোধী দলগুলোর শঙ্কার অনেক জায়গা আছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচনও আগের দুটোর মতো একতরফা হতে পারে। দুঃখজনক ‘অশনিসংকেত’ হলো নির্বাচনের পূর্বাপর সংঘাত বাংলাদেশে সামরিক শাসনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ কি শিক্ষা নেবে না? সিন্দবাদের দৈত্য যদি আবার ঘাড়ে চড়ে বসে তাকে সেখান থেকে নামানো যাবে কি?
ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়