সম্প্রতি একটা বিষয়ে ভ্যাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেটা হলো ভ্যাটের হার বৃদ্ধি না করে ভিত্তি সম্প্রসারিত করতে হবে। সব অংশীজন এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন, এটা একটা বড় অর্জন হিসেবে আমি দেখি। কারণ আমাদের ভ্যাট ব্যবস্থায় বা অন্য প্রায় সব বিষয়ে সমঝোতা সৃষ্টি হওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
ভ্যাটের ভিত্তি কীভাবে সম্প্রসারিত করতে হবে সে বিষয়ে এখনো তেমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে এটা আরেকটা চ্যালেঞ্জ। করতে হবে, এমন কথা বলা সহজ। তবে কীভাবে করতে হবে, কে করবে, করার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি কী হবে, এসব বিষয়ে বক্তব্য কম পাওয়া যায়। এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারিত করতে হলে কী কী করতে হবে—সেটাই মূলত আমার আজকের আলোচনার বিষয়।
প্রথমত, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত করতে হবে। এখন অনলাইনে নিবন্ধন নিতে হয়। নিবন্ধনের আবেদন অনলাইনে দাখিল করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় আবেদন দাখিল করছে না। তাই তাকে বাধ্য করতে হবে। ভ্যাট আইনে ফোর্সড নিবন্ধন দেয়ার একটা বিধান আছে। তবে ফোর্সড নিবন্ধন দেয়ার পর নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। যেহেতু কোনোভাবে প্রাপ্ত স্বল্প তথ্যের ভিত্তিতে ফোর্সড নিবন্ধন দেয়া হয়, সেহেতু নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট অনলাইন সিস্টেমের আইডি ও পাসওয়ার্ড পায় না। ফলে অনলাইনে দাখিলপত্র দাখিল করতে পারে না। ফোর্সড নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠান হার্ডকপি দাখিলপত্র দাখিল করে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান দাখিলপত্র দাখিল করে না। দাখিলপত্র দাখিল না করলে ভ্যাট অনলাইন সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা হয়ে যায়। ফোর্সড নিবন্ধনের আরো নানা ধরনের জটিলতা থাকে। ফোর্সড নিবন্ধন ভ্যাট সিস্টেমে তেমন সুফল বয়ে আনে না। তাই আমাদের দরকার হলো স্বাভাবিক নিবন্ধন।
যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনিবন্ধিত রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক নিবন্ধন দিতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশনই ভালোমতো জানে যে, কোনো স্থানে বা মার্কেটে বা এলাকায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাট নিবন্ধিত হয়নি। ব্যবসায়ীদের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশন ভ্যাট অফিসে এমন তালিকা সরবরাহ করতে পারে বা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসারদের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে বা মার্কেটে ডেকে এনে সব তথ্য দিয়ে স্বাভাবিক নিবন্ধন করাতে সহযোগিতা করতে পারে। বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসহযোগিতার মুখোমুখিও হতে হয়। তবে এখন জনমনে ভ্যাট সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন জনমনে সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস) ভ্যাটের আওতায় অনিবন্ধিত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করতে বেশ সহযোগিতা করছে। রেস্তোরাঁ, বিস্কুটসহ আরো কয়েকটা খাত ওই খাতের ভ্যাটের আওতায় অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করতে ভ্যাট অফিসারদের সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে প্রতিদিন ২৫০-৩০০টি ভ্যাট নিবন্ধন করা হতো, তা সম্প্রতি প্রায় ২ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছে।
ব্যবসায়ীদের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক সহযোগিতার পাশাপাশি ভ্যাট প্রফেশনালদের সহযোগিতাও জরুরি প্রয়োজন। আমাদের দেশে ভ্যাট প্রফেশনালদের সংখ্যা কম। তাই আয়কর প্রফেশনাল, আইনজীবীসহ পেশাজীবীরা ভ্যাট পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। প্রফেশনালরা ভ্যাটের আওতায় অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে, তথ্য সংগ্রহ করতে, তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এবং নিবন্ধন প্রদান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সব কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক আশা করা সমীচীন নয়। সমাজ ও দেশের জনগণের কিছু কাজ পারিশ্রমিক ছাড়া করা আমাদের সবার নৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব। তবে আশার কথা হলো, আপনি যদি আজ কারোর কোনো কাজ ফ্রি করে দেন, একদিন তিনিই আপনার ক্লায়েন্টে পরিণত হবেন।
প্রতিটি ভ্যাট সার্কেলে ভ্যাট অফিসার, ব্যবসায়ীদের সমিতি/অ্যাসোসিয়েশন, ভ্যাট প্রফেশনাল এবং সম্ভব হলে স্থানীয় ছাত্রদের নিয়ে কমিটি গঠন করা যায়। তবে ছাত্রদের যেন লেখাপড়ার ক্ষতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব ছাত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে বা অন্য কোনো কারণে ফ্রি আছেন, সেসব ছাত্রকে জড়িত করা যায়। তারা বাস্তব জীবনের সঙ্গে পরিচিত হবেন এবং তাদের কাছ থেকে গুণগত মানসম্পন্ন কাজ আশা করা যায়। ভ্যাট নিবন্ধনের পর প্রয়োজন হবে ভ্যাট চালানপত্র ইস্যু করা, দাখিলপত্র দাখিল করা, এসব কাজ মনিটর করা। নিয়মিতভাবে এ কাজগুলো করতে পারলে আমার মনে হয়, আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় ভালো পরিবর্তন আসবে, ইনশাআল্লাহ।
ড. মো. আব্দুর রউফ: সদস্য (মূসক নীতি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এ প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত তার ব্যক্তিগত।