অতীতের ভুল থেকে যারা শিক্ষা নেন না, ভুলের পুনরাবৃত্তির জন্য তারা অবশ্যই দায়ী হবেন। বহুকাল আগে এ মন্তব্যটি করেছিলেন স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন দার্শনিক জর্জ সান্তায়ানা। মানুষ তো ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। অতীতকে যারা মনে রাখে, তারাও তো মাঝে মাঝে ভুল করে, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির ধকল সামলাতে বিশ্বব্যাপী প্রণীত অর্থনৈতিক নীতিতে বিষয়টি লক্ষ করা যাচ্ছে। হু হু করে বাড়তে থাকা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বৃদ্ধি ও মুদ্রানীতি কঠোর করাকেই এখন একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে উন্নত দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।
এমনই
এক পরিস্থিতিতে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা
ফেডারেল রিজার্ভের তত্কালীন চেয়ারম্যান পল ভলকারের অধীনে
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে উচ্চমাত্রায় সুদের হার বাড়ানো
হয়েছিল, যা ইতিহাসে ভলকার
শক নামে
পরিচিত। ভলকার
শক দ্বারা
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৯-৮৭ সাল
পর্যন্ত উচ্চ
সুদহারের সময়কে
বোঝানো হয়।
বর্তমান সময়ের
বৈশ্বিক আর্থিক
নীতি ভলকারের
আমলের সে সিদ্ধান্তকেই যেন
নতুন রূপে
সামনে নিয়ে
এসেছে। সুদের
হার বাড়ানোর
মাধ্যমে ভলকার
পরিকল্পনা করেছিলেন,
বেকারত্ব বাড়িয়ে
বেতন সংশ্লিষ্ট ব্যয় হ্রাস করবেন
এবং কর্মী
সংখ্যা কমিয়ে
আয়ের প্রত্যাশা কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরবেন।
কিন্তু উচ্চমাত্রার সুদের হার মার্কিন
অর্থনীতিতে চরম
হতাশা নিয়ে
আসে, যা থেকে বের
হয়ে আসতে
মার্কিনদের প্রায়
এক দশক
সময় লেগেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতির মূল
কেন্দ্রে থাকায়
ভলকারের নীতি
তখন বিশ্বজুড়েও আবারো চালু হয়েছিল।
ফলস্বরূপ লাতিন
আমেরিকাসহ অন্য
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিদেশী ঋণের বোঝা
ও বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়তে
হয়।
এখনকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তুলনায় ভলকানের আমলের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেহেতু বর্তমানের মূল্যস্ফীতি বেতন বৃদ্ধির ফলে হয়নি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গত কয়েক বছর মূল বেতন কমছে। তবু অনেক অর্থনীতিবিদই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেকারত্ব বাড়ানো ও কর্মীদের বেতন কমানোর প্রসঙ্গটি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন।
যেখানে
দ্রুত সুদের
হার বৃদ্ধির
পক্ষে জোরালো
অবস্থান নেয়া
দেশগুলোও মানছে
যে সুদের
হার বাড়ানোর
কৌশলটি বিশ্বের
জন্য অর্থনৈতিক মন্দা বয়ে আনতে
পারে। সেই
সঙ্গে তাদের
নিজ দেশ
কিংবা অন্য
দেশের লাখ
লাখ মানুষের
জীবন ও জীবিকা ধ্বংস
করে দেয়ারও
সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া এখন
পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সুদের হার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজে
আসেনি। খুব
সম্ভবত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য পেছন
থেকে মূল
কলকাঠি নাড়ছে
অন্য কোনো
নিয়ামক।
অনেকেই হয়তো প্রত্যাশা করছে, বিশ্ব অর্থনীতির অতিপুরনো ও পরিচিত এ সমস্যা মোকাবেলা করতে আরো উপযুক্ত কৌশল গ্রহণ করা হবে। তবে উন্নত দেশের নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্ন কোনো উপায় বা কৌশল গ্রহণের খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না।
দায়িত্বশীল গোষ্ঠীগুলোর এমন নিষ্ক্রিয়তা অর্থনৈতিক নীতিকে আরো বিপথগামী করছে। যেখানে সাম্প্রতিক গবেষণায় বারবার বলা হচ্ছে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় কারণ পণ্য সরবরাহ সংকট। বড় কোম্পানিগুলো সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছে। জ্বালানি, খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এসব অসাধু কোম্পানির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে অন্যান্য পণ্যেরও দাম বেড়েছে। এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে অত্যন্ত কৌশলী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই প্রয়োজন পণ্য সরবরাহ ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া খাদ্য ও জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া ও লাভের পরিমাণ সীমাবদ্ধ করা। সেই সঙ্গে তদারকির মাধ্যমে খুচরা বাজারের দ্রব্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে এসব প্রত্যক্ষ কৌশল সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও বিষয়টি তারা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেনি, বরং নির্বাচিত নেতারা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ভার তুলে দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাঁধে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিপদ মোকাবেলায় সুদের হার বৃদ্ধির মতো পরীক্ষিত অকেজো হাতিয়ার ব্যবহার করে চলছে। ফলে উন্নত দেশগুলোয় যেখানে লক্ষাধিক মানুষকে অর্থনৈতিক দুর্দশার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, সেখানে নিম্ন অর্থনীতির দেশগুলোয় এ পরিণতি হয়তো আরো ভয়াবহ হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলো কেবল তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। অন্যান্য দেশের মূলধনপ্রবাহ বা বাণিজ্য পরিস্থিতি কেমন, সেসব বিষয় নিয়ে তারা খুব একটা মাথা ঘামায় না। মার্কিন অর্থনীতিতে ২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সূত্রপাত, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়। কেননা বিনিয়োগকারীরা তখন মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে উন্নত দেশগুলোর নিম্নমুখী সুদের হার নীতির কারণে স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতি এবং বাণিজ্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণের উপায় কিংবা প্রতিরোধের সক্ষমতা তাদের ছিল না।
অনুরূপভাবে, বর্তমান সময়ে দ্রুত সুদের হার বৃদ্ধির অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের ফল কতটা গুরুতর হতে পারে, তা এরই মধ্যে আঁচ করা গিয়েছে। কেননা উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ এবং বৈশ্বিক অর্থায়ন প্রক্রিয়া একই সূত্রে গাঁথা।
ডাচ অর্থনীতিবিদ সার্ভাস স্টর্ম সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চমাত্রায় সুদহার বৃদ্ধির প্রবণতা স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতিতে কী ধরনের ক্ষতি নিয়ে আসতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ সংকট ও ঋণখেলাপির সংখ্যা সম্ভবত আরো বাড়বে। এছাড়া একই সঙ্গে উৎপাদন খাতে লোকসান, উচ্চ বেকারত্বের হার, বৈষম্য ও দারিদ্র্যও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে, যা সাময়িকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি স্থবির ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণাম আরো ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এ বিষয়ে ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনসিটিএডি) সর্বশেষ বার্ষিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশের ভবিষ্যৎ আয় কমপক্ষে ৩৬ হাজার কোটি ডলার কমবে।
এ ক্ষতির পরিমাণ কোনো নির্দিষ্ট একটি উন্নত দেশ এককভাবে প্রতিরোধ করতে পারবে না। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা তাদের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে অন্যান্য দেশের লাভ-লোকসানের বিবেচনা করেন না। তারা শুধু ততটুকুই ভাবেন, যা তাদের নিজস্ব অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট। এর ফল ভোগ করতে হয় স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে।
এজন্য উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে অবশ্যই বৃহৎ পরিসরে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব আর্থিক নীতি প্রণয়নের স্বাধীনতা দিতে হবে, যা দেশগুলোর মূলধনপ্রবাহ সচল রাখতে ও তাদের ব্যবসার ধরন নতুন করে সাজাতে সাহায্য করবে।
চলমান কভিড-১৯ মহামারী ও জলবায়ু সংকট আমাদের শিখিয়েছে, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কেবল করুণা বা নৈতিকতার বিষয় নয়, বরং এটি উন্নত দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থেই করতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, উন্নত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে খুব কম লোকই আছেন, যারা
বিষয়টি স্বীকার করেন।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২২]
জয়তী ঘোষ: ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যকর বহুপাক্ষিকতা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য
ভাষান্তর: আল আমিন হাওলাদার