দেশে বিগত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে। তবে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অধীনে সাধারণ মানুষের কাছে এ উন্নয়ন সঠিকভাবে পৌঁছায়নি। এজন্যই দেশে বিগত এক দশকে চরম শ্রেণী-বিভেদ তৈরি হয়। উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু এর সুফলভোগী হতে পারেনি মানুষ এবং এখনো পারছে না। উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা মানুষের মনে রয়েছে। আবার বৈষম্য থাকায় সমাজে ‘যেকোনো পদ্ধতিতেই অর্থ উপার্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষার’ মতো প্রবণতাও বাড়ছে। বৈধ-অবৈধ, নৈতিক-অনৈতিক, সামাজিক-অসামাজিক—সব ক্ষেত্রেই অর্থ হয়ে উঠেছে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড। প্রশ্ন হলো, এত অর্থ দিয়ে কী করবে মানুষ? কতটুকু অর্থ পেলে মানুষ প্রকৃতই সুখী হতে পারে? সীমাহীন এ প্রয়োজন কী স্বাভাবিক?
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। এর বাইরে কিছু স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাও সাধারণ মানুষের থাকে। সম্মানজনক জীবন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এগুলোর জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু যখন প্রয়োজনের জায়গা দখল করে নেয় অসীম সঞ্চয়ের বাসনা, তখন অর্থ জীবনের উপকরণ থেকে জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। একজন মানুষ একসঙ্গে একবেলা খেতে পারেন, একটিই বিছানায় ঘুমান, একটিই জীবনযাপন করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কেউ শতকোটি টাকার মালিক হয়েও আরো অর্থের পেছনে ছুটছেন। কারণ অর্থ তখন প্রয়োজন নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব, নিরাপত্তার অনুভূতি ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
কেন এমন প্রবণতা বাড়ছে?
সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, একজন সরকারি কর্মকর্তা নানা কায়দায় হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। তার পরও তার আয়ের ইচ্ছা থামছে না। এমনই একজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তিনি মনে করেন এ দেশে আর্থিক নিরাপত্তা নেই। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হচ্ছে, নিজের ভবিষ্যৎও ভাবনায় আছে। আবার এটি সামাজিক পর্যায়েও তার সামনে প্রশ্ন। কেন বেশি অর্থ আয় করতে পারছেন না। সবাই চায় তার বিদেশে সহায়-সম্পত্তি হোক। ব্যাংকে মোটা অংকের টাকা থাকুক। এ দেশে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তবে বেঁচে থাকার জন্য আসলে কত টাকা দরকার জিজ্ঞেস করলেই উত্তরদাতা নীরব। বাস্তবে তিনি নিজেও জানেন না। এমন মানসিক প্রবণতা এক ধরনের রোগের মতো।
এমন মানসিক প্রবণতার কারণগুলো কী?
সামাজিক পর্যায়ে ব্যক্তির সফলতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। আজ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মূল্যায়ন হয় গাড়ি, বাড়ি, সম্পদ, প্রদর্শিত জীবনযাত্রা ইত্যাদিতে, চরিত্র, জ্ঞান বা অবদানে নয়। সমাজে অর্থই যেন পরিচয়ের প্রধান ভাষা হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে সবার মনেই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয় কাজ করছে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত হলেও রাষ্ট্র বর্তমানে প্রকৃত জনকল্যাণমুখী ভূমিকা রাখতে পারছে না। এজন্যই নাগরিকরা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয়ের পাশাপাশি চাকরির অনিশ্চয়তা এবং বার্ধক্যকালীন সময়ের নিরাপত্তার অভাববোধ করে। এ অনুভবের তাগাদার কারণেই মানুষ অতিরিক্ত অর্থ আয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এদিকে মানুষের মনে তুলনার প্রবণতা এসেছে। অন্যের অর্থ সম্পদ সাফল্যে মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামনে অন্যের সাফল্যের প্রদর্শনী তৈরি করেছে। ফলে মানুষ নিজের প্রয়োজন নয়, অন্যের জীবন দেখে নিজের চাহিদা নির্ধারণ করছে। এজন্য দায়ী দুর্বল মূল্যবোধ। একসময় নীতিবাক্যের বই স্কুলে বাধ্যতামূলক পড়ানো হতো। মূল্যবোধ শেখানোটা পাঠ্যক্রমে ছিল। এখন বিদ্যালয় ও পরিবারে অর্থনৈতিক নৈতিকতা, সততা, নাগরিক দায়িত্ব, পরিতৃপ্তির শিক্ষা কমে গেছে। দক্ষতা শেখানো হচ্ছে, কিন্তু চরিত্র গঠন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
মানুষ এখন অতিদ্রুত ধনী হতে চায়। ধনী হওয়ার সহজ কৌশলের বই বেশি বিক্রি হয়। পরিশ্রম, সময় ও দক্ষতার পরিবর্তে ‘দ্রুত সফলতা’ এখন অনেকের আকাঙ্ক্ষা। এতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, প্রতারণা, দুর্নীতি, কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রবণতা বাড়ে। এ সমস্যাগুলো হয়েছে দুর্নীতি, অপ্রদর্শিত সম্পদ, বৈষম্য, অবৈধ অর্থ পাচার ইত্যাদি থেকে। যদি কিছু সূচকের দিকে তাকাই, দেখতে পাব আমাদের দেশ পৃথিবীতে দুর্নীতি সূচকে ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম, সম্পদ বৈষম্যে শীর্ষ ১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি।
আমাদের আসলে কত টাকা দরকার?
এর নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারণ প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে অর্থের পরিমাণ নয়, আর্থিক নিরাপত্তা ও মানসিক পরিতৃপ্তিই মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন। যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন, দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী সুশৃঙ্খল জীবন গড়তে পারেন, তিনি তুলনামূলক কম সম্পদ নিয়েও সুখী হতে পারেন। আবার সীমাহীন সম্পদও অস্থিরতা দূর করতে পারে না। যদিও এ শিক্ষার মূল্য ও চাহিদা খুবই কম। এসব সমস্যা ও প্রবণতা মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র যদি আন্তরিক ও কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হয়, তবে তা সম্ভব। সেগুলো কীভাবে করা যেতে পারে?
শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘অর্থনৈতিক নৈতিকতা’ অন্তর্ভুক্ত করা: প্রাইমারি শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিশু বয়স থেকে জনগণকে শিখতে হবে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। শুধু হিসাববিজ্ঞান নয়, নৈতিক অর্থনীতি, সততা, কর প্রদানের সংস্কৃতি, সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ভোগ এসব বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা: ‘ভালো কাজের পুরস্কার ও খারাপ কাজের তিরস্কার’—সব পর্যায়ে এ ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে। মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি মানুষ বার্ধক্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নিশ্চয়তা পায়, তবে অতিরিক্ত অর্থ সঞ্চয়ের ভয়ভিত্তিক প্রবণতা কমতে পারে।
মানুষকে দৃশ্যমান সম্মান দেয়া: সমাজে কেবল ধনীদের নয়, শিক্ষক, গবেষক, সৎ কর্মকর্তা, লেখক, উদ্ভাবক ও সামাজিক কর্মীদেরও সমান মর্যাদা দিতে হবে। মানুষ শিখতে হবে, কর দেয়া নাগরিক দায়িত্ব। কর দিলে মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আরো যত্নবান হবে। তবে যারা নিয়মিত কর দেবে, তাদের উৎসাহ দিতে হবে—যেমন নিয়মিত করদাতা পেনশন পাবে। পেনশন কম হলেও রাষ্ট্রের কাছে এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা: বৈধ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিভাজনমূলক স্বীকৃতি থাকতে হবে। সম্পদ যদি অবৈধভাবে অর্জিত হয়, তার ঘোষণা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। অবৈধ সম্পদ অর্জনকে সামাজিক সাফল্যের উদাহরণ হতে দেয়া যাবে না। দ্রুত বিচার, সম্পদ জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা জরুরি।
গণমাধ্যম ও ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: নৈতিকতা শিক্ষায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে হবে। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পরিতৃপ্তি, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সংস্কৃতি গঠনে কাজ করতে পারে।
অর্থ সভ্যতার চালিকাশক্তি, কিন্তু অর্থলোভ সভ্যতার সংকট। একটি সমাজ তখনই ভারসাম্যপূর্ণ হয়, যখন সেখানে সম্পদ সৃষ্টি ও নৈতিকতা পাশাপাশি চলে। বাংলাদেশের সামনে আজ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং নৈতিক উন্নয়নেরও চ্যালেঞ্জ আছে। উন্নয়ন যদি মানুষের ভেতরের মানুষকে হারিয়ে ফেলে, তবে প্রবৃদ্ধি বাড়বে, কিন্তু পরিতৃপ্তি কমবে।
মোহাম্মদ শহীদ উল্যাহ: সিনিয়র ব্যাংকার