২০২০
সালের ২৫
ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ
ব্যাংক বাণিজ্যিক
ব্যাংকের সুদহার
পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত একটি
পরিপত্র (বিআরপিডি
সার্কুলার নম্বর-৩)
জারি করে।
পরিপত্রে জানানো
হয়, ২০২০
সালের ১
এপ্রিল থেকে
কথিত এক
অংকের (সিঙ্গেল
ডিজিট) তথা
৯-৬
শতাংশ হারে
সুদ কার্যকর
হবে। পরিপত্রটির
সারাংশ ছিল
এই যে
তফসিলি বাণিজ্যিক
ব্যাংকে ঋণের
সুদ হবে
সর্বোচ্চ ৯
শতাংশ এবং
আমানত সংগ্রহের
ক্ষেত্রে ব্যাংক
সর্বোচ্চ ৬
শতাংশ হারে
সুদ প্রদান
করবে। কথিত
এক অংকের
সুদহার শুরু
থেকেই নানা
মহলে আলোচনার
জন্ম দেয়
এজন্য যে
বাংলাদেশ ব্যাংক
ঋণ প্রদান
এবং আমানত
গ্রহণের উভয়
পর্যায়েই সর্বোচ্চ
সুদহার নির্ধারণ
করে দিয়েছে
কিন্তু এসব
ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন
সুদহার কত
হবে তা
ছিল অস্পষ্ট।
বলা বাহুল্য,
বাণিজ্যিক ব্যাংক
সুদহার কত
হলো, তা
নিয়ে খুব
বেশি মাথা
ঘামায় না।
মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠান
হিসেবে বাণিজ্যিক
ব্যাংকের নিট
সুদ কত,
সেটাই থাকে
মুখ্য বিবেচনার
বিষয়। নিট
সুদহার হলো
ব্যাংকের মোট
সুদ আয়
এবং মোট
সুদ ব্যয়ের
পার্থক্য। সুদক্ষ
ব্যাংক ব্যবস্থাপনার
অন্যতম লক্ষ্য
থাকে নিট
সুদ মার্জিন
অক্ষত রাখা।
বিষয়টি একটি
উদাহরণের মাধ্যমে
স্পষ্ট করা
যেতে পারে।
যেমন ১০০
টাকা ঋণ
দিয়ে ১২
শতাংশ হারে
ব্যাংকের সুদ
প্রাপ্তি ১২
টাকা এবং
৯ শতাংশ
হারে খরচ
হয় ৯
টাকা। সেক্ষেত্রে
ব্যাংকের নিট
সুদ মার্জিন
৩ টাকা।
আবার উভয়
ক্ষেত্রে সুদহার
কমার জন্য
ধরা যাক
৯ শতাংশ
হারে ব্যাংকের
মোট সুদ
আয় হবে
৯ টাকা
এবং ৬
শতাংশ হারে
মোট সুদ
ব্যয় ৬
টাকা। দেখা
যাচ্ছে, এক্ষেত্রেও
ব্যাংকের নিট
সুদ ৩
টাকাই রয়ে
গেছে। অর্থাৎ
সুদহার আগের
তুলনায় কমার
পরেও ব্যাংকের
মুনাফা বা
লাভের অংকে
কোনো হেরফের
হয়নি।
সুদহার পুনর্নির্ধারণে
২০২০ সালের
ওই সার্কুলার
যে উদ্দেশ্যেই
করা হোক
না কেন,
অন্তত বাণিজ্যিক
ব্যাংকগুলোর জন্য
ভালো বৈ
মন্দ হয়নি।
মন্দ যে
হয়নি, তার
একটা উদাহরণ
যেমন বৈশ্বিক
করোনা মহামারী
এবং ৯-৬
সুদহার সত্ত্বেও
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
২০২১ সালের
প্রথমার্ধের মুনাফায়
উল্লম্ফন (দৈনিক
বণিক
বার্তা,
জুলাই ২,
২০২১)।
কথা হলো,
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
মুনাফার উল্লম্ফনে
জাদুটি আসলে
কোথায়? একদিকে
করোনা মহামারীর
কারণে জাতীয়
প্রবৃদ্ধি মন্থর
হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি খাতে
ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রা
অর্জিত হয়নি।
যেকোনো মানদণ্ডে
দারিদ্র্য এবং
বেকারত্ব বেড়েছে।
অর্থনীতির এরূপ
মন্দাবস্থায় অধিকাংশ
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
মুনাফায় টান
পড়েনি। এর
অন্যতম কারণ
হতে পারে
দুটি। যথা
আমানত এবং
ঋণদান কার্যক্রমবহির্ভূত
আয়, যা
অফ ব্যালান্সশিট
আয় বলে
পরিগণিত। করোনার
কারণে নানা
ক্ষেত্রে স্থবিরতা
সত্ত্বেও ব্যাংকের
লেনদেন চার্জ,
হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ
ফি, টাকা
স্থানান্তর ফি,
কমিশন ইত্যাদি
আয় কমেনি।
দ্বিতীয় কারণটি
হয়তো ৯-৬
সুদহারের পরোক্ষ
সুফল, যা
কিনা ব্যাংক
পেয়েছে। বিষয়টি
খোলাসা করা
প্রয়োজন। ৯-৬
সুদহারে সর্বোচ্চ
হার বলা
থাকায় এবং
সর্বনিম্ন কত
সুদ দেয়া
যাবে, সে
সম্পর্কে কিছু
বলা না
থাকায় অনেক
ব্যাংক আমানতের
সুদহার যথেষ্ট
পরিমাণ কম
নির্ধারণ করে।
খবরে প্রকাশ
মেয়াদি আমানতে
কোনো কোনো
ব্যাংক এমনকি
২ দশমিক
৫ শতাংশ
সুদ ধার্য
করে। বাণিজ্যিক
ব্যাংক এমনিতেই
চলতি আমানতে
কার্যত কোনো
সুদ দেয়
না। সঞ্চয়ী
আমানতে নামমাত্র
সুদ দিলেও
নানা শর্তের
বেড়াজালে আবদ্ধ
এবং দিন
শেষে সুদের
পরিমাণ অতি
নগণ্য। সেক্ষেত্রে
চুক্তিমাফিক তিন
মাস, ছয়
মাস বা
তদূর্ধ্ব মেয়াদি
আমানতে কোনো
কোনো বাণিজ্যিক
ব্যাংক ২
থেকে ৩
শতাংশ সুদ
প্রদান আলোচিত
হতে থাকে।
অন্যদিকে এসব
ব্যাংকের অনেকেই
ঋণের সুদহার
৯ শতাংশে
অপরিবর্তিত রাখে
এবং এই
চার্জ সেই
চার্জ ইত্যাদি
খাতে অর্থ
আদায় অব্যাহত
রাখে। তাতে
দেখা যায়
কথিত ৯-৬
সুদহারের মূল
সুবিধা বাণিজ্যিক
ব্যাংকের পকেটে
চলে যায়।
অনেক ব্যাংক
আছে, যাদের
তারল্য আধিক্য
চাপ বেশি,
তারা আবার
ঋণাত্মক প্রতিযোগিতার
আশ্রয় নেয়।
যেমন সাম্প্রতিক
সময়ে কোনো
কোনো বাণিজ্যিক
ব্যাংক ৬
দশমিক ৫
থেকে ৭
দশমিক ৫
শতাংশ সুদে
ঋণ প্রদানের
ঘোষণা দেয়।
এসব ব্যাংকের
কেউ কেউ
যেহেতু আমানতের
সুদ ২
থেকে ৩
শতাংশ প্রদান
করে, তাই
তাদের ব্যবসায়িক
নিট মুনাফা
অক্ষত রেখেই
বাজারে অশুভ
প্রতিযোগিতা শুরু
করে। এতে
ছোট ছোট
অনেক ব্যাংক
এরই মধ্যে
হয় ক্ষতির
সম্মুখীন হয়েছে
অথবা নিকট
অতীতে এরূপ
ক্ষতির সম্মুখীন
হতে পারে।
অপরাপর বিবেচনায়
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয়
ব্যাংক ব্যাংক
কোম্পানি আইন,
১৯৯১-এর
৪৫ ধারা
অনুযায়ী প্রদত্ত
ক্ষমতাবলে গত
৮ আগস্ট
আরেকটি পরিপত্র
জারি করেছে।
সাম্প্রতিক এ
পরিপত্রে কেন্দ্রীয়
ব্যাংক আমানতের
সুদের সর্বনিম্ন
হার নির্ধারণ
করে দিয়েছে।
তবে ভালো
করে লক্ষ
করলে বোঝা
যাবে এক্ষেত্রেও
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
সুনির্দিষ্ট কোনো
সুদহার নির্ধারণ
করে দেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক
বলেছে, যেকোনো
মেয়াদি আমানতে
প্রদেয় সুদ
প্রচলিত মূল্যস্ফীতির
কম হতে
পারবে না।
এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন
সুদহার কার্যকর
করা বাণিজ্যিক
ব্যাংকের জন্য
চ্যালেঞ্জিং হয়ে
দেখা দিতে
পারে। এ
ধরনের আমানত
সুদহার সাধারণত
‘পরিবর্তনশীল
আমানত সুদহার
(Variable Rate Deposit or VRD)’-এর
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা,
অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক
উন্নত দেশে
বাণিজ্যিক ব্যাংক
কর্তৃক এ
রকম ভিআরডি
অফার করা
হয়। কিন্তু
বাংলাদেশের মতো
উন্নয়নশীল দেশে
আমানতকারী এবং
ব্যাংক উভয়
পক্ষ থেকেই
এ রকম
আমানত অজনপ্রিয়তার
মুখে পড়তে
পারে। সে
যাই হোক,
নতুন এ
পরিপত্র কার্যকর
করার ক্ষেত্রে
প্রথম চ্যালেঞ্জটি
সম্ভবত বাণিজ্যিক
ব্যাংকগুলোর পক্ষ
থেকেই আসছে।
যেমন খবরে
প্রকাশ গত
১১ আগস্ট
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
কার্যনির্বাহীরা বাংলাদেশ
ব্যাংকের গভর্নর
এবং অপরাপর
প্রতিনিধি দলের
সঙ্গে বৈঠক
করেন (দৈনিক
প্রথম আলো,
আগস্ট ১২,
২০২১)।
বৈঠকে বাণিজ্যিক
ব্যাংকের প্রতিনিধিরা
বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্তৃক এর
আগে জারীকৃত
আমানতের সর্বনিম্ন
সুদহারসংক্রান্ত পরিপত্রটি
পুনর্বিবেচনার অনুরোধ
করেন। কিন্তু
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক
ব্যাংকের সে
দাবি নাকচ
করে দেয়
এবং মেয়াদি
আমানতে সর্বনিম্ন
সুদহার যাতে
কোনোভাবেই প্রচলিত
মূল্যস্ফীতির নিচে
না আসে
তার জন্য
নির্দেশনা দেয়।
বাংলাদেশে এ
মুহূর্তে প্রচলিত
মূল্যস্ফীতির হার
নিম্নমুখী। যেমন
২০২১ সালের
জুনে মূল্যস্ফীতি
যেখানে ছিল
৫ দশমিক
৬৪ শতাংশ,
সেখানে জুলাইয়ে
তা ৫
দশমিক ৩৪
শতাংশ। মূল্যস্ফীতি
নির্ণয় পদ্ধতি
এবং স্থান-কাল
ভেদে তারতম্য
আছে। যাই
হোক, সুদহার
নির্ধারণে মূল্যস্ফীতিই
শেষ কথা
নয়। আবার
সুদহার বলতে
তা নামমাত্র
সুদহার নয়,
প্রকৃত সুদহার,
তাও বিবেচনায়
নেয়া প্রয়োজন।
প্রকৃত সুদ
বলতে নামমাত্র
সুদ থেকে
মূল্যস্ফীতি বাদ
দিলে অবশিষ্টাংশকে
বোঝায়। যেমন
নামমাত্র সুদহার
ধরা যাক
৬ শতাংশ
আর প্রচলিত
গড় মূল্যস্ফীতি
৫ দশমিক
৬ শতাংশ।
সেক্ষেত্রে নামমাত্র
সুদহার এবং
গড় মূল্যস্ফীতির
নিট পার্থক্য
তথা প্রকৃত
সুদহার হবে
শূন্য দশমিক
৫ শতাংশ,
যা একেবারেই
নগণ্য।
অন্যদিকে দেখতে
হবে সমাজ
বা জনগোষ্ঠীর
কোন অংশ
ব্যাংক সুদের
ওপর প্রকৃত
অর্থেই নির্ভরশীল।
নির্ভরশীলতার কথা
চিন্তা করলে
প্রথমেই আসে
সমাজের অর্থনৈতিকভাবে
ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর
কথা। বয়স্ক,
পঙ্গু, বিধবা,
পেনশনভোগী অনেক
মানুষ আছে,
যারা সরকারি
সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি
ব্যাংকে মেয়াদি
আমানত বা
এফডিআর সংরক্ষণ
করেন। নির্ভরশীল
এবং নানামুখী
অভাবী অনেক
মানুষ ভবিষ্যতে
কোনো বিশেষ
কাজে খরচের
উদ্দেশ্যে, যেমন
ছেলেমেয়েদের শিক্ষা,
চিকিৎসা, বিয়ে
ইত্যাদি কারণে
মেয়াদি আমানত
রাখেন। ব্যাংক
আমানতের ওপর
আমানতকারী যে
সুদ পান,
সরকার তার
ওপরে কর
বা ট্যাক্স
আরোপ করে।
কোনো কোনো
সময়ে অন্যান্য
শুল্কও প্রদান
করতে হয়।
প্রশ্ন হলো,
আমানতে কম
সুদহার, সরকার
কর্তৃক নির্ধারিত
শুল্ক ও
কর এসবের
সব অভিঘাত
আসে আমানতকারীদের
ওপরই। বাণিজ্যিক
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায়
এসবের খুব
বেশি অভিঘাত
দেখা যায়
না। কারণ
ক্ষুদ্র আমানতকারীরা
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
নিরুপায়। আমানতের
সুদহার কম
হলেও আমানতকারীরা
বাধ্য হয়েই
ব্যাংকে টাকা
রাখবেন। কারণ
সীমিত অর্থ
এবং বিনিয়োগ
জ্ঞানের স্বল্পতার
কারণে বিনিয়োগের
খুব বেশি
বিকল্প তাদের
জন্য খোলা
নেই। এক্ষেত্রে
বৃহৎ আমানতকারীদের
কথা অবশ্য
আলাদা। যেসব
ধনী ব্যক্তি
বা সংগঠনের
কোটি কোটি
অর্থ ব্যাংকে
পড়ে আছে,
তারা সুদহার
কত হলো,
কমল না
বাড়ল, তা
নিয়ে মাথা
ঘামানোর প্রয়োজন
বোধ করে
না। তারা
আমানতের অর্থ
বৃদ্ধির চেয়ে
আমানতের সুরক্ষার
প্রতি বেশি
যত্নশীল এবং
মনোযোগী। সে
অর্থে বর্তমান
নীতিমালার প্রকৃত
সুফল সমাজের
সাধারণ জনগোষ্ঠীর
দোরগোড়ায় পৌঁছাতে
হলে সরকারের
উচিত হবে
মূল্যস্ফীতির লাগাম
টেনে ধরে
তা নিয়ন্ত্রণে
রাখা, শুল্ক
ও কর
আদায়ে তুলনামূলক
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের
অধিকতর সুবিধা
দেয়া। অন্যদিকে
বাণিজ্যিক ব্যাংক
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
ঘোষিত নীতি
আক্ষরিক অর্থেই
বাস্তবায়নে যত্নবান
হলে সমাজের
বঞ্চিত জনগোষ্ঠী
কিছুটা হলেও
সুফল পেতে
পারে।
ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক