দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষিত হয়নি এবং এ হার জিডিপির ২২-২৩ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। গত ৭-৯ এপ্রিল একটি বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে, সেখানেও বিনিয়োগ বৃদ্ধির অনেক আশা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সেভাবে সফলতা আসেনি। কারণ বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তার আস্থার জায়গাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বেশি দরকার সুন্দর অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি ও নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একটি পরিপূর্ণ বিনিয়োগ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসন। তবে বারবার করনীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ঘাটতি তৈরি করে।
এবারের বাজেটে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। উদ্যোক্তা তেমনভাবে আশ্বস্ত হতেও পারেননি যে তিনি তার বিনিয়োগটি এখানে সুরক্ষা করতে পারছেন, যা নতুন বিনিয়োগ এবং বিদ্যমান বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। দক্ষ জনশক্তির অভাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটে এমন কিছু প্রস্তাব, যা বিদ্যমান বিনিয়োগের আশাকেই নিরাশায় পরিণত করেছে। সেখানে নতুন বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে এগিয়ে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। বাজেটে ১৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির একটি প্রস্তাব রয়েছে, এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সেন্ট্রাল বন্ডেড হাউজের কথা বলা হয়েছে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ, যার বাস্তবায়ন দেখাতে চান উদ্যোক্তারা।
বাজেটে একদিকে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু নতুন পলিসির কথা বলা হলেও এমন কিছু নীতির কথা বলা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোগকে নিরাশ করেছে। যেমন কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ যারা ই-কমার্স বা এফ-কমার্সের মাধ্যমে কিছু কিছু নতুন ব্যবসা গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল, তাদের ওপর করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
একটি সাধারণ প্রাক্কলনে দেখা যায় দেশে ৩-৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এসব ব্যবসায় জড়িত ছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। এসব উদ্যোগ সাধারণত কোনো একটি বড় প্লাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠে, এর মাধ্যমে তারা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে কিছু কমিশন পেয়ে থাকে সেটাই তাদের আয়। তারা নিজেরা পণ্য প্রস্তুত করে না। তবে বড় বড় করপোরেট কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতে সহায়তা করে ও পণ্য প্রত্যন্ত বাজারে বিক্রয় করে। এতে একদিকে যেমন বড় করপোরেটের পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়, আবার কিছু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থানও হয়। এরই মধ্যে বাংলাদেশে কুরিয়ার সেবা বেড়েছে, যা ই-কমার্সের প্রসারে সহায়ক হয়েছে।
এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও তেমন বেশি নয়। যেমন বলা হয় এর পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকার মতো। করহার বাড়িয়ে সরকার এ খাত থেকে ২২৫ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে চায়। কিন্তু এ ধরনের ভোক্তা কর একদিকে যেমন পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে, অন্যদিকে বিক্রয় কমে যাবে। ফলে উল্লেখযোগ্য মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে, যারা এ আয়ের মাধ্যমে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। যেমন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ভিডিওগ্রাফি, গ্রাফিক্যাল ডিজাইনের কাজ ইত্যাদি। বিশেষত কভিড-পরবর্তী সময়ে এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং এ খাত ভালো প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছিল।
এমন একটি করনীতির পরিবর্তনের কারণে সামাজিক প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি বড় প্লাটফর্মগুলোর, বিশেষ করে দারাজের অনেক বিক্রেতা রয়েছে। কর বাড়ানোর ফলে তাদের অনেক বিক্রেতা ঝরে যাবে। ফলে তাদের বিক্রি হ্রাস পাবে। এখানে কর্মসংস্থানের ওপর বিপুল চাপ পড়বে। এসব তরুণ-তরুণী বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত। তাদের ক্ষুদ্র আয়ের উৎস হ্রাস পাওয়ায় ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে। যদিও সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ পরিবর্তন প্রস্তাব করেছে সেখানে কিছু বাড়তি আয় হলেও কাজ হারিয়ে অনেকেই যেমন ডেলিভারি বয়, কুরিয়ার সেবা প্রদানকারী ইত্যাদির ক্ষেত্রে যে প্রভাব পড়বে তার পরিমাণ অনেক বেশি হবে।
এ রকম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে কার্বোনেটেড বেভারেজ, যেখানে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মতো দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাতে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ খাতের জন্য করনীতি যৌক্তিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে।
সরকার একদিকে দেশে তৈরি হয় না এমন ধরনের মধ্যবর্তী (ইন্টারমিডিয়েট) কাঁচামালের শুল্ক বাড়িয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আমদানীকৃত পানীয়ের ওপর সম্পূরক শুল্ক কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া অফেরতযোগ্য ন্যূনতম করের বিস্তৃতি এ খাতের ওপর ঋণাত্মক প্রভাবের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু উচ্চ হারে মূসক, স্থানীয় পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জও বিদ্যমান। ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী মুদ্রার অবনমন হওয়ায় কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে (প্রায় ৪০ শতাংশ)। এর সঙ্গে অতিরিক্ত করের আপাতনের ফলে বিনিয়োগ ও বাজার অবনমন অবস্থা বিদ্যমান।
বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তাদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যায় প্রতি বছরই এ খাতে করের হার বাড়ছে। যেমন ২০২৩ সালে করের মোট আপাতন ছিল ৪৮ শতাংশ, ২০২৪-এ তা দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ৮৭ শতাংশে এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৫-এ ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এ খাতে নিয়োজিত দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নীতিমালা পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে গত তিন অর্থবছরে করনীতি-সংক্রান্ত চারটি পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার বেশির ভাগই ব্যবসা ব্যয় বৃদ্ধি তথা করের আপাতন বৃদ্ধি করেছে।
এ বছর এ খাতের কাঁচামাল যা দেশে প্রস্তুত হয় না এমন আমদানীকৃত Beverage Concentrates (এইচএস কোড ২১০৬.৯০.২১) এর ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্বোনেটেড পানীয় বা সিএসডির ওপর সরবরাহ পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ ও মিনারেল ওয়াটারের ওপর স্থানীয় সব পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশে নির্ধারণ করা আছে।
এ বছর বাজেটে কিছু কিছু ন্যূনতম কর, যা ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি যাই হোক না কেন তা দিতে হবে। এমন কর সমন্বয় করা যাবে না বলেও এমন নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্য রয়েছে লৌহ, ফেরো এলোয়, সিমেন্ট, কার্বোনেটেড বেভারেজ, গুঁড়া দুধ, সিরামিক পণ্য, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি। ন্যূনতম কর যেহেতু গ্রস রিসিটের ওপর আরোপ হয়, সেহেতু এ খাতের বিক্রয়ের অবনতি হয়েছে। এ কারণে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ও কর্মসংস্থান কমেছে। উল্লেখ্য, এ বছর ন্যূনতম করের সর্বনিম্ন হার দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে, যা একটি শিল্পের জন্য প্রথম তিন বছর দশমিক ১ শতাংশ ছিল। এটি প্রায় ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধির সমান। এ সুবিধা প্রত্যাহার হওয়ায় এটি ‘ট্যাক্স হলিডে’ প্রাপ্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়।
অসমন্বয়যোগ্য ন্যূনতম কর আরোপের ফলে স্থিতিস্থাপকতা বিবেচনায় বাজার অবনমনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব কমতে পারে। উল্লেখ্য, সম্পূরক শুল্ক ২০-২৫ শতাংশ নির্ধারণ করার ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় ১ হাজার ৫৩৩ কোটি থেকে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছিল।
এছাড়া সিএসডি পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ১৫০ থেকে কমিয়ে ১০০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে মোট আমদানি শুল্কের আপাতন ২৮৯ শতাংশ থেকে কমে ২১২ শতাংশ নির্ধারণ হওয়ার ফলে বাজার প্রতিরক্ষণ কমেছে। ভবিষ্যতে এ প্রতিরক্ষণ কমবে, তাই ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্বার্থ সংরক্ষণে বাজার সুবিধা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে বন্দর কার্যক্রম এখনো আধুনিক নয়, অন্যান্য দেশ যেভাবে কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমিয়ে এনেছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তেমন সফল হয়নি।
এ বছরে বাজেটে এসডি পণ্যের কাঁচামালের ওপর করহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিগত বছরের আমদানি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কার্বোনেটেড পানীয় উৎপাদন খাতের কাঁচামাল বেভারেজ কনসেন্ট্রেটের (এইচএস কোড ২১০৬৯০২১) মোট আমদানি ৮০৫ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৮৩ দশমিক ৪১ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে এ কাঁচামাল প্রস্তুত হয় না এবং শুল্ক বাড়ানোর পর সরকারের রাজস্ব বাড়বে মাত্র ৩৫ কোটি টাকা। শুল্ক বাড়ানোর পর এ বেভারেজ কনসেন্ট্রেট কাঁচামালের আমদানি আরো হ্রাস পাবে ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন হবে না। করনীতির এরূপ পরিবর্তনের ফলে এ খাতে সরাসরি নিয়োজিত তিন লাখ কর্মসংস্থানের মধ্যে ৬০-৭০ হাজার কর্মসংস্থান হুমকির মধ্যে পড়েছে।
ওপরের সবক’টি উদাহরণ থেকে দেখা যায়, করনীতি শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষে যায়নি, বরং উল্টোটি হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থানের বিষয়টি হুমকির মধ্যে আছে, অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তো হয়ইনি, বরং বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখাই কঠিন। এবারের বাজেটে তেমন আলোচনার সুযোগ ছিল না। যেটুকু হয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তার ওপর করের প্রভাব তেমনভাবে বিশ্লেষণ করার সময়ও পাননি। যা হোক আগামীতে বাজেট শিল্প উদ্যোগের কথা এবং বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার বিবেচনায় করনীতি সেভাবে প্রণয়নের প্রচেষ্টা নেবে বলেই আশা করি।
ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড-একটি পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ প্লাটফর্ম