বাংলাদেশের বাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশের বেশি এ বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। স্বভাবতই বন্দরে ব্যয়ের একটি প্রভাব পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে পড়ে। বন্দরের ব্যয় কম হলে ব্যবসায়ের ব্যয় কমে আসে, উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়ে। আর বাংলাদেশে আমদানি হওয়া ভোগ্যপণ্য খালাসের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রস্থল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর। শিল্পের কাঁচামালেরও উল্লেখযোগ্য অংশ খালাস হয় এখান থেকেই। প্রতি বছর বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের সক্ষমতা। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীবন্দরে লাইটার জাহাজগুলোর আনলোডিংয়ে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে সময়মতো বাজারে এসে পৌঁছাচ্ছে না ভোক্তাপণ্যের সরবরাহ। ফলে আরো সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে ভোক্তাপণ্যের সরবরাহ চেইন।
সরবরাহ চেইন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষই নয়, মধ্যম আয়ের মানুষকেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, লবণসহ প্রায় ১৭টি পণ্য ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে বাংলাদেশে। সরবরাহ সংকটসহ নানা কারণে এসব পণ্যের দাম ক্রমেই বাড়ছে। সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে না পারায় এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখতে না পারায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। চাল, ডাল, তেল, লবণের পাশাপাশি যাতায়াত, পোশাকসহ নানা ধরনের খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে গত কয়েক বছরে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে খাবার-দাবারসহ ভোগ কমিয়ে সংসারের বাজেট মেলাতে হচ্ছে। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষকে সংসার চালাতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সেবা ও দ্রব্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না।
দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে এখনো আমদানিতেই নির্ভরতা রয়েছে বাংলাদেশের। আর পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে বাজারে পণ্যের দামও কমে। কিন্তু দেশের আমদানিকারকরা গুদামের ভাড়া বাঁচাতে পণ্য যথাসময়ে খালাস না করে বন্দরে ফেলে রাখে এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। পণ্যের দাম কমাতে সরকারের নানা উদ্যোগও কাজ করছে না। তাই দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত খালাসের বিকল্প নেই। খালাসের পর তা বাজারে সরবরাহের উদ্যোগও নিতে হবে। বন্দরের পণ্য খালাসে দেশের নৌ-বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়নি অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের সক্ষমতা। ফলে বাড়ছে ভোক্তাপণ্য সরবরাহ চেইনের সংকট। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী উপজেলা সন্দ্বীপকে সম্প্রতি দেশের ৫৪তম নদীবন্দর ঘোষণা করা হয়েছে। এটি দেশের একমাত্র উপকূলীয় নদীবন্দর। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্যমতে, এ নিয়ে দেশের নদীবন্দরের সংখ্যা ৫৪টি। গভীরতার তারতম্যের কারণে নির্দিষ্ট ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না, অপেক্ষা করতে হয় বহির্নোঙরে। বন্দরের চ্যানেলে প্রবেশ করতে না পেরে পণ্য লাইটারিংয়ের জন্য উপকূলের যে অংশে জাহাজ নিরাপদে অবস্থান করতে পারে, সে অঞ্চলকে বলা হয় বহির্নোঙর। লাইটারিং বা ছোট ছোট জাহাজে পণ্য খালাসের মাধ্যমে মাদার ভেসেলের সব পণ্যই বহির্নোঙরে খালাস হয়ে যায়। বেসরকারিভাবে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা পণ্য খালাসের জন্য সরঞ্জাম নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামাল দেয়। ছোট জাহাজে পণ্য বোঝাইয়ের পর তা চলে যায় নদীপথে দূর-দূরান্তের গন্তব্যে। কিন্তু নৌ-বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ায় ব্যবসায়ীদের প্রায় সময়ই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় লাগছে। শুধু তা-ই নয়, বন্দরের নাব্য সংকটের কারণে বড় জাহাজ বন্দরে আসতে পারে না। এ কারণে ছোট ছোট জাহাজে পণ্য আনা-নেয়া করায় বাড়তি খরচ হয়। স্টোর রেন্ট, লোডিং-আনলোডিং ফি, রিভার ডিউস, পোর্ট ডিউস, স্টাফিং-আনস্টাফিং ফির হার অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। এ কারণে বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যায়। পার্শ্ববর্তী ও সমসাময়িক দেশের বন্দর ব্যবহারে ফি ও চার্জের আলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের ফি ও চার্জ সমন্বয় প্রয়োজন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক সময় ব্যয় হয়। দীর্ঘ সময় বন্দরে পণ্য রাখতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এভাবে ধাপে ধাপে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সৃষ্ট ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে অবশ্যই বাণিজ্যের ব্যয় কমে আসবে। যার সুবিধা শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি লাভ করবে।
পণ্য খালাস গতিশীল করতে নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর আধুনিকায়ন জরুরি। বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগ রয়েছে, সরবরাহ চেইনের সংকটের জন্য আমদানিকারকদের দায় রয়েছে। তাদের যুক্তি হলো শুল্ক কাঠামোর বিন্যাসের কারণে অনেক ব্যবসায়ী লাইটার জাহাজে পণ্য ফেলে রাখেন। ফলে দ্রুত পণ্য খালাস সম্ভব হয় না। দ্রুত পণ্য খালাস করতে এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের নদীবন্দর ব্যবস্থার আরো আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। নদীবন্দরের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, এর অবকাঠামো উন্নয়নও প্রয়োজন। বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের গতি বাড়াতে হলে নদীবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া নাব্যতা ঠিক করা এবং বহির্নোঙর থেকে পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম যেহেতু বাড়ছে, তাই অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া সরবরাহ চেইনের সংকট নিরসন সম্ভব নয়। আধুনিক নদীবন্দর গড়ে তুললে শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ দ্রুত হবে এবং ভোগ্যপণ্যের দামও স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।