দেশের উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। টানা প্রবল বর্ষণে বিভিন্ন জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। বাড়ছে নদ-নদীর পানি। মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে। মাছের ঘের ভেসে গেছে। ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক। আশ্রয়হীন বহু মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অনেক এলাকা। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের সংযোগও বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। বন্যা পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কুমিল্লা বোর্ডের গতকালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়া ছাড়া আটটি উপজেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের চরম জনদুর্ভোগ সহজেই অনুমেয়। বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকায় খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব তৈরি হয়েছে। এখন দরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অবিলম্বে সাহায্য পৌঁছানো যায়। মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। ত্রাণ ও চিকিৎসা দলগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় পাঠানো প্রয়োজন।
২০২৪ সালের আগস্টে ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর সব উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এতে ২৯ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল ১০ লাখের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। বন্যায় প্রায় ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছিল। এবার বন্যা মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
গত কয়েক দিন বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হওয়া বৃষ্টিতে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদী রক্ষা বাঁধের ১৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে দুই উপজেলার অন্তত ২৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালী জেলার বেশির ভাগ সড়ক ডুবে গেছে। বাসাবাড়িতেও ঢুকে গেছে পানি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপে টানা বৃষ্টিতে দেশের উপকূলবর্তী আরো কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে খুলনার পাইকগাছায় ডুবে গেছে ৩ হাজার ৭৫৫ মৎস্য ঘের ও পুকুর। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তায় বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলেও অতি ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বরিশাল নগরীসহ দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে ফেনীতে বাঁধ ভেঙে যাওয়াকে প্রশাসনের গাফিলতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ঠিকমতো মেরামত না করার খেসারত দিতে হচ্ছে। জুলাইয়ে যে পরিমাণ স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, তা শুরুর আগেই বাঁধ ভেঙে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধ বেশির ভাগ জীর্ণ, দুর্বল অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো আংশিক বা সঠিকভাবে মেরামত না হওয়ায় সেগুলো দুর্বল ছিল। টানা বৃষ্টিপাতে বাঁধগুলো ভেঙে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে দরকার টেকসই বাঁধ নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, স্থায়ী সংস্কার পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনগণের সচেতনতা।
দেশে বন্যার প্রকৃতি ও ক্ষয়ক্ষতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, উজান থেকে কী পরিমাণে পানি আসছে। দ্বিতীয়ত, কত দ্রুত বা ধীরগতিতে পানি আসছে আর কতদিন ধরে সেই পানি বাংলাদেশে থাকছে। তৃতীয়ত, দেশের নদী-নালা-খাল-বিলে পানির ধারণক্ষমতা। উজানের ভারতীয় অঞ্চলে এবং দেশের ভেতরের প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তিন ক্ষেত্রেই জটিলতা বেড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বিশেষত উজান থেকে আসা পলির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নদীর তলদেশের গভীরতা ও নদীর পাড় ভাঙা বাড়ছে। আবার শুকনা মৌসুমে নদীগুলোর পানি পরিবহনক্ষমতা কমে গিয়ে পলি জমা হয়ে নদী ভরাট করে ফেলছে। আবার দেশের ভেতরের নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, চ্যানেলগুলো বন্ধ হওয়ায়ও দিন দিন বন্যা বাড়ছে। এসব সংকটের সমাধান করতে না পারলে বন্যার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। বন্যা মোকাবেলায় সব কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে ঘন ঘন বন্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। এটি একটি আপৎকালীন অবস্থা, যা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই আরো খারাপ হয়েছে। পুকুর, খাল ও হাওর, যেগুলো একসময় অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বন্যার সময় অতিরিক্ত পানির জলাধার হিসেবে কাজ করত, কয়েক দশকে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবিবেচনাপ্রসূত উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ সরকারি নীতির কারণে এমনটা হয়েছে। ওই এলাকায় অনেক নদ-নদীও দখল করা হয়েছে। এতে গ্রীষ্মকালে এগুলো শুকিয়ে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উপচে পড়ে। দেশের প্রধান নদীগুলোকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নিতে হবে। বছর বছর নদী খননে অর্থ বরাদ্দ হলেও সে অনুপাতে কাজ হয় না। মানুষকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে হলে লোক দেখানো নদী খননকাজ বন্ধ করতে হবে। টেকসই ও পরিকল্পিত উপায়ে নদী খননে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন বলছে—জলাবদ্ধতা ও বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি চলছে। পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে। আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছে।
দুর্গত মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও দ্রুত পৌঁছাতে হবে বন্যা উপদ্রুত এলাকায়। যেসব স্থানে রান্নার সুযোগ থাকবে না, সেসব স্থানে শুকনা খাবার সরবরাহ করতে হবে। ত্রাণ কেন্দ্রগুলোয় যাতে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহে নজর দিতে হবে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বাগ্রে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদেরও। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশে বহু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আছে, তাদেরও ত্রাণ সহায়তা ও উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দুর্গত মানুষের কাছে অতিদ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। বন্যার্তদের সাহায্যে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র এবং নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। গৃহপালিত পশু-পাখি নিরাপদে সরিয়ে আনতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও দেশের সামর্থ্যবানদের বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যায় প্রত্যেকের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে যাদের ঘরবাড়ি ও কৃষি, মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ঘর মেরামত করতে হবে তাকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। যার কৃষি উপকরণ দরকার তাকে উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের লক্ষণ এখনো দেখা না গেলেও অচিরেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামনে ভয়াবহ বন্যার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা আমলে নিয়েই সরকারের এখন থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের আয়ত্তের বাইরে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আশা করি, স্থানীয় প্রশাসন সঠিকভাবে কাজটি করবে এবং কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় তদারকি করা হবে।