নীতি আলোচনা

সৌরবিদ্যুতের প্রসারে জমির অভাবের যুক্তি যে কারণে খাটে না

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা মারাত্মক ভুল ধারণা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গেড়ে বসে রয়েছে যে বাংলাদেশে এর জন্য যথেষ্ট জমির অভাব রয়েছে।

পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ছয় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যা তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এরই মধ্যে ৭০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। ভিয়েতনাম তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের নিচে রয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুতের প্রধান উৎসে পরিণত করা বর্তমানে সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা মারাত্মক ভুল ধারণা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গেড়ে বসে রয়েছে যে বাংলাদেশে এর জন্য যথেষ্ট জমির অভাব রয়েছে। অথচ সরকারের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) বলছে, দেশের বড় বড় নগর ও মফস্বল শহরগুলোর প্রাইভেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িগুলোর ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে সাত-আট হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। প্রয়োজন হবে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-দাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা। বর্তমান সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিমালা ঘোষণা করলেও উল্লিখিত বিষয়গুলোয় যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে এমন কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি, যার ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সাধারণ জনগণ আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়ার হিসাব করে সত্যিকারভাবে আকৃষ্ট হবে। ২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর সূর্যোদয় যোজনা’ বা ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’ চালুর যে বিস্তারিত বিবরণ সোশ্যাল মিডিয়ার ইউটিউবে প্রচারিত হয়েছে তাতে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল বাড়ির ছাদে স্থাপন করতে চাইলে উল্লিখিত যোজনার কাছে আবেদন করার নিয়মগুলো পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ওই প্রস্তাবে তিন কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের মোট খরচ প্রাক্কলিত হয়েছিল ৪৭ হাজার রুপি, যার মধ্যে সরকার ১৮ হাজার রুপি বাড়ির মালিককে ভর্তুকি হিসেবে দেবে, বাকি ২৯ হাজার টাকা মালিকের নিজস্ব বিনিয়োগ। প্লান্টে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে ‘নেট মিটারিং’-এর সহায়তায় সরকার তা কিনে নেয়ার কথা। যোজনার পূর্ণ বিবরণ দেখে মনে হয়েছে মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য। অথচ বিএনপি সরকারের সদ্য ঘোষিত নীতিমালায় এ ধরনের কোনো ভর্তুকি কর্মসূচি নেই। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক খালি জায়গা লাগে বিধায় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তা উৎপাদন সম্ভব নয় বলে যে ধারণা রয়েছে তা মোটেও ঠিক নয়।

সিলেট বিভাগে মোট ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চা সংসদের কর্তাব্যক্তিদের বয়ানে জানা গেল যে এ চা বাগানগুলোর ৫০-৫২ শতাংশ জমিতে টেকনিক্যালি চা উৎপাদন সম্ভব, বাকি জমির প্রধান অংশে চা জন্মানো প্রাকৃতিকভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এসব জমিতে সরাসরি সূর্যের আলো বেশি পড়ায় এগুলোতে চা গাছ বাঁচতে পারে না। তারা সরকারের কাছে দাবি করেছেন যে এ ধরনের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করে তাদের লিজ-ডকুমেন্ট সংশোধন করা হলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই চা বাগানগুলোয় সোলার প্যানেল স্থাপন করে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হবে। এ সম্পর্কিত প্রস্তাব বাংলাদেশ চা সংসদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলো, দেশের সমুদ্র-উপকূল এবং নদ-নদী ও খালগুলোর দুই পাড়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা হোক। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় যে কয়েকশ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে সেগুলোয় জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই সেগুলোয় যদি বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার সহকারে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে অত্যন্ত সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে।

সম্প্রতি জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে বিপুলভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে বাংলাদেশে জমির তুলনামূলক স্বল্পতার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে যদি দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলে একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। সমুদ্র উপকূলের কথা জার্মানি বলেছে, আমি এর চেয়েও সম্ভাবনাময় মনে করি বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলোকে। এগুলোয় মানববসতি নেই, তাই ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলাই হবে না। উপরন্তু উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ গ্রিডে নিয়ে আসাও খুব বেশি ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা নয়।

আবার ডেনমার্ক বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে বিনিয়োগ প্রস্তাব বিগত হাসিনা সরকারের কাছে পেশ করেছিল তা অবিলম্বে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে। জুলাই-আগস্টে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এলএনজিচালিত বেশির ভাগ বিদ্যুৎ প্লান্ট বন্ধ থাকছে। প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্যাপাসিটি অর্জন সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদনকে এখন ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত রাখতে হচ্ছে। এ সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী আমদানীকৃত এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি, যার পাশাপাশি এখন কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোও বড়সড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, কয়েকজন প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে অন্যায্য সুবিধা দেয়ার জন্য হাসিনা সরকারের সময় এ আমদানীকৃত এলএনজিনির্ভরতার নীতি গৃহীত হয়েছিল। এ নীতির কারণে দৃশ্যত একদিকে ইচ্ছাকৃত অবহেলার শিকার হয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান, অন্যদিকে যথাযথ অগ্রাধিকার পায়নি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে দেশের স্থলভাগে গত ১৬ বছরে কয়েকটি ছোট ছোট গ্যাসকূপ ব্যতীত উল্লেখযোগ্য তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে বলা হলেও ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার কাজটি এখনো শুরু হয়নি! ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও মামলায় জেতার পর ১২-১৪ বছরে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হয়নি। ২০২৩ সালে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা জানি যে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে ৫ টিসিএফের বেশি গ্যাস আহরণ করে চলেছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো যেহেতু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও রয়েছে, তাই বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন এলাকার সমুদ্রেও গ্যাস পাওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় অভিমত। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের গোদাবরী বেসিনে ভারতও এরই মধ্যে বিশাল গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। আমরা আশা করছি, বর্তমান বিএনপি সরকার অনতিবিলম্বে সমুদ্রের ব্লকগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার পাওয়ারের সাফল্য কীভাবে অর্জিত হয়েছে তা জেনে এ দেশের সোলার পাওয়ার নীতিকে অবিলম্বে ঢেলে সাজাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব এবং ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তি। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত, এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এরই মধ্যে গণচীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে বাংলাদেশী ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। ১৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ব্লুমবার্গের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে ২০৩০ সালে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ ডলার, যেখানে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা পড়বে ৯৪ ডলার এবং কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১১৮ ডলার। সম্প্রতি বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদানের জন্য নীতিমালা ঘোষণা করলেও বেসরকারি ভবনগুলোর জন্য ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার পাওয়ার যোজনার’ আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রণোদনা প্রদানের কোনো নীতিমালা গৃহীত হয়নি। চা বাগানে সোলার প্যানেল স্থাপন এবং রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনকে অবিলম্বে সরকারের অগ্রাধিকারে নিয়ে আসা হোক। ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত ভর্তুকি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কেন অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমি এ দুটো ব্যাপারে অবিলম্বে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি; অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও