গণিত ও ইংরেজির দুর্বলতায় এসএসসিতে বেড়েছে অকৃতকার্য

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত না হওয়ার চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। এ পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছর এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। এ পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছর এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় পাসের হার ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে গড় পাসের হার কমার অন্যতম কারণ ইংরেজি ও গণিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এ দুই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে বরিশাল বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ গণিতে ও ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অভাব এসব শিক্ষার্থীদের পাস না করার অন্যতম কারণ বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। বর্তমানে যারা ইংরেজি ও গণিত পড়াচ্ছেন তাদের মধ্যে বড় অংশই অন্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী। শিক্ষকদের অনেকেই আবার স্নাতকও করেননি।

অন্যদিকে পাসের হার নিম্নমুখী হওয়া নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাসের হার বাড়ানোর চাপ ছিল শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু এবার পরীক্ষার হলে এবং খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় এসএসসি পরীক্ষার ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসতে বেশ সময় লেগেছে। এ কারণেও ফলাফলে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের সুপারিশ, এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার মানোন্নয়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। বিশেষত যারা তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে আছে তাদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে মাধ্যমিকে ফলাফল নেতিবাচক হওয়ার পেছনে প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যমান সংকটগুলোর দায় এড়ানো কঠিন। শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে প্রাথমিকে। মৌলিক শিক্ষার আধার প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এ পর্যায়ে যদি শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করতে না পারে, স্বাভাবিকভাবেই মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে সে বিষয়ে তারা পিছিয়ে থাকবে।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার অভাব ও শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অদক্ষ শিক্ষক দিয়ে পাঠদানে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়েই। ২০২৩ সালের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ শিশু গণিতে একক অংকবিশিষ্ট সংখ্যা শনাক্ত করতে পারে না। আর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের দুটি বিয়োগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না ৭৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ; দুটি ভাগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না ৯৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিশু।

এ জরিপে আরো দেখা গেছে, ইংরেজিতে ছেলেশিশুর মধ্যে ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মেয়েশিশুর মধ্যে ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ইংরেজি বইয়ের একটি বর্ণও পড়তে পারে না। আর ৮৪ দশমিক ১৫ শতাংশ ছেলেশিশু এবং ৮২ দশমিক ৮৬ শতাংশ মেয়েশিশু তিনটি বা তার কম ভুল উচ্চারণসহ একটি কাহিনী সাবলীলভাবে পড়তে পারে না।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অভিমত, পাঠদানে শিক্ষকদের অদক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না। ২০২২ সালে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও শিক্ষকদের অদক্ষতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সে প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী. গড়ে মাত্র ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষকের ক্লাস পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে বলা বাহুল্য শিক্ষকদের দক্ষ করে গড়ে না তুললে বা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষকের সংখ্যা প্রাথমিকে না বাড়ানো হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে না। দক্ষ শিক্ষক তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে যথাযথ প্রশিক্ষণ। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের ৬৭টি প্রাথমিক টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধীনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিন্তু বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণের বাইরে। আবার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষকেরও সংকট রয়েছে। মোট ১ হাজার ৪১ ইনস্ট্রাক্টর পদের মধ্যে ৩৬০টি পদই শূন্য। এছাড়া বাংলা, গণিত ও ইংরেজির জন্য ২০২৩ সালে বিষয়ভিত্তিক ৬৭টি করে ইনস্ট্রাক্টর পদ তৈরি করা হলেও এখন পর্যন্ত এসব পদের সবই শূন্য। সুতরাং যথাযথ প্রশিক্ষণের আওতায় শিক্ষকদের আনতে হলে কার্যকর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যেমন লাগবে, তেমনি প্রশিক্ষক সংকটও কাটিয়ে উঠতে হবে।

অনেক স্কুলেই পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে এক শিক্ষক দিয়েই অনেক শ্রেণীর বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হয়। এতে পড়ালেখা মানসম্মত হয় না। কারণ একজন শিক্ষকের পক্ষে একাধিক বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা কঠিন। আবার তার ওপরও চাপ তৈরি হয়, যা তার মধ্যে সুষ্ঠু পাঠদানের ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি করতে পারে। এমনিতেও শিক্ষকদের অনেকেই মধ্যবর্তী সময়ের জন্য শিক্ষকতায়, বিশেষত প্রাথমিকে যোগদান করে। যে কারণে তাদের পরিপূর্ণ মনোযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা। এটি বর্তমানে একটি বড় সমস্যা প্রাথমিক শিক্ষা খাতের জন্য। শিক্ষকদের ধরে রাখতে না পারার পেছনে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, বেতন ইত্যাদি প্রসঙ্গ হরহামেশা চলে আসে। কারণ যা-ই হোক, এক এক করে সেগুলো সমাধানের পথে হাঁটা জরুরি। নয়তো শিক্ষার ভিত কখনই মজবুত হবে না। আর দুর্বল ভিতের ওপর যে কখনো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা কাঠামো দাঁড়াতে পারে না তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরও