শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি। তিনি লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে দুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব এবং লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। ১৯৯৬-৯৮ সালে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম ও আনিকা মাহজাবিন
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদল অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তাদের সেই ভূমিকায় আমরা দেখতে পেলাম না কেন বা কমতি কোথায় ছিল?
বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির ধারাবাহিকতায় আশির দশক বলেন বা নব্বইয়ের দশক বলেন, সেই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে আর কন্টিনিউ করেনি। ছাত্ররাজনীতির ইমেজ বিভিন্নভাবে নষ্ট করা হয়েছে। ছাত্রলীগ ক্ষমতায় এসে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ছাত্ররাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসকে তারা এমনভাবে জিম্মি করেছে যে অন্য ছাত্র সংঘটনগুলো ক্যাম্পাসে রাজনীতি করার কোনো স্পেস পেত না। এতে স্বাভাবিক ছাত্ররাজনীতি গড়ে ওঠার কোনো পরিবেশই ছিল না। মেধার কোনো চর্চা তো একেবারেই ছিল না। আমাদের সময়ে মধুর ক্যান্টিন থেকে ছাত্ররাজনীতিকে যেভাবে গাইডেন্স করা হতো তা বর্তমান ছাত্ররাজনীতিতে সেই সংস্কৃতি একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আমাদের ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে সবক’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের রাজনীতি করতে পারেনি ছাত্রলীগের বাধার কারণে। ক্যাম্পাসে ঢুকলেই ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়ে আমাদের অনেক নেতাকর্মী আহত ও নিহত হয়েছেন। তাই আমাদের ছাত্রদল ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিক্ষোভ করেছে।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদল কীভাবে যুক্ত ছিল?
গত ১৮ বছরে ছাত্রদল ক্যাম্পাসের বাইরে, বিভিন্ন ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় যেভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে গেছে তা কিন্তু অন্য কোনো ছাত্র সংগঠন করেনি। ছাত্রদল বা আমাদের বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ১৮ বছর ধরে যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে, তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ছাত্রদের চব্বিশের এ আন্দোলন। ছাত্রদের চব্বিশের এ আন্দোলনের সূচনা কোটা সংস্কার নিয়ে হলেও তা পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারের পতনে আমাদের ছাত্রদলের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। আমরা কখনই চাইনি যে এ আন্দোলনে আমাদের ছাত্রদল নেতৃত্ব দিক, কেননা তাহলে আন্দোলনটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিত এবং সরকার তখন বিএনপি-জামায়াত বলে আরো কঠোরভাবে দমন করত। আর এ ছাত্র আন্দোলনে আমাদের ছাত্রদল সমর্থিত হাজার হাজার শিক্ষার্থী ছিল, যাদের মধ্যে অনেকে শহীদ হয়েছে, আহত হয়েছে এবং অনেকে পঙ্গুত্বও বরণ করেছে। তাই এ আন্দোলন সাধারণ ছাত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষের সম্মিলিত একটি আন্দোলনে রূপ নেয় যার ফলে শেখ হাসিনার পতন হয়।
সম্প্রতি নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হলো—ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), বিষয়টিকে আপনারা কীভাবে দেখেন? তরুণ ও জেন-জিদের বড় একটা অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে, তাদের কাছে নতুন রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে মনে করা হয়। এতে বিএনপি কি চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে?
যে রাজনৈতিক দলের কথা বললেন, তা আন্দোলনের মাধ্যমেই তথা রাস্তা থেকেই তাদের উত্থান। আমি এবং আমার দল তাদেরকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই এবং আমরা এ তরুণদের রাজনীতিতে আসাকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। অন্যান্য রাজনৈতিক দল দেশকে নিয়ে যেভাবে ভাবে বা দেশকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, আমরা আশা করি তারাও এভাবেই রাজনীতি করবে। সবাই মিলে যেহেতু ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি, তাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আমার কথাবার্তায়, আচরণে পজিটিভিটি (ইতিবাচকতা) থাকে। এটা যেন কোনোভাবেই নিজেদের কথা বা আচরণের কারণে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া ইদানীং বিভিন্ন বক্তব্যে এটাই বারবার ব্যক্ত করেছেন যে বিএনপি যেন পজিটিভ (ইতিবাচক) রাজনীতি করে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংঘর্ষে না যায়, এমনকি কোনো সাংঘর্ষিক কথাবার্তাও যেন না হয়। কোনোভাবেই যেন বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়—তিনি নেতাকর্মীদের বারবার এটি বলছেন। কারণ বিএনপি প্রায় দুই দশক ধরে দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে আসছে। আমাদের একটাই লক্ষ্য, সবাই মিলে দেশটাকে গড়ব। ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার দোসররা এখনো ধরা পড়েনি, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। তার পরও বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেন কোনো মতবিরোধ না হয় আমরা সেদিকে নজর রাখছি। এ রাজনৈতিক দলের সবাই বয়সে তরুণ এবং তাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক স্পিরিট আছে যা এ বয়সে আমাদের মধ্যেও ছিল। সুতরাং তারা ইতিবাচক রাজনীতি করবেন বলেই প্রত্যাশা। তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে, আলোচনা হয়েছে এবং এ আলোচনা চলতেই থাকবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি। সুতরাং সব কিছুর ওপরে আমাদের ঐক্য ধরে রাখতে হবে এবং এটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছি।
গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে গণতন্ত্র, ভোট, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর ইন্টারনাল ডেমোক্রেসি (অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র) জরুরি। বহু বছর ধরে বিএনপির কাউন্সিল হয় না এবং মহাসচিব থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই মনোনীত হচ্ছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী।
বিগত স্বৈরাচারের আমলে আমরা কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম করতে পারিনি। আপনারা দেখেছেন কীভাবে আমাদের প্রতিনিয়ত আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছিল। এ আন্দোলন করতে গিয়ে গুম, খুন, জেল, জুলুম কোনো কিছুই তো বাকি ছিল না। বারবার আমাদের জেলে যেতে হয়েছিল, আমরা কিন্তু সংগঠন করতে পারিনি। তার পরও বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি, যেমন পদযাত্রা, সমাবেশ, গণসমাবেশ, মহাসমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছি।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে আমাদের সংগঠন হচ্ছে। পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০০-৪০০ সাধারণ সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক হবে। একটা ওয়ার্ডে ৫১ জন হলে একটা ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ড, মোট ৪৫৯ জন সদস্যের ভোটে ইউনিয়ন কমিটি গঠন হবে। ওয়ার্ড কমিটি করতে সময় লাগলেও ইউনিয়ন, থানা বা জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে বেশি সময় লাগবে না।
তারেক রহমান গঠনতন্ত্র কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য নির্দেশনা দিচ্ছেন। শুধু বিএনপি নয়, বিএনপির সব অঙ্গ সংগঠন একই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন করছে। এর ফলে দলের ভেতরকার মতবিভেদ যেমন কমে আসছে, তেমনি দল সুদৃঢ় ও সুসংগঠিত হচ্ছে।
২০২২ সালের দিকে চব্বিশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আপনাদের ৩১ দফা প্রস্তাব করা হয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ৩১ দফা কতটুকু প্রাসঙ্গিক? অনেকের মতে এটাকে আরো সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট করা যেত। দলীয় বলয়ের বাইরে ৩১ দফাকে আপনারা কতটুকু জনপ্রিয় করতে পেরেছেন?
জনপ্রিয় না করতে পারার কোনো কারণ নেই। ৩১ দফার মূল ভিত্তি হলো শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা। এতে আরো রয়েছে ২০১৭ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত ভিশন-২০৩০। ২০১৮ সালে যখন রাতের ভোটচুরির মতো ন্যক্কারজনক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে দেশের সব বিভাগ, বৃহত্তর জেলায় আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি। সব ধরনের পেশাজীবী, ছাত্রদল, রাজনৈতিক নেতারাসহ সিনিয়র সিটিজেনদের সঙ্গে আমরা প্রাথমিকভাবে ২৭ দফা নিয়ে আলোচনা সভা, সিম্পোজিয়াম করেছি। সেখানে আমরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রাসঙ্গিকতা, গঠন, উচ্চ এবং নিম্নকক্ষের কার্যাবলি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছি। মোটামুটি দীর্ঘ সময়ের গবেষণা এবং রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে দেশ পুনর্গঠনে এ দফাগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে, যেন একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচারী সরকারের একচেটিয়া ক্ষমতা দখলের সুযোগ আর না থাকে।
২০২২ সালে সহযোগী সব সংগঠনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ ২৭ দফা ৩১ দফায় উত্তীর্ণ হয়, যা ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এ ৩১ দফায় অনধিক পরপর দুবার প্রধানমন্ত্রিত্বের নিয়ম, জুডিশিয়ারি সংস্কার, মিডিয়া কমিশন, সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদের সংস্কার, স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি নিয়ে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, যা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিটির প্রস্তাবনার সঙ্গে অনেকাংশেই মিলে গেছে।
সংস্কারের যে প্রস্তাবনা আসছে তার বাস্তবায়ন কী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই হবে নাকি আপনারা নির্বাচিত হলে তখন করা হবে? আপনারা বড় ধরনের সংস্কার বা পরিবর্তনের চেয়ে দ্রুত নির্বাচনের পক্ষপাতী বলে বিভিন্ন পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনাদের অবস্থান কী?
সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। ধারাবাহিক সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়েই এটি চলবে। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রক্রিয়াও গতিশীল থাকবে। আমাদের ৩১ দফার যেমন সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে মিল রয়েছে, তেমনি দেশ বিনির্মাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য আমরা সর্বদা সচেষ্ট। এ দুইয়ের মধ্যে কোনো সংঘাত আছে বলে আমরা মনে করি না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সব কাজে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ সাধারণত সীমিত হয়। আমরা দল-মত নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে ফ্যাসিবাদের অবসান করেছি, দেশকে নতুন করে গড়ে তোলাই আমাদের সবার লক্ষ্য এবং যেখানে সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, সেহেতু আমাদের একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটা গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দাবিতে কারোর দ্বিমত থাকার সুযোগ আছে কি? অন্যান্য রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের জনগণের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলনই আমাদের দাবি।
এ অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার বিচারসহ, নিপীড়নমূলক মামলা প্রত্যাহার, গুম-খুনের শাস্তি নিশ্চিত করতে অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে যা একেবারেই কাম্য নয়। তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ নেই৷ বাংলাদেশের এ মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত প্রয়োজন যা একমাত্র একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই সম্ভব। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি থেকে শুরু করে বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস, অর্থনীতির বেহাল দশা—এ সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার চাইছে যারা এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ করতে সক্ষম হবে। বিএনপি তো একদলীয় সরকার গঠন করার কথা বলেনি, বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা একাত্ম হয়েছে তাদের সবাইকে নিয়ে ৩১ দফার ভিত্তিতে ঐক্যদলীয় সরকার গঠন করতে চায়, দেশকে নতুনভাবে গড়তে চায়।
অন্তর্বর্তী সরকারকে সবার সরকার বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ সরকারের মধ্যে বিএনপির সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নেই কেন? সম্প্রতি এক ছাত্র উপদেষ্টা পদত্যাগ করে নতুন দলের আহ্বায়ক হলেন। কিন্তু সরকারে এখনো তার দুই সহযোদ্ধা উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন। বিষয়টিকে আপনারা কীভাবে দেখেন?
অন্তর্বর্তী সরকারে কেন আমাদের দলীয় লোক থাকতে হবে? দলীয় লোক থাকার পক্ষে তো আমরা ছিলাম না। অন্তর্বর্তী সরকার একটি নিরপেক্ষ সরকার। ওখানে যারাই আছেন নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। যে কারণে একজন উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হলো। এর পরই তার নেতৃত্বে তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলেন। এখন অন্য যারা আছেন, তাদেরও পদত্যাগ করা দরকার বলে মনে করি। করে হয়তো রাজনৈতিক দলেই থাকবেন নয়তো নিরপেক্ষতার অবস্থানেই থাকবেন। এগুলো আসলে চিন্তার ব্যাপার। আমাদের মতো আরো দশজনই এ চিন্তা করেন। তারা এ যুগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা আরো বেশি চিন্তা করেন বলে আমরা মনে করি। এ আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র নেতৃত্বে ছিলেন তারা, আমাদের চেয়ে বেশি চিন্তা করেন। তাদের চিন্তাকে আমরা সম্মান দিই। এ সম্মানের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য থাকবে। জাতীয় ঐকমত্যের সরকার হবে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ায় পৌঁছাতে যেন সমস্যা না হয় সেজন্য নির্বাচনের কথা আসছে। সেই সঙ্গে সংস্কারের কথাও আসছে। বিচারের কথাও আসছে। শেখ হাসিনার বিচারে প্রায়োরিটি রয়েছে। শেখ হাসিনার বিচার না করতে পারলে জাতি কিন্তু আমাদের ক্ষমা করবে না।
আপনি একসময় ডাকসুর সামনের সারির ছাত্রনেতা ছিলেন। কেউ কেউ বলছেন, সামনের ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনে ছাত্রদল থেকে বাধা পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি কি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সমর্থন করে?
আগেও চেয়েছে, এখনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন চায় বিএনপি। একটি ক্যাম্পাসে অবশ্যই কৌশলী হয়ে যদি বলা হয় যে ছাত্ররাজনীতি করা যাবে না—এ নিয়ে আমার আপত্তি রয়েছে। ৫ আগস্টের পর সবাই তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ছাত্র রাজনীতি করবে। ছাত্ররাজনীতির যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে সেখান থেকে বের হয়ে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্ররা যার যার মতো করে ছাত্ররাজনীতি করবে। কিন্তু সেই রাজনীতিটা যেন হেলমেট বাহিনীর মতো না হয়। ছাত্রলীগের মতো যেন না হয়। এখন কে করবে, কে করবে না—এ ধরনের অবস্থান থেকে বের হয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি।
ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি করার পেছনে কিছু আর্থিক টাকা পয়সা তো লাগে। দলেরও লাগে। এখন কেউ কেউ বলছে টাকার উৎস কোথায়। এ নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা। ফেসবুকে দেখবেন যে ছাত্রশিবির বা ছাত্রদলের রাজনীতি করতে গেলে টাকার উৎস কী। আমার মনে হয় এগুলো খুব নমিনাল জিনিস। আমরা যখন ছাত্ররাজনীতি করেছি তখন এ ধরনের প্রশ্ন আসেনি। এখন এ ধরনের প্রশ্ন করে পরস্পরের সঙ্গে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে, ক্যাম্পাসের অবস্থান থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান থেকে ছাত্ররাজনীতির ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছি। সরে যাচ্ছি। সুতরাং এগুলো না করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য যথাযথ এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ যাতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। সেটি হলে ছাত্রদল যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচন করবে। ছাত্রদল জিততে হবে বা না জিতলে ছাত্রদল শেষ হয়ে যাবে—এ ধরনের ধ্যান-ধারণার মধ্যে আমরা নেই। সাধারণ শিক্ষার্থী যাকে ভোট দেবে সেই আসবে। এখন ছাত্রদল কিছু প্রতিযোগিতায় যাবে। যেমন ছাত্রদের অধিকার রক্ষা করা, বেতন-ভাতা নিয়ে কথা বলা এবং বই-খাতাসহ ছাত্র সম্পর্কিত সব বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে কথা বলবে।
৫ আগস্টের পর ছাত্রদল ক্যাম্পাসে যাবে। ছাত্রদের কল্যাণে ইতিবাচক রাজনীতি করবে, যা আমরা নিজেরাও অতীতে করেছি। সুতরাং যদি কেউ মনে করে একটি কৌশলে ছাত্রদলকে দূরে সরিয়ে রাখবে, সেটি ভুল হবে। এটি একটি ওপেন প্রতিযোগিতার ব্যাপার। হেরে গেলে হেরে যাবে। আর জিতে গেলে গেল। আর ছাত্রদলের তো জয়ী হওয়ারই কথা। কারণ তারা ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক রাজনীতি করে এসেছে যার জন্য ছাত্রদলের এখন পর্যন্ত সুনাম আছে।
তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (জেএনপি)। এ দলকে কি আপনারা চ্যালেঞ্জ মনে করছেন?
আমরা কেন চ্যালেঞ্জ মনে করব? তারা একটি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে। তবে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে ওঠে আসায় প্রথমেই আমি এটিকে ইতিবাচক হিসেবে বলেছি। তাদের কাছে আমি ইতিবাচক রাজনীতি আশা করছি। কেন তারা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। এর কোনো কারণ নেই।
তরুণ ভোটাদের ভোট কম পাওয়ার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হবে কিনা?
জনগণ যাকে ভোট দেবে কিংবা তরুণরা যাকে ভোট দেবে, সেটি আমাদের মেনে নিতে হবে। যেটি আওয়ামী লীগ কখনো মানেনি। যার জন্য তারা তরুণদের ভোট দিতে দেয়নি, জনগণকে জিম্মি করেছে, এক দলীয় এবং এক ব্যক্তি ভোট করেছে। কিন্তু বিএনপি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলা দল। গণতান্ত্রিক পন্থাকেই বিএনপি প্রাধান্য দিচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে। সে নির্বাচনে যে দলই আসুক। সেখানে কারো সঙ্গে কারো জোট হতে পারে; নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের পরে কিংবা সরকার গঠনে জোট হতে পারে এবং আমাদের পক্ষ থেকে আমরা সেটিই বলেছি ৩১ দফার মধ্য দিয়ে যে সর্বশেষ আমরা যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি, সবাই মিলে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করব।
এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনের পূর্বে এমন জোট গঠনের কোনো পরিকল্পনা আপনাদের আছে কি?
এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; ছোট ভাই-বড় ভাইয়ের সম্পর্ক, রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক। আমরা তাদের ইফতারের দাওয়াত দিয়েছি। তারা আসবেন।
দিনশেষে ভোটের রাজনীতিতে ঐকমত্য থাকে না। এক্ষেত্রে তরুণ ভোটারদের ধরে রাখতে আপনারা কী ভাবছেন?
তারা যেমন তরুণদের নেতৃত্ব দিচ্ছে, আমার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তরুণদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমিও তরুণদের নেতৃত্ব দিচ্ছি। সুতরাং আমার অভিজ্ঞতা, দলের তরুণ নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান—এটি অনেক ইতিবাচক। সুতরাং তরুণরা আমাদের সমর্থন করছে এবং করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। কারণ তরুণরা দেখবে আমাদের নেতৃত্বের মধ্যে অভিজ্ঞতা কেমন, দেশ পরিচালনা করতে আমরা কতটুকু সক্ষম। তারা খুব ইতিবাচকভাবে আমাদের নেবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তারাই জয়ী হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভোটাররা আপনাদের কতটুকু চায় এমন কোনো তথ্য আপনাদের কাছে আছে কি? জামায়াতের ভোটের হার বাড়ছে বলে মনে করছেন?
আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রায় বলেন, আগামী নির্বাচন যেটি হবে তা খুব কঠিন হবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য এরই মধ্যে জেলায় জেলায় বিএনপির প্রতিনিধি সভা করিয়েছেন, সম্মেলন করাচ্ছেন। গণতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল করে উঠে আসছে এবং সর্বশেষ বর্ধিত সভায় খুব সুনির্দিষ্টভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের মধ্যে যেন ঐক্য থাকে সেটিকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ইতিবাচক রাজনীতি করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা খুব ওভার কনফিডেন্সে ভুগছি না। জনগণের ম্যান্ডেটকে আদায় করার জন্য তৃণমূল থেকে যেভাবে ধাপে ধাপে কাজ করা দরকার সেভাবে কাজ করছি। প্রতিনিয়ত আমরা মাঠে আছি। জনগণকে সম্পৃক্ত করে আমরা কাজ করছি।
জনগণের বাইরে অন্যকিছু আমরা চিন্তা করছি না। মাই ম্যান, মাই পার্টি, এক ব্যক্তি, এক দল—এগুলো আমাদের মধ্যে নেই। এখান থেকে বের হয়ে গেছি বলেই ৩১ দফাকে আমরা সামনে নিয়ে আসছি।
জামায়াত তাদের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করবে। আমি আমার আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করছি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনীতির পথ আমাদের দেখিয়েছেন। যেখানে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে রয়েছে সাধারণ মানুষের রাজনীতি। এটি কঠিন কোনো সমীকরণ নয়, বরং আমজনতার পার্টি। সুতরাং এখান থেকে নেতৃত্ব ওভাবেই বেরিয়ে আসে। আমরাও সেভাবে ভাবছি। যেমন জিয়াউর রহমানের খাল কাটার রাজনীতি। এ খাল কাটার মধ্য দিয়ে পানি আসছে। সেই পানিতে মাছ চাষ হচ্ছে, খেতে দিচ্ছে। খালের দুই পাশে গাছ লাগাচ্ছে সেখানে হাঁস-মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে। ধানের শীষ মার্কার সঙ্গে সবাই সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।
এছাড়া মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ও মারমাসহ নানা জাতি-বর্ণ-গোত্রকে একত্রিক করেছে। জিয়াউর রহমান এ রাজনীতি দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন-সংগ্রামে যেভাবে ভূমিকা রেখেছেন। শুধু এরশাদের বিরুদ্ধে নয়। ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধেও যেভাবে লড়াই করেছেন, যার জন্য তিনি অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েছেন। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও নির্যাতিত হয়েছেন। মামলার মুখে পড়েছেন এবং সাজাও পেয়েছেন। আমরা সবাই অত্যাচারিত হয়েছি, নির্যাতিত হয়েছি। এটি একদিনের ব্যাপার নয়। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মানুষের জন্য আমরা লড়াই করেছি।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কবে দেশে আসতে পারেন?
আমাদের গাইড করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। আমাদের প্রত্যেকটি মিটিং কিংবা সম্মেলনগুলোয় লক্ষ করলে দেখবেন আমাদের মধ্যে পরিবর্তন চলে এসেছে। আমরা নতুন আঙ্গিকে জনগণের পাশে থেকে, জনগণের দিকে যাচ্ছি যা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানেরই পরিকল্পনা। এজন্য আমরা তারেক রহমানের কথা, স্টাইল ও পরিকল্পনাকে ব্র্যান্ডিং করছি। সবকিছু মিলে আজকে আমরা তার অপেক্ষায় আছি। তবে দুটি জিনিস। প্রথমত, বাংলাদেশ ও লন্ডনে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই তিনি আমাদের মাঝে আসবেন। বাংলাদেশে তারেক রহমান যেভাবে কাজের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন, সামনের দিনে কাজের মাধ্যমে তিনি আরো জনপ্রিয় হবেন যা আমরা প্রত্যক্ষভাবে তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি।