শিক্ষা ভাবনা

জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন

শিক্ষানীতির মতাদর্শগত ভিত্তি রচনা: একটি সুষ্ঠু শিক্ষানীতি এক বা একাধিক মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোনো দেশের জনগণের মনন, জ্ঞান ও দক্ষতা গঠনের বিশেষ নিয়ামক হলো শিক্ষা। কাজেই একটি দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে অভিন্ন জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত করে মনন, জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন একটি সমস্বত্ব জাতিতে পরিণত করতে সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, কওমি শিক্ষা, ইংলিশ ভার্সন শিক্ষা ও ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ইত্যাদি নানা ধরায় বিভক্ত ও উপবিভক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের জন্য জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন জরুরি।

রাষ্ট্র ক্ষমতাধীন যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের পাঁচটি ধাপ রয়েছে—১. শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি রচনা ২. শিক্ষা দর্শনের আলোকে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ৩. প্রণীত সেই শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন ৪. শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঠিক শিক্ষা প্রশাসন সৃজন ও ৫. সর্বশেষে শিক্ষা প্রশাসনের মাধ্যমে অভীষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থাটির প্রবর্তন ও পরিচালনা। এ ধাপগুলো বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্নির্মাণেও সমানভাবে কার্যকর হবে। কাজেই শিক্ষানীতি নির্মাণের এ তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসরণ করে, নিম্নে একটি সমন্বিত শিক্ষানীতির রূপকল্প তুলে ধরা হলো।

শিক্ষানীতির মতাদর্শগত ভিত্তি রচনা: একটি সুষ্ঠু শিক্ষানীতি এক বা একাধিক মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসরণে শিক্ষানীতি প্রণয়নের ভিত্তি হবে সংবিধানে বিবৃত রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। তবে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতির একটি হলেও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মের স্বীকৃতি ও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা সংবিধানে বিধৃত থাকায় রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি গণতন্ত্র হওয়ার সুবাদে জনগণের ব্যক্তিগতভাবে ও সম্মিলিতভাবে এবং দলগতভাবে মতাদর্শ প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। যে কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদ (এর অন্য রকমফের হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ), ইসলাম ও সমাজতন্ত্র এ তিনটি মতাদর্শভিত্তিক বিভিন্ন দল দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দল ভেঙেছে-গড়েছে, কিন্তু মতাদর্শ টিকে আছে কাল-কালান্তর ধরে। বর্তমানে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ন নামক পুঁজিবাদী হুজুগ বা মতাদর্শ। ফলে দেশে এখন চারটি প্রধান মতাদর্শ প্রচলিত রয়েছে। এসব মতাদর্শের মধ্যে বাঙালি/বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হলো দেশজ এবং বাকি তিনটি মতাদর্শ হলো বৈদেশিক। ইসলাম, সমাজতন্ত্র ও বিশ্বায়ন—এ তিন বৈদেশিক মতাদর্শ হলেও এগুলো বাঙালি/বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেয়ে অনেক পুরনো ও স্বব্যাখ্যাত, সে তুলনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ নতুন ও অত্যন্ত অব্যাখ্যাত একটি মতাদর্শ। বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলাম, সমাজতন্ত্র ও বিশ্বায়ন যথাক্রমে সাধারণ শিক্ষা, ইসলামিক শিক্ষা, ধর্মশিক্ষা ব্যতীত বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমে বিদেশী পাঠ্যক্রমে শিক্ষাকে সমর্থন করে। অনুরূপভাবে হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি শিক্ষা কার্যক্রমে যথাক্রমে সবচেয়ে বেশি মাত্রা থেকে সবচেয়ে কম মাত্রায় ইসলামী শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকে সমর্থন করে। 

বিভিন্ন মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন দলের ভাঙাগড়া ও উত্থান-পতন হতে পারে, কিন্তু মতাদর্শ টিকে থাকে এবং পুনর্জন্মও হয়। কাজেই দুটি ভিন্ন পদক্ষেপ অনুসরণে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা সম্ভব। এর একটি পদক্ষেপ হলো অপরাপর মতাদর্শগত দলগুলোকে উপেক্ষা বা দমন করে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রণয়ন করা। বর্তমানে চীন ও ইরানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা এ প্রক্রিয়ায় প্রবর্তিত। এর অন্য একটি পদক্ষেপ হলো বিভিন্ন মতাদর্শের ভিত্তিতে গঠিত দলগুলোর পারস্পরিক নীতিসংলাপের মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রণয়ন। প্রথম পদক্ষেপ অনুসরণে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হলে হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-বহির্ভূত দলগুলোকে উপেক্ষা বা দমন করে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বর্তমানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। বিকল্প পদক্ষেপ অনুসরণে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হলে বাঙালি/বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলাম ও সমাজতন্ত্র ও বিশ্বায়ন—এ চারটি মতাদর্শের ভিত্তিতে গঠিত সব রাজনৈতিক দল, যেমন হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যাবে। গণতন্ত্র যেহেতু রাষ্ট্রের অন্যতম একটি মূলনীতি, সেহেতু বিভিন্ন মতাদর্শগত শ্রেণীর অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিক্ষার মতাদর্শগত ভিত্তি সৃজন করা প্রয়োজন। কেননা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-বহির্ভূত দলগুলোকে উপেক্ষা বা দমন করে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন, কোনো গণতন্ত্রসম্মত প্রক্রিয়া নয়।

শিক্ষানীতি প্রণয়ন: সমন্বিত মতাদর্শগত ভিত্তি সৃজন সম্ভব হলে তার ওপর নির্ভর করে শিক্ষানীতি প্রণয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে শিক্ষানীতি প্রণয়নের পূর্বে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে শিক্ষানীতি বলতে কী বোঝায়। শিক্ষানীতি হলো জাতীয় কোনো মতাদর্শের আলোকে কর্মক্ষম, মানবিক ও নৈতিক জাতি গঠনের লক্ষ্যে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক আদর্শ, জ্ঞান ও দক্ষতাসংশ্লিষ্ট পাঠ্যবিষয়গুলো নির্ধারণ এবং তা শিক্ষা প্রশাসন কর্তৃক নির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রসারিত করার বিবৃত নীতিমালা বিশেষ। বর্তমানে বাংলাদেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে তা ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কিছু সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা মাত্র। কাজেই এটি কোনো মতাদর্শগত সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো শিক্ষানীতির ভিত্তিতে প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। কারণ একটি সম্পূর্ণ শিক্ষানীতিতে যা কিছু বিবৃত থাকে তা হলো— ক. শিক্ষার অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক বিষয়গুলো খ. শিক্ষার স্তর গ. শিক্ষার ধারা ঘ. শিক্ষার ধরন ঙ. শিক্ষা প্রদানের ভাষাগত মাধ্যম চ. শিক্ষা প্রশাসন ছ. শিক্ষা আইন ও নিয়ম জ. শিক্ষাদানের কৌশল ও ঝ. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা মূল্যায়ন ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে এগুলো স্পষ্টভাবে বিবৃত নয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ দেশে বিভিন্ন সময়ে যথাক্রমে ১৯৮৮, ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৭ ও ২০১০ সালে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এ শিক্ষানীতিতে (২০১০) শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নে আবশ্যকীয় বিষয়গুলো—মতাদর্শগত ভিত্তি, নীতি, পরিকল্পনা ও শিক্ষা প্রশাসন ইত্যাদি স্পষ্টভাবে বিবৃত করা হয়নি। তাছাড়া কী ভাষিক মাধ্যমে শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করা হবে বা কোন ভাষা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠ্যক্রমভুক্ত বিষয় বলে বিবেচিত হবে তা ভাষানীতির এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ভাষানীতি নেই। বাংলাদেশে কোনো ভাষানীতি তো নেই-ই, উপরন্তু বর্তমান শিক্ষানীতিতে যা কিছুই বিবৃত থাকুক না কেন, আরবি ও উর্দু মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজিমাধ্যমে বিদেশী পাঠ্যক্রমে শিক্ষার মতো চরম বৈপরীত্যপূর্ণ বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চালু রয়েছে। বিভিন্ন ধারার শিক্ষার মধ্যে, আরবি ও উর্দু মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজিমাধ্যমে বিদেশী পাঠ্যক্রমে শিক্ষা—এ উভয় ধরনের শিক্ষার অনুসারীরা সংখ্যায় কম। তবে এ দেশে তারা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী সামাজিক শ্রেণী। ইংরেজি মাধ্যমে বিদেশী পাঠ্যক্রমে শিক্ষার অনুসারীরা দ্বিচারী নীতি আদর্শের অধিকারী। কেননা তারা মূলত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন, যদিও তারা নিজেদের জন্য এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনুপযুক্ত মনে করেন। কাজেই বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে আদর্শিক, নীতিগত ও সামাজিক শ্রেণীগত বাধা রয়েছে। 

সেজন্য সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি সংলাপ প্রয়োজন। এ-জাতীয় শিক্ষানীতি সংলাপের আলোচ্য বিষয়গুলো হবে—শিক্ষার অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক বিষয়গুলো, শিক্ষার স্তর, শিক্ষার ধারা এবং আদর্শ অর্জন সহায়ক শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন সহায়ক শিক্ষা—এ তিন ধরনের শিক্ষাকেই অঙ্গীভূত করা প্রয়োজন। তাছাড়া শিক্ষাদানের ভাষাগত মাধ্যম, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষা আইন ও নিয়ম, শিক্ষাদানের কৌশল ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা মূল্যায়ন ইত্যাদি। এ শিক্ষানীতি সংলাপের লক্ষ্য হবে অগ্রাধিকারমূলক পাঠ্য বিষয় ও শিক্ষাদানের ভাষিক মাধ্যম স্থির করে সেইসব অগ্রাধিকারমূলক পাঠ্য বিষয়গুলো সেই অগ্রাধিকারমূলক ভাষিক মাধ্যমে বাধ্যতামূলক পাঠের ব্যবস্থা করা যেন সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।

শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন: সফলভাবে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা সম্পন্ন হলে তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। সেজন্য আগে থেকে প্রণীত শিক্ষানীতিটিকে পরিকল্পনায় ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন হয়। শিক্ষা পরিকল্পনা হলো শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কৌশল, কার্যক্রম ও প্রক্রিয়া। কাজেই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন অপরিহার্য। শিক্ষা পরিকল্পনায় শিক্ষাক্রম পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রম পরিকল্পনা, শিক্ষা প্রশাসন পরিকল্পনা ও পাঠ্যপুস্তক পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়। শিক্ষা পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকলে অথবা অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতিভিত্তিক (২০১০) পূর্ণাঙ্গ কোনো শিক্ষা পরিকল্পনা নেই।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা সৃজন: ধারা বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বয় করতে হলে সমন্বিত শিক্ষা প্রশাসন সৃষ্টি করা প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসন বহুধাবিভক্ত। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা ইত্যাদি শিক্ষার কয়েক স্তর বিভিন্ন ধারার শিক্ষার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রশাসন রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে সাধারণ শিক্ষা ও ইবতেদায়ি শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষা প্রশাসনের অস্তিত্ব রয়েছে। তেমনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক স্বীকৃত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড নামক আলাদা তিনটি প্রশাসন রয়েছে। উচ্চশিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক পরিচালনার কথা বলা হলেও এ শিক্ষা স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট বাণিজিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রশাসনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। অধিকন্তু বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) অধীনে পরিচালিত মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ইংরেজি মাধ্যমে বিদেশী পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা প্রশাসনের অস্তিত্বও রয়েছে।

প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অভীষ্ট সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন: সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন শিক্ষানীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ হলেও এ প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী ধাপগুলোর প্রত্যেকটি ধাপেই সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে পরের ধাপে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। পূর্ববর্তী সব ধাপে পর্যায়ক্রমে সমন্বয় সাধন না করে এমনকি শিক্ষানীতি একেবারেই প্রণয়ন না করেও একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব, তবে শিক্ষানীতি ও শিক্ষা পরিকল্পনা দ্বারা অসমর্থিত সেই শিক্ষা ব্যবস্থা টেকসই জ্ঞানচর্চা সহায়ক নয়। সেজন্য সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী সব ধাপে সমন্বয় সাধন করে সমন্বিত শিক্ষা পরিকল্পনাগুলো অনুসরণে সমন্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারলে অভীষ্ট সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব হবে। এভাবে প্রবর্তিত সব ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা একটি সমন্বিত শিক্ষা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হলে এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ক্যাম্পাস থেকে পরিচালনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য যে পাঁচ ধাপবিশিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব রয়েছে, তার প্রত্যেকটি ধাপ অনুসরণ করে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। সেজন্য এ প্রক্রিয়ার প্রত্যেক ধাপের কার্যক্রম আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ দলের কাছে ন্যস্ত করা প্রয়োজন, যেন তারা প্রত্যেক ধাপের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, বিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে পারে এবং তারা তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ধাপের কার্যক্রমের জন্য সুপারিশগুলো বের করে আনতে পারে। সর্বশেষ সব ধাপের সুপারিশগুলো সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় সাধনের ব্যবস্থা করতে পারে। এ সমন্বয় সাধন প্রচেষ্টা সফল হবে, যদি সমন্বয় সাধন কার্যে নিয়োজিত হয় প্রত্যেক ধাপ থেকে বাছাইকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কেন্দ্রীয় কমিটি। এ প্রক্রিয়া অনুসরণে অগ্রসর হলে অভীষ্ট সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক ও ভূতপূর্ব পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভূতপূর্ব অধ্যাপক, সুলতান ইদ্রিস শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া ও ভূতপূর্ব গবেষণা ফেলো, জাপান রাষ্ট্রভাষা ইনস্টিটিউট

আরও