প্রেসিডেন্সি ও প্যারোল—দুটিই রাজনীতির নির্মিত বাস্তবতা। মাঝ আগস্ট পেরিয়ে বাংলাদেশের আপাত স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিসরে এ দুই শব্দ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। অথচ তাদের অর্থ ও অভিমুখ সম্পূর্ণ বিপরীত।
একটির অভিমুখ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসন বঙ্গভবনের দিকে, অন্যটির গন্তব্য কারাগারের অন্ধকার থেকে সাময়িক মুক্তির প্রান্তে। একটি ক্ষমতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতীক; অন্যটি সীমাবদ্ধতা, শাস্তি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাময়িক অবকাশ। কিন্তু দুটির পেছনেই রয়েছে রাজনীতির উত্থান-পতন, পরিহাস ও অনিবার্য পরিণতি।
রাজনীতি কখনো কখনো এমন নির্মম রসিকতা করে, যার সামনে ব্যঙ্গও ম্লান হয়ে যায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি যেন তেমনই এক দৃশ্যপট মেলে ধরেছে। একদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনের প্রেসিডেন্সিতে। অন্যদিকে দীপু মনি—একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা রাজনীতিক—আজ কারাগারে, সেখান থেকে স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নিতে মাত্র ১২ ঘণ্টার প্যারোল। আহা, মৃত্যুর বিনিময়ে পাওয়া সেই মহার্ঘ্য ১২ ঘণ্টা!
নির্বাচিত হওয়ার পর একজনের সামনে বঙ্গভবনের দরজা, স্বজনের দাফন শেষে অন্যজনের সামনে কারাগারের দরজা। অথচ দুজনের পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অভিন্ন শব্দ—রাজনীতি। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রেসিডেন্সি থেকে প্যারোলের দূরত্ব কত দূর? কিলোমিটারে এ দূরত্ব মাপা যায় না। এটি আসলে ক্ষমতার দূরত্ব।
কিছুদিন আগেও কারাগার ছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির বহু নেতার রাজনৈতিক বাস্তবতা। মামলা, গ্রেফতার, হাজিরা, কারাবাস—বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে এসব শব্দ প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আজ দৃশ্যপট বদলেছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে, আর আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী কারাগারে। ইতিহাস যেন চরিত্র বদলে একই নাটক আবার মঞ্চস্থ করছে। শুধু অভিনেতারা বদলে গেছেন। এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলায় না।
আমরা বিরোধী দলে থাকলে গণতন্ত্র চাই, ক্ষমতায় গেলে স্থিতিশীলতা চাই। বিরোধী দলে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলি, ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের ‘দায়িত্বশীলতা’র কথা মনে পড়ে। বিরোধী দলে থাকলে রাজনৈতিক মামলা অন্যায়, ক্ষমতায় গেলে সেটিই হয়ে যায় আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার চেয়ে বড় কোনো রোগ সম্ভবত আর নেই।
ভারতের সংবিধান প্রণেতা বিআর আম্বেদকর রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তার মতে, অন্ধ আনুগত্য গণতন্ত্রকে শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের রাজনীতিতে ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য এত প্রবল যে দল কখনো কখনো রাষ্ট্রের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। ফলে রাষ্ট্র আর সবার থাকে না। রাষ্ট্র হয়ে যায় বিজয়ী পক্ষের সম্পদ।
গতকাল যে পুলিশ বিরোধী নেতার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে, আজ সেই পুলিশই হয়তো তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত। গতকাল যে নেতা আদালতের বারান্দায় জামিনের অনিশ্চিত অপেক্ষায় ছিলেন, আজ তার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রটোকল। গতকাল যে দল কারাবন্দিদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে ছিল, আজ তারাই যদি অন্য দলের বন্দিদের মানবিক অধিকারের প্রশ্নে নীরব থাকে—তবে বলতে হবে, ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনীতির পরিবর্তন হয়নি। এখানেই মির্জা ফখরুল ও দীপু মনির ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় আয়না।
দীপু মনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিক—এটি তার রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু কারাগারের বাইরে তারও স্বজন আছে, পরিবার আছে, ব্যক্তিগত শোক আছে। স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নেয়ার জন্য তার প্যারোল পাওয়া মানবিকতার একটি স্বাভাবিক প্রকাশ হওয়া উচিত; রাজনৈতিক অনুগ্রহের বিষয় নয়।
একইভাবে মির্জা ফখরুল বিএনপির রাজনীতিক—এটি তার রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পদে বসার পর তিনি আর কেবল একটি দলের প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। এখানেই রাজনীতির নৈতিক পরীক্ষা। ক্ষমতায় এসে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কী আচরণ করছি—সেটিই বলে দেয় আমরা সত্যিই বদলেছি, নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ারটি বদলেছি।
ভারতীয় চিন্তাবিদ আশিস নন্দী উপমহাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন। তার চিন্তার মর্মার্থ হলো—রাষ্ট্র যখন নাগরিককে সেবা করার বদলে নিয়ন্ত্রণের বস্তুতে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করেও গণতান্ত্রিক থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আজ তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বিএনপি যদি সত্যিই অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, তবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হওয়া উচিত প্রতিশোধ না নেয়া।
কারণ আওয়ামী লীগও একদিন ক্ষমতায় ছিল। আজ বিএনপি। কাল কে থাকবে, কেউ জানে না। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। বঙ্গভবনের চেয়ারও নয়, কারাগারের দরজাও নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ স্থায়ী হওয়া উচিত।
আজ যে দল কারাগারের কষ্ট বুঝছে, তারই উচিত অন্যের কারাবাসের মানবিক যন্ত্রণা বোঝা। আজ যে নেতা প্রেসিডেন্সিতে উঠছেন, তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু পদে আরোহণ নয়; বরং রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয় বিজয়ের প্রতীক না বানিয়ে সবার রাষ্ট্রের প্রতীক করে তোলা। নইলে ইতিহাস আবারো একই প্রশ্ন করবে—প্রেসিডেন্সি থেকে প্যারোলের দূরত্ব কত দূর?
উত্তর হবে বঙ্গভবন থেকে কারাগার পর্যন্ত নয়; ক্ষমতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। সে দূরত্ব যতদিন রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা দিয়ে নির্ধারিত হবে, ততদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার বদলাবে, পতাকা বদলাবে, নেতা বদলাবে; শুধু বদলাবে না সেই পুরনো নির্মম গল্প।
গতকালের বন্দি আজ ক্ষমতায়, আজকের বন্দি হয়তো কাল ক্ষমতায় আসবেন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস সম্ভবত এটাই—ক্ষমতা মানুষকে স্থায়ী ঠিকানা দেয় না; শুধু সাময়িকভাবে ঠিকানার নাম বদলে দেয়। বঙ্গভবনও সাময়িক, কারাগারও সাময়িক। স্থায়ী হওয়া উচিত শুধু রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ।
সে ন্যায়বোধই যদি না থাকে, তবে প্রেসিডেন্সি আর প্যারোল—দুটিই একই রাজনৈতিক নাটকের দুই মঞ্চমাত্র; একটিতে লাল কার্পেট, অন্যটিতে লোহার গরাদ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে সে একই রাজনীতি, যে রাজনীতি ক্ষমতায় থাকলে ইতিহাস লেখে, ক্ষমতা হারালে ইতিহাসের শিকার হয়, কিন্তু খুব কমই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট