আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত

সর্বস্তরে নারীর নিরাপত্তা ও সমতা নিশ্চিত করা হোক

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নারী দিবস গতকাল পালিত হয়েছে। রমজানের কারণে অন্যান্য বছরের মতো আড়ম্বর না থাকলেও এ বছর দিবসটি উদযাপনের গুরুত্ব কিছু কম নয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নারী দিবস গতকাল পালিত হয়েছে। রমজানের কারণে অন্যান্য বছরের মতো আড়ম্বর না থাকলেও এ বছর দিবসটি উদযাপনের গুরুত্ব কিছু কম নয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘের এবারের প্রতিপাদ্য ‘‌অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন/নারী ও কন্যার উন্নয়ন’। একদিকে সরকার জাতিসংঘের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে অনেকাংশে সরকারেরই জোরদার ভূমিকার অনুপস্থিতি শহরে-গ্রামে নারীর বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ বিভিন্ন প্রকার সহিংসতা চলছে, তখন নারী দিবস চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। এ ধরনের তথ্য আমাদের জানান দেয় সংবিধানস্বীকৃত নারীর অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। সাম্প্রতিক কিছু শিশু ও নারী নিপীড়নের ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, নিজ পরিবারে নারী ও কন্যাশিশু নিরাপদ নয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। লিঙ্গসাম্য একদিকে যেমন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করে, তেমনি পৃথিবীর অনেক খুঁটিনাটি সমস্যারও সমাধান করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের এ মৌলিক অধিকারই সুনিশ্চিত নয়। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান হারানো, আয় কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে জীবনযাত্রার মানে যে অবনতি ঘটেছে, তার বিরূপ প্রভাব নারীদের ওপরই বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারী ও মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। এদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো উদ্যোগ দরকার।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ বা পরবর্তী সময়ে যত আন্দোলন হয়েছে নারীরা সেখানে একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এবার জুলাই অভ্যুত্থানেও নারীরা ভূমিকা পালন করছেন। এ আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীরা খুব সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারীসমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন হলেও লিঙ্গসমতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এ চিত্র শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র দৃশ্যমান। অথচ দেশ কিংবা সমাজের উন্নয়ন নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবদান ও অংশগ্রহণের ওপর। অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর (নারী) অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে সত্য; কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। শুধু তা-ই নয়, নারী নির্যাতন ও বঞ্চনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। দেশের নারীসমাজ এখনো নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার। শিল্প ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের বঞ্চনা আলোচিত ঘটনা। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। আবার জাতীয় জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, গত ৪৭ বছরে কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতকের ঘর থেকে কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি নারী অর্থাৎ ৬০-৮০ শতাংশ নারী কর্মরত আছেন পোশাক শিল্পে। আবার এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভাগ এবং সংস্থায় নারী কর্মীর সংখ্যা ২০ শতাংশেরও নিচে।

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল প্রক্রিয়ায় বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে দারিদ্র্যের বোঝা বহন করতে, ঘরে দিতে হচ্ছে বিনামূল্যে শ্রম, উৎপাদিত পণ্যের দাম পান কম, কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা অনিশ্চিত নাগরিক কাজের ক্ষেত্রও সংকুচিত। ভূমি ব্যবহার ও মূলধন প্রাপ্তিতে তাদের প্রবেশাধিকার নেই, উৎপাদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণক্ষমতায়ও তাদের প্রবেশাধিকার নেই। বর্তমানে উন্নয়নে নারীর সস্তা শ্রমকে শোষণ করা হয়—তেমন ব্যবস্থাকে জোরদার না করে উচিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা, যা শ্রেণী ও লিঙ্গবৈষম্যের জন্ম দেয়। নারীর সমমর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন নারীর পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, নিরাপদ ও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও একই বিষয় প্রযোজ্য।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে শ্রম খাতের সর্বত্রই নারীর সমান ভূমিকা থাকা জরুরি। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে না। দেশের অন্যতম আর্থ-উন্নয়নবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর এ অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশে। ধারণা করা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ সমানুপাতিক হারে বজায় থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারকে দেশের নারীসমাজের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। সরকারকে নারী শিক্ষার বিস্তার ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মক্ষেত্রে অবাধ প্রবেশ ও নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই এর ৫ এবং ১০ অভীষ্ট অর্জনে সাফল্য দেখাতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও এর প্রতিফলন আছে। স্বাধানীতারও মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করা। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছরে কি আমরা বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করতে পেরেছি? সিডও সনদের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলেও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প নেই। জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটের মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্য হ্রাস ও সুযোগের সমতা সৃষ্টি করতে হবে। জেন্ডার বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লিঙ্গসমতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য ও টিকাদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। নারীর আর্থসামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়। এজন্য দরকার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

ব্যক্তির মর্যাদা, সমান সুযোগ, অনেক বিকল্প থেকে বেছে নেয়ার সুবিধা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যূনতম নিরাপত্তা—এগুলো ব্যক্তি ও সমাজের বিকাশের জন্য, একটি উন্নত রাষ্ট্রের জন্য, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন এবং নারী এ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিপূর্ণ বিকাশ। নারী ও পুরুষ উভয়ই হবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। হতাশার বেড়াজাল ছিঁড়ে অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তা অতিক্রম করে সব মানুষের সক্ষমতা বিকাশই হচ্ছে উন্নয়ন ও নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। ধর্ষণসহ নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও সমতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী দিবস পালনের যথাযথ উদ্দেশ্য তখনই বাস্তবায়ন হবে।

আরও