৬ জানুয়ারি, মার্কিন ক্যাপিটল হিল ভবনে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন আলোচনা করছেন, যা করাটা সঠিক ও ন্যায়সংগত। রাজনীতিবিদরা রীতিমতো আইন ও নৈতিক জবাবদিহির বিষয়গুলো নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ভয়াবহ ওই ঘটনাগুলো কিন্তু আধুনিক সমাজের সংকটপূর্ণ দ্বন্দ্বকে স্পর্শ করে; বিশেষ করে গণতন্ত্র ধ্বংসের উপকরণ হিসেবে ইন্টারনেটের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দেয়।
এমনটা যদিও ঘটার কথা ছিল না। একটি শক্তিশালী নতুন গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে ইন্টারনেটের উন্মুক্ত প্রক্রিয়াটি উদারবাদী সাইবার ভবিষ্যিবদদের (সাইবার-লিবার্টারিয়ান ফিউচারিস্ট) কর্তৃক অনেক আগে থেকেই প্রশংসিত হয়ে আসছে। তথ্যগুলো নিখরচায় সহজে তাত্ক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। তাছাড়া এখন কিন্তু মাত্র একটি ক্লিকেই ভোট পর্যন্ত প্রদান করা যাচ্ছে।
যা-ই হোক, ১৯৯০ সালে মার্কিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেটের বিস্তার যেখানে মাত্র ১ শতাংশ ছিল, ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৭ শতাংশ হয়। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বিস্তার বেড়েছে শূন্য থেকে ৫১ শতাংশ। তবে বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমেরিকা এখন ক্ষমতায়নের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বিব্রত হওয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সমস্যাটি অবশ্যই ইন্টারনেট পরিচালনার মধ্যে নিহিত, বিশেষ করে নীতির অনুপস্থিতির বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেমন ডিজিটাল বিশ্বের সুবিধাগুলো নিয়ে উচ্চপ্রশংসা করেছি, এমনকি কভিড মহামারীর সময়ে ডিজিটালাইজেশনের বাড়াবাড়িগুলো নিয়ে কিছুই বলছি না, ফলে ডিজিটালাইজেশনের অন্ধকার দিকগুলোকে উপেক্ষা করাটা সম্ভব হচ্ছে। পশ্চিমা ওপেন-এন্ডেড কানেক্টিভিটি মডেল মাদকদ্রব্য, পেডোফিলিয়া (এক ধরনের মানসিক ব্যাধি) ও পর্নোগ্রাফির অবৈধ ব্যবসার প্লাটফর্মগুলোর উত্থানকে উৎসাহিত করেছে। রাজনৈতিক উগ্রবাদ, সামাজিক মেরুকরণের পাশাপাশি ইন্টারনেট এখন বিদ্রোহেরও ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাই বলা যায়, সাইবার-উদারতাবাদের গুণাবলিগুলো ক্রমে এর ব্যাধিগুলোরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
চীনের মডেল এক্ষেত্রে আমাদের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী অবস্থার কথা বলে। ইন্টারনেট ব্যবহারে তাদের সেন্সরশিপ পদ্ধতি মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার জন্য রীতিমতো অভিশাপস্বরূপ। তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা (কিংবা কমিউনিস্ট পার্টি) জনগণের অংশগ্রহণকে শুধু সীমাবদ্ধই করে না, বরং গোপনীয়তার ওপরে নজরদারি করার পক্ষপাতীও। চীনের ক্ষেত্রে সুশাসন হচ্ছে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। গণতন্ত্রের সঘোষিত দুর্গ হিসেবে আমেরিকা কিন্তু বিষয়গুলোকে এভাবে বিবেচনা করে না। এখানে যেকোনো ধরনের সেন্সরশিপকে অনেকটা বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাছাড়া বিষয়গুলোকে হালকা করার জন্য সমালোচনা করাটাও একটি উত্তম উপায়, বিশেষ করে ক্যাপিটল হিলে ভয়ানক হামলার বিপরীতে আমেরিকানদের প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে যদি আমি তা ব্যাখ্যা করতে যাই।
ইন্টারনেট সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতিকে সক্রিয় করে। প্রথম উদাহরণ হিসেবে ২০০৯ সালে ইরানের গ্রিন মুভমেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের আরব বসন্ত আজও আমেরিকানদের আলোড়িত করে।
তবে অবশ্যই এখানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে; গণতন্ত্রের জন্য আকুল ইরান ও আরবের প্রতিবাদী নাগরিকরা বহির্বিশ্বের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমেরিকায় গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানার ঘটনাটি ঘটেছে খোদ প্রেসিডেন্টের উসকানিতে। এ ধরনের উগ্রতার উত্থান আমেরিকার স্থিতিশীলতা ও ইন্টারনেট পরিচালনার ব্যর্থতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে বৈকি।
টুইটার, ফেসবুক থেকে শুরু করে অ্যাপল ও গুগলের মতো আমেরিকার ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো এ বিষয়কে তাদের নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। সহিংসতার মদতদাতা হিসেবে তারা ট্রাম্পের টুইটার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এই একতরফা প্রতিক্রিয়াগুলো সামান্যই সুশাসনের বিকল্প হতে পারে। এটা বোধগম্য বিষয় যে করপোরেট নেতাদের কাছে গণতন্ত্র রক্ষার মৌলিক দায়িত্ব অর্পণ করার বিষয়ে বড় ধরনের সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল এই একটি ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেছে তা কিন্তু নয়। শোশান্না জুবফ তার নন-ফিকশন বই ‘দি এজ অব সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম’-এ দেখিয়েছেন যে গুগল, অ্যামাজন ও ফেসবুকের ব্যবসায়িক মডেলগুলো মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলো কাজে লাগিয়ে অর্থ তৈরির ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যা সাইবার উদারনীতিবাদ ও চীনপন্থী নজরদারির পার্থক্যকে দুর্বোধ্য করে এবং ব্যক্তিগত বিষয়গুলো জোরালো করে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানার অগ্রাধিকার।
এদিকে কভিড-১৯ সংকট নজরদারি ও গোপনীয়তার বিষয়ে আরো এক ধরনের দৃষ্টিকোণ সরবরাহ করে। বিতর্কের সুযোগ জোরালো করে চীন কিংবা আমেরিকা—দুই পক্ষ নিয়েই। বিশেষ করে মহামারী শুরুর সূচনালগ্নে চীনের প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে সম্প্রতি হেবেই প্রদেশের ঘটনা—লকডাউনের কড়াকড়ি, বাধ্যতামূলক কভিড পরীক্ষা, মাস্ক ব্যবহার করা এবং কিউআর-কোড অ্যাপনির্ভর কন্ট্রাক্ট ট্রেসিংয়ের বিষয়গুলোর কথা যদি আমরা বলি। আমেরিকায় এগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। অনেকেই যা স্বাধীন ও মুক্ত সমাজের অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন বলে মনে করেন।
এক পর্যায়ে চীনের ফলাফলগুলো তাদের পক্ষে কথা বলে। উহানের প্রাথমিক সংক্রমণের পর নতুন করে সেখানে সামান্যই প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। দুর্ভাগ্যবশত আমেরিকায় কভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গও আঘাত হানলেও আজও তারা নিজেদের যুক্তিতেই অনড় রয়েছে।
এমনকি পিউ রিসার্চ সার্ভের নতুন তথ্যানুসারে, আমেরিকার জনগোষ্ঠীর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এখনো মোবাইল কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোয় অনুৎসাহী। পাশাপাশি তাদের অনেকেই আবার ভ্যাকসিনবিরোধী। তাছাড়া এটি বিশ্বাসের যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা মূল বিষয়গুলো রক্ষার অজুহাতে কভিড-১৯-এর বিপদকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে।
আমরা স্বীকার করি বা না করি, আমেরিকান তথাকথিত গণতন্ত্রের মৌলবাদী ব্যাখ্যা এর আগে কখনই এতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। মহামারী ও ৬ জানুয়ারির বিদ্রোহের সঙ্গে একটি গুরুতর বিষয় জড়িত: আর তা হচ্ছে মুক্ত সমাজের সম্ভাব্য বিপর্যয়। তবে বিষয়টি এমন নয় যে চীনের বিষয়টি ন্যায্য বা তারা যা করছে তা সঠিক। কিন্তু আমরা যা করছি, তাও তো সঠিক হচ্ছে না। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানের চূড়ান্ত মেরুকরণের ফলে পা রাখার মতো মাঝারি পর্যায়ের তল খুঁজে পাওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার শেষ ভাষণে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র সম্পর্কে আমরা যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যাই, তখনই তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।’ আমেরিকা বর্তমানে যা করছে, তা কি ওবামার এ কথার পুনরুক্তি নয়? বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, কভিড-১৯ মহামারী, বর্ণবিরোধ, বৈষম্য এবং নতুন করে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক সংকটের দ্বিধাবিভক্ত বিশ্বে গণতান্ত্রিক আদর্শগুলোকে আমরা কেবল মৌখিক বিষয় হিসেবে আউড়ে যাচ্ছি।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নিজেদের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধির সময়গুলোতেই আমেরিকানরা এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে আক্রান্ত হয়েছিল। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ সক্ষমতার ক্রমবর্ধমান প্রসার ট্রাম্পের মেরুকৃত কথাবার্তাগুলোকে সবার মাঝে অনেক বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে ঘটে গেছে ৬ জানুয়ারির বেদনাদায়ক ঘটনাটি। তাই বলা যায়, গণতন্ত্রের নেতৃত্ব গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
স্টিফেন এস রোচ: ইয়েল ইউনিভার্সিটির অনুষদ সদস্য, মরগান স্ট্যানলি এশিয়ার সাবেক সভাপতি
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস