কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন এনেছে। সদস্যদের সবাই সম্মত হয়েছে পোস্ট-প্যানডেমিক প্রণোদনা প্যাকেজ হিসেবে সরাসরি ইইউর বাজেট থেকে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউরোর (২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার) অনুমোদন দিতে।
সুনির্দিষ্টভাবেই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্ধেকের বেশি অর্থ, যা ইইউর দীর্ঘমেয়াদি বাজেটের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মধ্যে ৭৫০ বিলিয়ন ইউরো ইইউর পরবর্তী প্রজন্মের পুনরুদ্ধার তহবিলের অন্তর্ভুক্ত জনকল্যাণে ব্যয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি সাহসী ও চিত্তাকর্ষক। কেননা এখানে ‘হরাইজন ইউরোপীয় প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য সমর্থন থাকবে এবং জাস্ট ট্রান্সজিশন ফান্ড ও ডিজিটাল ইউরোপ প্রোগ্রামের আওতায় যথাক্রমে জলবায়ু ও ডিজিটাল রূপান্তরকে সমর্থন করা হবে। এ প্যাকেজের আওতায় থাকছে ‘ইইউফরহেলথ’ নামে নতুন একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি। পরবর্তী প্রজন্মের ইইউ তহবিলগুলোর বণ্টন সুবিধার্থে এটিকে একটি স্থিতিস্থাপক ও পুনরুদ্ধার সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এছাড়া শ্রমিক ও বেকারদের সহায়তার লক্ষ্যে সামজিক সুরক্ষা বাবদ মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ করা হবে।
এ-জাতীয় নীতির পরিবর্তনকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত। কারণ এটি আরো কার্যকর অর্থনৈতিক ইউনিয়নের ভিত্তি স্থাপন করে। তবে মৌলিক অর্থে ইউরোপের নেতারা অনেকটাই তাদের মার্কিন সহযোগীদের মতো। কারণ এখনো তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধিতে অক্ষম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নতুন প্রশাসনের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ যেমন মূলত মার্কিন অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয়, তেমনি ইইউ প্যাকেজটিও নেহাত ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংহতি প্রকাশ করে। তাই তাদের এ ধরনের আচরণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর প্রতি খানিকটা উদ্বেগ ছড়িয়ে দেয়।
তাছাড়া এটা নিশ্চিত যে ইইউর বৃহত্তর উদ্দীপনা প্যাকেজটি আর্থিক সংহতির পক্ষে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করে। এটি ছাড়া ইইউর মুদ্রাগত সংহতি (মনিটারি ইউনিয়ন) অনিবার্যভাবে ভঙ্গুর, অস্থির ও সংকটপ্রবণ হয়ে উঠবে। ২০১০ সালে গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালি যখন ঋণ সংকটের মুখোমুখি হয়, সে সময়ও এ ধরনের রাজস্ব সংহতি জরুরি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু জার্মানিসহ অন্য ধনী রাষ্ট্রগুলো এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। স্বতন্ত্র ইউরোপীয় সরকারগুলো কিন্তু এখন মহামারীর বিপরীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ খরচ করছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, যা হঠাৎ করেই সদস্য দেশগুলোর কাছে ঋণ নেয়ার বিষয়ে একটি সৌম্য দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তাই যৌথ ঋণ গ্রহণ ও আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো ইইউর ঐতিহাসিক ট্যাবু কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে মনে হয়।
তাহলে প্রশ্ন তৈরি হয়, ইউরোপের কী বদলেছে? প্রথম ও প্রধান বিষয় হচ্ছে, কভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা নীতিনির্ধারকদের জরুরি সাধারণ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ দুই অর্থনীতি ফ্রান্স ও ইতালির অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রার যদি বিবেচনা করা হয়। কভিড সংকট তাদের আঞ্চলিক সংহতিকে একটি আকার দিতে এবং তা প্রকাশে বাধ্য করেছে। অথচ একটা সময় কিন্তু যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, এ ধরনের সংহতি প্রকাশের বিষয়টি অনেকটা অসম্ভব বলেই মনে হয়েছে। তাছাড়া ব্রেক্সিট এখানে সম্ভবত কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে, কেননা ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাজ্য ইইউর রাজস্ব সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিল।
তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, ইইউর অবাধ্য সদস্যদের থেকে এ-জাতীয় প্রণোদনা প্যাকেজের চুক্তিতে আসার বিষয়টি নিঃসন্দেহে দারুণ একটি অর্জন। তবে বৃহত্তর ঐক্য ইইউর প্রত্যয়কে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে যে সম্মিলিতভাবে তারা সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেতে সমর্থ। নিজস্ব নিয়মানুসারে ইইউর চিন্তাভাবনাটা অনেকটাই এ ধরনের— বাকি বিশ্বে কী ঘটছে তা তারা এড়িয়ে যেতে পারে বা সেসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা মোটেও তাদের কাজ নয়।
বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই কভিড-১৯ নীতি প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে পুরোপুরি অসম আলোকপাত। উন্নত অর্থনীতিগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে উদারভাবে ঘোষিত বড় অংকের আর্থিক প্যাকেজের প্রবর্তন করে। বিপরীতে বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশকে এ-জাতীয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় সক্ষম হওয়া থেকে তারা বঞ্চিত করে। এ-জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি অদূরদর্শী ও অপ্রত্যাশিত। আমরা যদি বৈশ্বিকভাবে চিহ্নিত না করি তাহলে মহামারীর তাত্ক্ষণিক ও চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের স্থবিরতাবিষয়ক সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
সেক্ষেত্রে ইইউ (এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) আলাদাভাবে কী করতে পারে? প্রথমত, দরিদ্র দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় ঋণের বোঝা কমাতে তারা তাদের বৃহত্তর উদ্দীপনা প্যাকেজ থেকে সামান্য অংশকে আলাদা করতে পারে। একইভাবে সক্রিয় হতে পারে ব্যক্তিগত ঋণদাতাদের জন্য সার্বভৌম ঋণ নিষ্পত্তিতে। আরো বিস্তৃতভাবে বললে, তাদের অবশ্যই অনুদান হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা বা উপহারের কথা ভুলে গিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে বৈশ্বিক সরকারি বিনিয়োগের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা উচিত হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্তৃক নতুন করে বিশাল পরিমাণ এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস) বরাদ্দের মাধ্যমে উন্নয়নশীল অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রার সম্প্রসারণে কাজ করতে পারে।
সর্বোপরি, ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যূথবদ্ধ হয়ে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ভয়াবহ অসম বণ্টন ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পারে, যা কিনা ইউনিয়নের একগুঁয়ে আচরণের যোগফল। তাছাড়া ইউরোপের মিডিয়াগুলো খুব কমই বিষয়টির উল্লেখ করছে। কেননা ইইউ মূলত কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাক্সেক ফ্যাসিলিটি (কোভ্যাক্স) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যাপী টিকার ন্যায্য বিতরণ ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সরাসরি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভ্যাকসিন ক্রয় করতে। এভাবে তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্যাকসিনের সরবরাহের বিষয়টিকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল।
সবচেয়ে জঘন্য বিষয়টি হচ্ছে, জনগবেষণা এবং সরকারি ভর্তুকির সাহায্যে ওষুধ সংস্থার তৈরি ভ্যাকসিনের পেটেন্ট সংরক্ষণের প্রতি জোর দিয়ে ইইউ টিকার উৎপাদন রোধ করছে, যা পুরো বিশ্বকে দ্রুত রোগমুক্ত থেকে বিরত করে। তাই ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো, যারা ভ্যাকসিন উৎপাদনে সক্ষম হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে পেটেন্ট প্রথা বাতিল কিংবা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স বরাদ্দের মাধ্যমে উৎপাদনের অনুমতি দেয়াটাই বরং ইতিবাচক। এভাবে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক সরবরাহ যেমন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব, তেমনি করোনাভাইরাসের বিপজ্জনক মিউটেশনের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। আর এভাবে মহামারীটি থেকে খুব দ্রুত আমাদের মুক্তি মিলতে পারে।
পরিশেষে বলব, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কভিড-১৯ সংকট থেকে ইইউ খুব দ্রুত বেরিয়ে আসতে সক্ষম—খুব শিগগিরই এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে। কেননা ইউরোপের মতো ধনী অঞ্চলের ক্ষেত্রেও মহামারী-পরবর্তী একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সংহতির প্রয়োজন পড়বে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জয়তী ঘোষ: ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি, ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস