বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ তিনটি—জ্ঞান সৃজন, আহরণ ও বিতরণ বা বিস্তার করা। তবে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, কৃতিত্ব ও খ্যাতি নির্ভর করে প্রধানত তার জ্ঞান সৃজন বা গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে যতগুলো বিষয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গবেষণা ও উদ্ভাবন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশি ভালো করতে পারে না, কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোয় গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ-সুবিধা যেমন অপ্রতুল, তেমনি দেশে দক্ষ গবেষক ধরে রাখার মতো প্রণোদনা এখানে নেই বললেই চলে।
মোটাদাগে বলতে গেলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং গবেষণায় যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ি। যেকোনো গবেষণা পরিচালনা করতে যেমন অর্থ লাগে, তেমনি আন্তর্জাতিক জার্নালে সে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতেও অর্থ লাগে। আমাদের শিক্ষকরা এতকাল নিজের পকেটের টাকায় বা বৈদেশিক অনুদানে গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশ করে এসেছেন। এটা খুবই অপ্রতুল। ফলে আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো জায়গা করে নিতে পারেনি।
কয়েক বছর ধরে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন বা ইউজিসির মাধ্যমে সরকার পাবিলক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বল্প পরিসরে হলেও গবেষণা খাতে তহবিল বরাদ্দ দিতে শুরু করেছে। ফলে দেশের বেশ কয়েকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বেশি থাকাতে, তারাও গবেষণা ও উদ্ভাবনে যথেষ্ট অবদান রাখছে এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থায় যেতে শুরু করেছে।
কিন্তু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে সেটা কতটা ধরে রাখা যাবে বা কতটা বেগবান করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে ইউজিসির একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। এতদিন ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রথাগতভাবে তার অন্যান্য সব খাতের বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে গবেষণা প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন করত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন তার নিজস্ব গবেষণা নীতিমালা, গবেষণা প্রকল্পের মেরিট, গবেষকের সক্ষমতা এবং গবেষণা প্রকল্পের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে গবেষণা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিত।
ফলে গবেষণা তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাবের মেরিটের আলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গবেষকদের যোগ্যতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী তহবিল বণ্টনের সুযোগ পেত। গবেষণা যেহেতু আর দশটা কেনাকাটার মতো তাৎক্ষণিক ফলপ্রদায়ী নয়, সেহেতু অনেকের ধারণা, অনিয়মের মাধ্যমে এ অর্থের অপব্যয় ঘটে। বাংলাদেশের আর দশটা খাতের মতো এখানেও কিছু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটা অস্বাভাবিক নয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বাজেট একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বরাদ্দ ও ব্যয় করা হয়। যেমন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিকট থেকে প্রথমে লিখিত গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। এরপর গবেষণা প্রস্তাবকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ডিন ও জ্যেষ্ঠ গবেষকদের সামনে গবেষণা প্রকল্পের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করে প্রকল্পের মেরিট এবং গবেষকের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়। তারপর গবেষণা প্রকল্পের মেরিট, গবেষকের গবেষণা পরিচালনার অভিজ্ঞতা, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃরিভিউয়ার কর্তৃক প্রদত্ত প্রকল্প প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গবেষণা তহবিল বরাদ্দ করা হয়। গবেষণা সমাপনান্তে আর্থিক সমন্বয় ও বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন পেশ করতে হয়।
কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ না দিয়ে ইউজিসি সরাসরি গবেষণা খাতের বরাদ্দ পরিচালনা করবে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে, সময়মতো গবেষণা বাজেট গবেষকদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার গতি ব্যাহত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে যথেষ্ট দক্ষ লোকবল ইউজিসির নেই তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইউজিসি হয়তো সারা দেশের দক্ষ গবেষকদের এ কাজে নিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেন্দ্রীভূত হয়ে কাজটি যত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করা যেত, সেটা কি শুধু এক কেন্দ্রে করা যাবে
এখন প্রশ্ন হলো, ইউজিসি একাই যদি সরাসরি দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষকের গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে উপযুক্ত গবেষণা প্রস্তাবে অনুদান মঞ্জুর করে, তাহলে সমস্যা কোথায়? এটা কি যথেষ্ট বাস্তবসম্মত বা গবেষণাবান্ধব হবে?
প্রতি বছর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে ইউজিসি যে গবেষণা বাজেট পাঠায় তাতে অনেক দেরি হয়।ইউজিসি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে গবেষকদের নিকট গবেষণা তহবিলের বরাদ্দ আসতে আসতে অর্থবছরের প্রায় অর্ধেক পার হয়ে যায়। আবার ৩০ জুনের মধ্যে ব্যয়ের সমন্বয় দাখিল করতে হয়। ফলে এক বছরের গবেষণা কর্ম ছয় মাসে সম্পন্ন করতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করতে হয়। এতে গবেষণার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণা মোটেই তাড়াহুড়োর বিষয় নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একমাত্র কাজ শুধু গবেষণা করা নয়। ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের গবেষণা করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্ভাবনাময় ও উপযুক্ত গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব নির্বাচন এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, সক্ষম ও দক্ষ গবেষক বাছাই করতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটা একটা দীর্ঘ ও জটিল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু ইউজিসি পাবলিক-প্রাইভেট মিলিয়ে ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষকের গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব কীভাবে আরো দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করবে বিষয়টা বোঝা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন আর পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন এক কথা নয়। নতুন নতুন ধারণা নিয়ে প্রস্তুত গবেষণা প্রস্তাব বিশেষজ্ঞ ছাড়া সঠিক যাচাই-বাছাই সম্ভব নয়।
১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে যথেষ্ট দক্ষ লোকবল ইউজিসির নেই তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইউজিসি হয়তো সারা দেশের দক্ষ গবেষকদের এ কাজে নিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেন্দ্রীভূত হয়ে কাজটি যত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করা যেত, সেটা কি শুধু এক কেন্দ্রে করা যাবে?
গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব বাছাই ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউজিসির অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে? গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংক ও ইউজিসির সহায়তায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ২০২৩ সালে হায়ার এজুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্প শুরু করে ইউজিসি। ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান এ প্রকল্পের প্রায় তিন বছর পার হলেও অগ্রগতি নামমাত্র। প্রকল্পের বাকি কাজ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) শেষ করতে হবে ২০২৮ সালের মধ্যে। ৩০ এপ্রিলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, অর্ধেকের বেশি সময় পার হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ।
তাছাড়া হিট প্রকল্পের কার্যপদ্ধতি, প্রকল্প যাচাই-বাছাই, প্রকল্প মঞ্জুর, অগ্রগতি ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, শিক্ষামন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক শিক্ষক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ইউজিসি কর্তৃক প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তৎকালীন সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্তে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হস্তক্ষেপ বাড়বে বলেও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
একজন গবেষকের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, সততা ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা যত ভালো জানবেন, অন্য কারো পক্ষে কি তা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেই বিদ্যাটা কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবগত করা যেত না?
তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পে অনিয়ম ঘটে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কি সঠিক প্রকল্প নির্বাচন, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সম্পাদন নিশ্চয়নে দক্ষতার ঘাটতি আছে? থাকতেই পারে। তাহলে এ সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান আগে সন্ধান করা দরকার ছিল। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি নিয়মতান্ত্রিকতা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারে, তাহলে ইউজিসি সেটা করবে কীভাবে? তারা যদি সেটা করতে পারে, তাহলে সেই মন্ত্রটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিখিয়ে দেয়া যেত।
ইউজিসি আসলে কোন লক্ষ্যে, কী প্রক্রিয়ায় গবেষণা খাতের তহবিল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে তা এখনো স্পষ্ট করেনি। যদি ইউজিসির হাতে উৎকৃষ্ট গবেষণা পরিচালনা কৌশল থাকে, তাহলে সেটা দেশের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা যেত। তাহলে এ বিষয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হতো না।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে স্থান করে নেয়ার যে যাত্রা শুরু করেছে সেটা যেন থেমে না যায়। ইউজিসি যদি একটি উৎকৃষ্টতর, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও উপযুক্ত পন্থায় গবেষণা প্রকল্প নির্বাচন এবং বাস্তবায়ন করার কৌশল অবলম্বন করতে চায়, তাহলে তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আগেই খোলাসা করা উচিত।
ড. মো. মুনিবুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়