পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা নেই ৭০% কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে

দক্ষ ও শ্রমবাজার উপযোগী জনশক্তি গড়ার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে

বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় অপ্রতুল ইন্টারনেট সুবিধা এক গুরুতর অবকাঠামোগত সংকট। শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশের ৯ হাজার ৩১০ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশে পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে।

অর্থাৎ প্রায় ৬৯ দশমিক ১২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এ মৌলিক ডিজিটাল সুবিধা নেই। এটি দেশের শিক্ষা কাঠামোয় এক ধরনের অসমতা তৈরি করছে। কারণ সাধারণ শিক্ষায় ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে ৬৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে, মাদরাসার ক্ষেত্রে তা ৪৯ শতাংশ। অথচ শিল্পসংযুক্ত, ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কাঠামোতেই এ সুবিধা অপ্রতুল।

সমস্যা এখানেই থেমে নেই। যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে বলা হয়, সেখানেও সংযোগের মান ও স্থায়িত্বের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সরবরাহকৃত সরঞ্জাম অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক ব্যবহারের পরই নষ্ট হয়ে গেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অপ্রতুল। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগকে কার্যকর করতে বাধা সৃষ্টি করছে। কারিগরি শিক্ষায় ইন্টারনেট সংযোগ বাড়তি সুবিধা নয়, এটিই পাঠদানের মৌলিক মাধ্যম। এর মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কারিগরি মান ও প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্য আপডেট পেতেও ইন্টারনেট সুবিধা জরুরি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং বাস্তবসম্মত কর্মদক্ষতার ব্যবধান বহুলাংশে কমিয়ে আনে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি এ সুবিধাই অপর্যাপ্ত থাকে তাহলে এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ জনশক্তিকে শ্রম ও শিল্পবাজার উপযোগী করা ব্যর্থ হয়। কারণ তখন শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানটুকুই পান।

উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো এরই মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল সম্পদকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের ভার্চুয়াল টেকনোলজি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত কারখানায় কাজ শুরুর আগেই ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে দক্ষতা অর্জন করে। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন এবং স্কিলসফিউচার উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল সিমুলেশন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলছে। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিতে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ তরুণদের কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দেশে কারিগরি শিক্ষায় শুধু কম্পিউটার পরিচালনার প্রাথমিক কিছু প্রশিক্ষণই দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরঞ্জামের অভাবে শুধু তাত্ত্বিক পাঠ দেয়া হয়। ফলে কারিগরি শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে পড়ছে।

কারিগরি শিক্ষায় ইন্টারনেট সংযোগ আর ঐচ্ছিক সুবিধা নয়। অনলাইন সিমুলেশন এবং ভার্চুয়াল ল্যাব প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি ক্রয় ছাড়াই জটিল প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করতে পারে। এটি বাজেট সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই শিক্ষার মান উন্নত করার একটি ব্যবহারিক পথ। মানসম্মত টিউটোরিয়াল, গবেষণা প্রবন্ধ এবং শিল্প মানের প্রোটোকল অ্যাকসেস করা সম্ভব হয় যখন ডিজিটাল সংযোগ থাকে। এ অ্যাকসেস ছাড়া কারিগরি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে থাকে এবং শিল্পে প্রবেশের সময় প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সামর্থ্য নেই, সেখানে ডিজিটাল সিমুলেশন প্রযুক্তি একটি সুযোগ দেয়। শিল্প বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা পরিচালনা সম্ভব হয় ভার্চুয়াল পরিবেশে। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অপরিহার্য।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ শতাংশেই নেই ইন্টারনেট সুবিধা। সরকারের ডিজিটালাইজেশনের যে পরিকল্পনা, সেটির ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা বলে বিবেচনা করা জরুরি। মোট ৯ হাজার ৩১০টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮ হাজার ২০৯টি বেসরকারি অথচ ইন্টারনেট সুবিধার বৈতনিক অপর্যাপ্ততা প্রধানত এ খাতকে প্রভাবিত করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান ডিজিটাইজেশনের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে কিন্তু বেসরকারি খাত বৃহত্তর অংশে অবহেলিত রয়েছে। এ বৈষম্য শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নয়, বরং সেখানকার শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে।

দেশে কারিগরি শিক্ষাকে ব্যবহারিকভাবে শিল্পসংযুক্ত করতে হলে সব প্রতিষ্ঠানে ভালো মানের ইন্টারনেট সংযোগ সুবিধার জন্য আলাদা নীতিমালা করা জরুরি। ডিজিটাল সিমুলেশন এবং অনলাইন শেখার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি করা যায়। শিক্ষার্থীরা বর্তমান শিল্প অনুশীলন, মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে। এটি কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বাড়ায় এবং নিয়োগকর্তাদের প্রশিক্ষণ খরচ কমায়। সরকার কারিগরি শিক্ষাকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ২ হাজার ৪১৮ প্রতিষ্ঠানে নতুন ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রশংসনীয় উদ্যোগটির সময়মতো বাস্তবায়ন ও মানের নিশ্চয়তা নিশ্চিত এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সরবরাহকৃত সংযোগ এবং সরঞ্জাম অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার যেখানে নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছিল এবং তা দ্রুত নষ্ট হয়েছিল। সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরঞ্জাম স্থাপনের পরও রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সুবিধা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মীদের নিয়োগ এবং তাদের নিয়মিত আপডেট প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। এটি নিশ্চিত করতে হবে যাতে সরঞ্জাম দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে। এছাড়া সব প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার আগেই শিক্ষক এবং পরিচালকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যাতে তারা সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সুসংহত পাঠ্যক্রম সংস্কার যা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। প্রতিটি শিল্প শাখার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পাঠ্যক্রম আপডেট করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ আপডেটকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কারিগরি শিক্ষায় ইন্টারনেট সংযোগের ঘাটতি এখন আর একটি আঞ্চলিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক সামর্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা সঠিক দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ও মান উভয়ই নিশ্চিত করা।

আরও