২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন একটি বড় ধরনের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন আনে, যার অধীনে প্রথমে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। পরবর্তী সময় এ হার কমিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং শেষে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ৩৭ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সাফল্য। তবে এ নীতি যদি আরো সংশোধন না হয়, তাহলে বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ১৫ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলবে।
হোয়াইট হাউজের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর গড়ে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যার মধ্যে শুল্ক, কর এবং অন্যান্য বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত। পদক্ষেপটি ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ উদ্যোগের অংশ, যার লক্ষ্য মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। এ ঘাটতির প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক ও টেক্সটাইল রফতানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য ও যন্ত্রপাতি রফতানির মধ্যে বিশাল পার্থক্য।
এ বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলছে। আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব উঠে এসেছে—বাংলাদেশ যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয় করে, যার সম্ভাব্য মূল্য ৬-৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণে এ ক্রয় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের একটি সম্ভাব্য উপায়। তবে এত উচ্চমূল্য ক্রয়ের ওপর নির্ভর করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের জন্য টেকসই বা কৌশলগতভাবে সর্বোত্তম নাও হতে পারে। পরিবর্তে প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলা এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা যেতে পারে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে বাণিজ্য সম্প্রসারণ
বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত দ্রুত বিকাশমান, যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭-১০ শতাংশ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উদ্যোগ এবং তরুণ, প্রযুক্তি-দক্ষ জনশক্তির দ্বারা চালিত এ খাত বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র, প্রযুক্তি খাতে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে, বাংলাদেশে সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তা সমাধানের মতো ডিজিটাল পণ্য ও সেবার রফতানি বাড়াতে পারে। মাইক্রোসফট, গুগল, বা অ্যামাজনের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো সফটওয়্যার-এজ-এ-সার্ভিস, ক্লাউড অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তা সরঞ্জাম রফতানির জন্য উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ বিকাশ বা গ্রামীণফোনের মতো বাংলাদেশী কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মার্কিন ক্লাউড সমাধানের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা শুধু মার্কিন সেবা রফতানি বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রযুক্তি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একটি ১০০ মিলিয়ন ডলারের ক্লাউড সেবা চুক্তি ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে পারে। কারণ ডিজিটাল সেবা লজিস্টিক বা শুল্ক বাধার সম্মুখীন হয় না। এছাড়া মার্কিন ফার্মগুলো বাংলাদেশের আইটি হাবগুলোয় বিনিয়োগ করতে পারে, যা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উচ্চ-দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার ডিজিটাল পণ্যের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান বাজার প্রদান করবে।
একটি উদ্ভাবনী প্রস্তাব হলো মার্কিন-বাংলাদেশ টেক করিডোর প্রতিষ্ঠা। এ উদ্যোগে সিসকো বা আইবিএমের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয়কৃত সফটওয়্যার সমাধান তৈরি করবে। এ করিডোর মার্কিন সেবা রফতানি বাড়াবে এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। এ পদ্ধতির পারস্পরিক সুবিধা হলো মার্কিন প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের সাশ্রয়ী শ্রম এবং ক্রমবর্ধমান বাজারের সমন্বয়, যা একটি টেকসই অর্থনৈতিক সহযোগিতার মডেল তৈরি করবে।
ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে যৌথ উন্নয়ন ও বাণিজ্য ভারসাম্য
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এ সময়ে দেশটির ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র এ রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মশক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে মার্কিন সহযোগিতা বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে সাশ্রয়ী এবং উচ্চমানের ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
একটি মূল সহযোগিতার ক্ষেত্র হলো বায়োসিমিলার, ভ্যাকসিন এবং অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন। ফাইজার বা মার্কের মতো মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্টরা বাংলাদেশী কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করে এ উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করতে পারে। এ সহযোগিতা বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের গুণগত মান বাড়াবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, প্রতিযোগিতার জন্য উপযুক্ত হবে। এছাড়া এ অংশীদারত্ব মার্কিন উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং কাঁচামাল রফতানি বাড়াবে, যা সরাসরি বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে অবদান রাখবে।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে বায়োলজিকস ও হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা উৎপাদনে। এ ঘাটতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং একাডেমিক সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশী শিক্ষার্থী এবং পেশাদারদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করতে পারে। এ প্রোগ্রামগুলো বায়োফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা, গুণগত নিয়ন্ত্রণ এবং রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সের মতো ক্ষেত্রে ফোকাস করতে পারে। এছাড়া মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে, যা বাংলাদেশী শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়াবে এবং উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করবে।
যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) প্রকল্প আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশী কোম্পানির সঙ্গে নতুন জেনেরিক ওষুধ বা বায়োসিমিলার উৎপাদনে সহযোগিতা করতে পারে। পেটেন্ট পুল বা স্বেচ্ছাসেবী লাইসেন্সিং চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে নতুন ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতে সহায়তা করতে পারে। এটি বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে উদ্ভাবনমুখী করবে এবং মার্কিন গবেষণা ও উন্নয়ন সেবার রফতানি বাড়াবে।
একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হলো স্যামসাং বায়োলজিকস, যা এশিয়ার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান এবং মূলত এ অঞ্চলে অ্যামাজেনের প্রতিনিধিত্ব করছে। এখন কল্পনা করুন, যদি বাংলাদেশ অ্যামাজেনের সঙ্গে একই ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে, যেখানে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং উৎপাদন একসঙ্গে পরিচালিত হবে—তাহলে এটি জ্ঞান স্থানান্তর ও শিল্প সক্ষমতার দিক থেকে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি হবে।
যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে। এটি ওষুধ আবিষ্কার, উন্নয়ন এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা হলো ব্যক্তিভিত্তিক বা ‘পার্সোনালাইজড থেরাপি’—এবং বাংলাদেশের মতো যে দেশগুলোর হাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ তরুণ জনশক্তি রয়েছে, তারা এ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ওরস্যালাইন উৎপাদনে বিশ্বে অগ্রগণ্য, যা ডায়রিয়া চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। মার্কিন কোম্পানিগুলো উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও গবেষণা সরবরাহ করে এ শিল্পের গুণগত মান ও স্কেল উন্নত করতে পারে। এটি মার্কিন রফতানি বাড়াবে এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে।
স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা
স্বাস্থ্যসেবা খাত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র টেলিমেডিসিন প্লাটফর্ম, মেডিকেল ইমেজিং সরঞ্জাম এবং এআইভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম রফতানি করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য এ প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের হাসপাতালে এমআরআই মেশিন বা এআই-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সফটওয়্যার সরবরাহ করতে পারে। এ রফতানি বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ আরেকটি উচ্চ-প্রভাব ক্ষেত্র। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাসপাতাল বাংলাদেশী চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম প্রদান করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কার্ডিওলজি, অনকোলজি বা নিউরোসার্জারির মতো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। এ প্রোগ্রামগুলো বাংলাদেশী চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এছাড়া মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বা ফার্মাসিস্টদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারে, যা মার্কিন শিক্ষা রফতানি বাড়াবে এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা কর্মশক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
এ কৌশলগত পদক্ষেপগুলোর সফল বাস্তবায়ন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করবে না বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, শিল্পায়ন, স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। এ প্রচেষ্টা দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, কৌশলগত এবং মানবিক দিক থেকেও আরো গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ করবে। মোটকথা, এ অংশীদারত্ব একটি উইন-উইন মডেল হবে, যা আগামী দশকের জন্য দুই দেশের মধ্যে নতুন আস্থা ও অগ্রগতির দিগন্ত উন্মোচন করবে। বোয়িং প্রস্তাবের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্যময় এ পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে উভয় দেশই নতুন প্রবৃদ্ধি ও সহযোগিতার সুযোগ উন্মোচন করতে পারবে, যা ন্যায্য এবং দূরদর্শী বাণিজ্য সম্পর্কের একটি নজির স্থাপন করবে।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়