নিবন্ধ

লব্জ ও লেবাসের রাজনীতি

জনমনস্তত্ত্ব প্রভাবিত করতে লব্জ ও লেবাসের দারুণ প্রভাব দেখা যায় রাজনীতিতে। লব্জ (শব্দ/মুখের ভাষা) ও লেবাস (পোশাক) শব্দ দুটি আরবি হলেও এদের বাংলা-বাস বহুদিন। এমন অগণিত শব্দে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা।

জনমনস্তত্ত্ব প্রভাবিত করতে লব্জ ও লেবাসের দারুণ প্রভাব দেখা যায় রাজনীতিতে। লব্জ (শব্দ/মুখের ভাষা) ও লেবাস (পোশাক) শব্দ দুটি আরবি হলেও এদের বাংলা-বাস বহুদিন। এমন অগণিত শব্দে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা। অনাবাসী শব্দরা বহুবর্ষী ব্যবহারে আবাসী হয় এবং একটা সময় পর এসব শব্দ ছাড়া চলে না আবাসী বা প্রবাসী কারোরই। প্রমথ চৌধুরী একবার বলেছিলেন, আরবির সঙ্গে তালাক হলে বাংলা ভাষার সংসার অচল হয়ে যাবে।

ভিন ভাষার বুলি ও অন্য সংস্কৃতির পোশাক আমাদের নানা প্রয়োজনে আত্তীকরণ করেছি শতেক মৌসুমে। ভাষা আর পোশাকের সামঞ্জস্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ভোটারদের মনের তালা খুলে ভোটের বাক্স ভরাতে ব্যস্ত এই ভোট মৌসুমে। বয়সী প্রার্থীরা ছাড়াও ফ্যাশন সচেতন হাল আমলের তরুণ তুর্কিরাও টুপি-পাঞ্জাবি পরে ভোট চাইছেন দ্বারে দ্বারে।

২০২৪ অভ্যুত্থান চিহ্নিত একটি বছর বাংলাদেশের জন্য। সংস্কার নিশ্চিত করে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নয়া বন্দোবস্ত দিয়ে ইনসাফের সেকেন্ড রিপাবলিক কায়েম করতে চান চব্বিশের আন্দোলনকারীরা। ইংরেজি আরবি-ফারসি প্রভাবিত বাক্য কেবল সম্পাদকীয়তে নয়, গত কিছুদিনে রাজনীতিক ও জনগণের সম্পর্ক নির্ধারণের বিষয় হয়ে উঠেছে। এমনকি আপাত অশ্রাব্য শব্দও মিছিলে-স্লোগানে এড্রিনালিন প্রবাহিত করে প্রকম্পিত করেছে আকাশ-বাতাস।

বিদেশী শব্দের পক্ষ-বিপক্ষ: লব্জ ও লেবাস শব্দজোড়টি খুব যে কম আলোচিত এমন নয়। শব্দ দুটি বিচ্ছিন্নভাবে বেশ আলোচিত।

আরেকটা সাধারণ নির্বাচন সমাগত—এর প্রেক্ষাপটে আবারো সক্রিয় লব্জ ও লেবাসের আলাপ। কেউ রাজনীতির বয়ানে ধর্মীয় লব্জ ব্যবহার করে পারলৌকিক সিদ্ধিলাভের উপায় হিসেবে একটা ভোট চাইছে। বিশেষ এক প্রতীকে ভোট না দিলে ইমান থাকবে না বলে নিদান আসছে। আর সেসবের প্রধান বিরোধিতাকারী অন্য দলের প্রধান একে ‘শিরক’ হিসেবে দাগিয়ে দেয়ার চেষ্টারত। নতুন পুরনো সব দল সর্বত্র প্রয়োজনমতো ব্যবহার করছে আরবি ও ইসলাম প্রভাবিত শব্দ। সেখানে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তির বাহাস।

বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে এ কোনো নতুন ধারা নয়, বরং বহুল ব্যবহৃত একটা নির্বাচন—সফল কৌশল। ভাষিক-ঐতিহ্যে উচ্চকিত কয়েকটি স্থান নিয়ে আছে আরবি-ফারসি শব্দ। গোচরে-অগোচরে আমাদের যাপনের অংশ হিসেবে লেপ্টে রয়েছে। এমনই যে শব্দ দেশী না বিদেশী সেই বিভেদও মুছে গেছে আজ। অথচ কিছুকাল আগেও শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকের সক্রিয়তা সত্ত্বেও বাংলা ব্যাকরণে ও ভাষায় এ ধরনের বিভাজন ছিল। ফলে আমাদের বাংলা ভাষাভাষীর মনস্তত্ত্বে ভাষার এ আলাপটা ‘বিদেশী’ শব্দের আলাপ হিসেবেই আবির্ভূত হয়। কিন্তু রাজনীতি সেই অনুঘটক যা অনেক কিছুই ঘটায়। পক্ষের-বিপক্ষের সবাইকে একঘাটের জল খাওয়ায়।

ভোট ভুলিয়ে দেয় আদর্শ: টুপি, তসবিহ, হিজাব আর পাঞ্জাবি উপমহাদেশের ভোটিং পলিটিকসে নতুন নয়, প্রমাণিত এবং এর সফল ব্যবহার এখনো একে প্রাসঙ্গিক রেখেছে। বন্দোবস্ত পুরনো বা নতুন যেমনই হোক ভোট টানতে আশ্রয় নেয়া হয় সনাতন পদ্ধতির। রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভোটে এর কার্যকরী ব্যবহার কৌশল রপ্ত করেছে জেনারেশন জির তারুণ্যও। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কিংবা সারজিস আলমরা দর্জি ডেকে সেলাই করে নিয়েছেন ভোটের পোশাক।

হয় মাতৃভূমি নয় মৃত্যু, ক্ষমতা না জনতা—এমন সব স্লোগান দিয়ে জনতার মমতা পেয়েছিল নবীনদের দল এনসিপি। কিন্তু সংগঠিত দল হিসেবে আবির্ভাবের আগেই ক্ষমতা লিপ্সা, তদবির, চাঁদাবাজি, শিক্ষক প্রশাসকদের হেনস্তার মতো নেতিবাচক তৎপরতা তাদের নতুন দিনের রাজনীতির বাহক নয়, বরং পুরনো রাজনীতির পতাকাবাহী হিসেবে চিহ্নিত করে।

আর সর্বশেষ ভোটে টিকে থাকতে এমন দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে যাদের বিপক্ষে একসময় স্লোগান তুলেছিল। অনেকেই আশা করেছিল গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে তারা আদর্শিক রাজনীতিই করবে। কিন্তু তারা হতাশ করেছে। ক্ষমতান্ধতা অন্য দলগুলোর মতো তাদেরও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বলেই নির্বাচনে জোট বেঁধেছে একদা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে (যদিও রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু/শত্রু বলে কিছু নেই)।

ভোট এমনই এক আফিম যা ভুলিয়ে দিচ্ছে নির্বাচনী আইন, দলীয় সংবিধান (গঠনতন্ত্র)। না হলে এনসিপি জোট বাঁধে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আর ইসলাম কায়েম করতে চাওয়া খোদ জামায়াতে ইসলামী হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দেয়! আসলে মন ও নয়ন এখন ভোটবিভোর। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এ বিশেষ অবস্থা বুঝতে এ-বিষয়ক সনাতনপন্থী (প্রিমোরডিয়ালিস্ট) ও কার্যকারণপন্থী (ইন্সট্রুমেন্টালিস্ট) অংশের মধ্যকার বিতর্ক প্রাসঙ্গিক। ফ্রান্সিস রবিনসন তার গবেষণা কয়াজ, সেপারেটিজম এমাং ইন্ডিয়ান মুসলিমস: দ্য পলিটিজ অব দ্য ইউনাইটেড প্রভিন্সেস (লন্ডন, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৭৪) নামের বইয়ে লেখেন, প্রাচীনপন্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে। এর বিপরীতে পল ব্রাস যুক্তি দেন, রাজনৈতিক পরিচয় আসলে ইচ্ছানুসারে নির্ধারিত হয়। এ বিপরীতমুখী একাডেমিক বাহাসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রফেসর নাসিম আখতার হোসাইন এ উপসংহারে আসেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ দুই মডেলের একটিও সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগযোগ্য নয়। (সূত্র: বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি ২০১৬, সংহতি, প্রথম খণ্ড)। বরং রাজনৈতিক পরিচিতি বাছাই করার মাধ্যমে নির্ণয় করার সঙ্গে ধর্মের প্রবল সম্পৃক্ততা আছে।

টুপি ও টোপরের রাজনীতি: ভোটের এ পঞ্চবার্ষিক আয়োজনে কেউ কেউ গুরুত্বহীন থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ শ্রেণীর ও ধর্মের ভোটারের (মানুষ নয় ভোটের মাঠে সবাই ভোটার বেশি মানুষ কম) গুরুত্ব বেড়ে যায়, তা তিনি টুপি কিংবা পৈতা যা-ই পরুন না কেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নড়াইলের সাহাপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাটের বিষয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দলের তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঠাকুরগাঁও এলাকায় রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমার নিজের নির্বাচনী এলাকায় রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ প্রচুর, ১ লাখ ৭ হাজার ভোটারই আছেন রাজবংশী লোক। তাদের মধ্যে একজন আমার ছাত্রই ছিলেন। নাম ছিল অমর রায়। সে খুব চমৎকার একটা কথা বলত বক্তৃতা দেয়ার সময়—আমাদের দেশী ভাষায় ‘হামরা হচ্ছি বিহার দিনের পগরি। মানে, বিয়ের দিনের পাগড়ি হচ্ছি আমরা। একটা দিনই পাগড়িটা পরা হয়, আর কখনো পরা হয় না। নির্বাচনের দিনই ওই পাগড়িটা পরতে হয়, ভোট দেয়ার সময় নৌকাকে ভোট দিতে হয়। আর বাকিটা সময় আমাদের খোঁজ থাকে না।’ পাঁচ বছর কোনো আলাপে থাকে না ভোটের কালে দরদের পারদ তাদের জন্য থাকে ঊর্ধ্বমুখী। অবশ্য টুপি ও টোপরের রাজনীতিতে এটিই হয়তো দস্তুর।

সে প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল আরো বলেছিলেন, ‘আসলে বিষয়টা তাও নয়। এখানে আওয়ামী লীগ তাদের মনে করে সংখ্যালঘুরা তাদের সম্পত্তি, তারাই এদের রক্ষক, তারা ভোটটোট যা কিছু দেবে, আওয়ামী লীগকে দিতে হবে। আর যা কিছু অত্যাচার-নির্যাতন এবং তাদের সম্পদকে লুট করা, এটাও তাদের।’ আমাদের প্রত্যাশা, এর ভিন্ন কিছু প্রমাণ করবে যদি তার দল দায়িত্ব পায়।

শেষ কথা আইনের: পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রায় সব সাধারণ নির্বাচনে কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় ইস্যু প্রভাব ফেলেছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকার পরও ভোটে তার ব্যবহার নির্বাচনী নীতিবিরুদ্ধ। ধর্ম বিষয়টি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত আচরণের বিষয়। জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে নির্বাচন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় আচার। এখানে ধর্মের ব্যবহার বাঞ্ছনীয় নয়। ধর্ম-বর্ণ এখন সম্প্রদায়ের নামে ভোট প্রার্থনা করা যায় না। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ব্যক্তির মৌলিক অধিকার থেকে শুরু করে নাগরিক সুরক্ষার যাবতীয় রক্ষাকবচ সংবিধানে রয়েছে এবং তা ধর্মীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে করতে হবে।

২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে রাজনীতিবিদরা ভোট চাইতে ধর্ম বা বর্ণ ব্যবহার করতে পারবেন না। বিচারকরা তাদের রায়ে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই, কারণ এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ কার্যক্রম।’ ধর্ম, জাতপাত বা ভাষার ভিত্তিতে ভোট চাওয়া যাবে না। যদি তা করা হয় তবে প্রার্থিতা বাতিল করা হবে। আদালত বলেছেন, ধর্মীয় বিষয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয় প্রতিটি মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে হস্তক্ষেপ হতে পারে না।

এ রায় প্রধান বিচারপতি টিএস ঠাকুরের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির বেঞ্চ প্রদান করেন। তবে বিচারপতিদের মধ্যে মতভেদ ছিল—চারজন এ রায়ের পক্ষে ছিলেন, আর তিনজন এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন।

পত্রিকার পোস্ট এডিটোরিয়ালে ফুটনোট ব্যবহার করা যায় না। তাই কলাম গর্ভের উপসংহারে আলতো করে বলা যাক, আইনি সতর্কতা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার যেমনই হোক নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহারের বিষয়ে আছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী যদি সেই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।

যারা ক্ষমতা চর্চা করেন বা নতুন ক্ষমতা নির্মাণ করতে চান, তাদের সাজ পোশাকও ক্ষমতার অংশ। গান্ধীজির ধুতি-চটি, জিন্নাহর আচকান জিন্না টুপি, ভাসানীর লুঙ্গি-বেতের টুপি—এ সবই ক্ষমতাচর্চার অংশ ছিল। এ ক্ষমতা এক দেহ থেকে আরেক মানবদেহে, নেতা থেকে কর্মীদের শরীরে চেপেছে। আর ক্ষমতার ভাষাও নেতা থেকে কর্মীদের মুখে রাজনৈতিক চর্চার সক্রিয়তার বুলি হিসেবে প্রাণ পায়। নেতার আহ্বানের অনুরণন যতদূর, মানুষের সমর্থন ব্যাপ্ত ততদূর। মাঠের ও ভোটের রাজনীতিতে এসবই পার্থক্য নির্ধারণী। তবে রাজনীতির প্রমিতায়নে লব্জ ও লেবাসের ব্যবহারে পরিমিতি জরুরি।

এমএম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আরও