বিশ্ব পরিবেশ দিবস

প্রকৃতিতেই খুঁজতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ঠেকানোর সমাধান

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাবে বিপর্যস্ত আমাদের পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ত্বরিত গতির সঙ্গে প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী অভিযোজনের গতি খুবই মন্তর। পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী প্রকৃতি নিজেই এ সংকটের সমাধান দিতে পারে। বনভূমি ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ হার বাড়ছে। ব্যাপক আকারে বৃক্ষ নিধনের ফলে সঞ্চিত কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ হয়। এ কারণে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে

সমগ্র বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোমে ১৯৭২ সালে মানব পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের দিনটিকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ ঘোষণা করা হয়। পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে ১৯৭৪ সালে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন শুরু হয়। প্রতি বছরের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী একটি প্রতিপাদ্য থাকে। এবারের প্রতিপাদ্যটি হলো ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ এবার এ দিবসের আয়োজক দেশ আজারবাইজান এবং দিবসটির মূল অনুষ্ঠান হবে দেশটির রাজধানী বাকুতে। প্রকৃতি থেকেই সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলার জন্য সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়েই এ বছর আলোচনা হবে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির (ইউএনইপি) মতে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও নানাবিধ দূষণ পরিবেশের জন্য প্রধান তিনটি সংকট হিসেবে জিইয়ে রয়েছে।

প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী সূর্যের আলো ও তাপ পৃথিবীতে পৌঁছায় এবং ভূপৃষ্ঠে শোষিত হয়। এ তাপ ও আলোর কিছু প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়। প্রাকৃতিক নিয়মের এ শোষণ-বিকিরণ প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা তৈরি হলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে আজ প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।অনুকূল জলবায়ুই গোটা বিশ্বে প্রাণ, সংস্কৃতির মধ্যে বৈচিত্র্য এনেছে। আবার প্রতিকূলভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা হ্রাসবৃদ্ধি, অসম বৃষ্টিপাত, বন্যা, জলাবদ্ধতা, অনাবৃষ্টি, রৌদ্রের প্রখরতা, খরা, টর্নেডো, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, জলোচ্ছাসের প্রাদুর্ভাব ও মাত্রাবৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ইত্যাদি ক্রমাগত মানুষের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ব্যবস্থাপনা। মানুষের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস বাড়ছে। বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে গেলে তাপমাত্রা বাড়ে এবং বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বনভূমি ধ্বংসের কারণেও বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ হার বাড়ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বিপন্ন দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বহুমাত্রিক হুমকির মুখে রয়েছে। আইপিসিসির তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইপিসিসির রিপোর্টে ধারণা করা হয়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি বাড়লে ২০৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৬২ সেন্টিমিটার। এতে উপকূলের ১৩ শতাংশ জমি তলিয়ে যেতে পারে এবং প্লাবিত হতে পারে ২০ শতাংশ কৃষিজমি। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা এবং তীব্রতা বেড়েছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে সুপেয় পানিকে দূষিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোয় খরার ফলে প্রায় ২৭ লাখ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। নদীভাঙনে বিলুপ্ত হতে পারে হাজার হাজার আবাস।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব এবং ওজোন স্তর হ্রাসের পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ সাম্প্রতিক এক বিরাট বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ ‘শীর্ষ ১০ জরুরি পরিবেশগত সমস্যা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে দ্বিতীয় জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরিবেশ ও পরিবেশবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্লাস্টিক কারখানার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার এবং প্রতিদিন প্রায় আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এগুলো পরিবেশে দূষণ সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে (২০২১), বাংলাদেশে ২০০৫-২২ পর্যন্ত শহর এলাকায় বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার তিন গুণ বেড়েছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে মানুষের জীবনের একটি অংশ হিসেবে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানে যেমন মাটি, পানি, বাতাসের সঙ্গে সহজে মিশে যাচ্ছে। খাবার, দৈনন্দিন বাজার, শপিং, সুপারশপ, অনলাইন কেনাকাটা প্রতিটি পণ্যে ও মোড়কে দিন দিন ব্যবহার বাড়ছে প্লাস্টিকের, ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, গ্রাম-শহরে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারকৃত স্যাম্পু, সাবান, ফেস ও বডি ওয়াশ, সেভিং ফোম, পাউডার, ডিটারজেন্ট, পেস্ট, মিনারেল ওয়াটার, প্লাস্টিক মোড়কজাত খাবার ইত্যাদি সামগ্রীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়ে প্রতিনিয়ত মিশছে। পুকুর-জলাশয়ে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী সেগুলো খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। এরপর বিভিন্ন বড় মাছ ও খাদ্য শিকলের ধারাবাহিকতায় মাইক্রোপ্লাস্টিক মানব শরীরে প্রবেশ করে। বিভিন্ন স্তর অতিক্রমকালে কোনো জায়গায় এগুলো হজম হয় না, সর্বত্র পাকস্থলীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে যায়। প্লাস্টিক মাইক্রোকণা সহজে ও নিয়মিতভাবে মানুষসহ প্রাণীর খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমগ্র পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যই হুমকির সম্মুখীন। এজন্য বনভূমি ও বণ্যপ্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। দেশে মোট ৫৩টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে, যা বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্বের সব দেশকে বনভূমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ করার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করার কর্মসূচি নির্বাচনী ইশতাহারে উল্লেখ করেছে। এ উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বনভূমি বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাড়াবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা উদ্যোগটিকে সফল করতে সহযোগিতা করবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাবে বিপর্যস্ত আমাদের পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ত্বরিত গতির সঙ্গে প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী অভিযোজনের গতি খুবই মন্তর। পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী প্রকৃতি নিজেই এ সংকটের সমাধান দিতে পারে। বনভূমি ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ হার বাড়ছে। ব্যাপক আকারে বৃক্ষ নিধনের ফলে সঞ্চিত কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ হয়। এ কারণে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে।

প্রাকৃতিক সম্পদের উপযুক্ত ও নিরাপদ আবাসস্থল হলো বনভূমি। বনভূমিসমূহে উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার এক নিবিড় বন্ধন। বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ব্যাপক আকারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামগ্রিক দিক বিবেচনা নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশকে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এজন্য সঠিক পরিমাণে পানি সরবরাহ ও সেচ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ; খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে অধিক উষ্ণতা সহনশীল বীজ উদ্ভাবন; পুকুর,-জলাশয় রক্ষার পাশাপাশি জনঘনত্ব সমন্বয়; সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎসাহ প্রদান, প্রাকৃতকি সম্পদের অত্যধিক ব্যবহার হ্রাস করে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি মন্থর করা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সাশ্রয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া; বন উজাড় বন্ধ করে পর্যাপ্ত ও সঠিক পরিমাণে বৃক্ষরোপণ ও যথাযথ পরিচর্যা; শহর এলাকার ছাদ বাগানে উৎসাহিত ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করার বিকল্প নেই।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

আরও