স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বাস্থ্য খাত। ১৯৭১ সালে চরম দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ সম্পদ-সীমাবদ্ধ বাস্তবতায় স্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক মডেলে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ দশকে দেশের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু বিস্ময়করভাবে কমেছে। প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগগুলো টিকাদান ও কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এসব অর্জন শুধু জীবন রক্ষা নয়, এর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সমতা জোরদার এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিমূলকেও শক্তিশালী করেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ ভঙ্গুর; দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগে বিপর্যস্ত একটি জনগোষ্ঠী তখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। গত পাঁচ দশকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, উদ্ভাবনী সেবা ব্যবস্থা এবং সরকার, এনজিও, বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে আমূল বদলে দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যেখানে দেশের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪৮ বছর, সেখানে তা বেড়ে বর্তমানে ৭৪ বছরেরও বেশি হয়েছে (বিবিএস-২০২৩)। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে প্রতি হাজারে ২৫০ থেকে ৩১-এ নেমে এসেছে (বিডিএইচএস, ২০২২)। এ ধরনের অর্জনগুলো বিশ্বজনীন স্বাস্থ্য অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একই সময়ে মাতৃমৃত্যু ৭৫-৭৯ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়ে, ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১৫৬-তে দাঁড়িয়েছে। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে গর্ভকালীন সেবার ব্যাপক বিস্তৃতি (৮৮ শতাংশ), দক্ষ প্রসব সহায়তা এবং জরুরি প্রসূতি সেবার উন্নয়ন। পাশাপাশি জন্মহার ৬ দশমিক ৯-এর বেশি থেকে প্রায় ২ দশমিক ১-এ নেমে আসায় নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণে গভীর ও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: আমাদের অগ্রগতি
একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং জীবন সুরক্ষা, সমতা ও সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। ২০১৫ সাল থেকে সরকার ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ নামে একটি জাতীয় ডিজিটাল টেলিহেলথ সেবা চালু করেছে, যার মাধ্যমে সাধারণ চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য সারা দেশে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বিভিন্ন টেলিহেলথ ও টেলিমেডিসিন প্লাটফর্মের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ, বিশেষজ্ঞ সেবা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য সমাধান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরো বহুমুখী ও সহজলভ্য করছে।
স্বাস্থ্য বাতায়ন আজ মানুষের জীবনে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ২৪/৭ একটি টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করলেই চিকিৎসকের সহায়তা পাওয়া যায়—কারণ হাতের মোবাইল মানেই সঙ্গে ডাক্তার। এখন পর্যন্ত তিন কোটিরও বেশি মানুষ এ সেবা পেয়েছে এবং কভিড-১৯ মহামারীর সময় এক কোটির বেশি মানুষের জন্য দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে এটি একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় প্লাটফর্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক নতুন ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। এ বাস্তবতাকে মোকাবেলায় অতীতের সাফল্যে আত্মতুষ্টি নয়; বরং সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দূরদর্শী, সাহসী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান শর্ত।
টিকাদান: জীবন রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাফল্যগুলোর একটি হলো টিকাদান কর্মসূচি। ১৯৭৯ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালুর পর থেকে দেশে শিশু মৃত্যুহার আনুমানিক ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। পোলিও ও নবজাতক টিটেনাস নির্মূল হয়েছে, নিয়ন্ত্রণে এসেছে হেপাটাইটিস-বি-এর সংক্রমণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ কর্মসূচির সাফল্য আরো বিস্তৃত হয়েছে, এইচপিভি টিকার কাভারেজ ৯৩ শতাংশ এবং টাইফয়েড টিকার কাভারেজ ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও টিকাদান একটি সর্বোচ্চ লাভজনক বিনিয়োগ। এ খাতে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে গড়ে ২৫ দশমিক ৪ ডলার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে টিকা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে অগ্রগতি দেশের প্রায় সর্বত্র মৌলিক পানির সুবিধা নিশ্চিত করেছে এবং খোলা স্থানে মলত্যাগ কার্যত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এ সাফল্য জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও পানির গুণগত মান, দ্রুত নগরায়ণের চাপের মুখে স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই সমাধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বদলে যাওয়া রোগচিত্র, বাড়তে থাকা ঝুঁকি
যেখানে ১৯৭১ সালে সংক্রামক রোগই মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মৃত্যুর ৬৭ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটছে। উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ব্যবহার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ এবং স্থূলতা হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগকে উদ্বুদ্ধ করছে। এ অসংক্রামক রোগগুলো মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ দখল করেছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের মধ্যে। ফলে পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন এ ঝুঁকিকে আরো তীব্র করছে। দেশের নগর জনসংখ্যা এখন প্রায় ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তাপপ্রবাহ, বায়ু ও পানিদূষণ এবং ডেঙ্গুসহ মশা বাহকবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এখন নীরব কিন্তু ভয়ংকর সংকটে পরিণত হয়েছে। মানুষ, পশুপালন ও পোলট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার E. coli, Klebsiella pneumoniae ও Staphylococcus aureus-এর মতো জীবাণুকে আরো শক্তিশালী করছে, যা চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি উভয়ই বাড়াচ্ছে।
আজ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা লাখ লাখ পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য এ চাপ আরো বাড়াচ্ছে। ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর হার ২০২৫ সালে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০৫০ সালে ২০ শতাংশের বেশি হবে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও বয়স্ক সেবার চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ভবিষ্যতে আমাদের করণীয় কী?
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অতীতের অর্জন ধরে রাখতে চাইলে এখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দেয়াই প্রধান অগ্রাধিকার। আজীবন টিকাদান, নিয়মিত হেলথ স্ক্রিনিং, তামাক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং দায়িত্ব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে সরকারি বিনিয়োগ ও ঝুঁকি ভাগাভাগি বাড়ানো অপরিহার্য। ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে এএমআর মোকাবেলা, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্যোগ-প্রস্তুত স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়—এগুলো জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। একই সঙ্গে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার কল সেন্টার ‘স্বাস্থ্য বাতায়নসহ (১৬২৬৩)’ ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সঠিক নীতিমালা, তথ্য সুরক্ষা এবং সমন্বয় নিশ্চিত করে সম্প্রসারণ করা গেলে সেবার মান ও সুলভ স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা দুই-ই বৃদ্ধি পাবে।
স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ: সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কৌশলগত ভিত্তি
গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে—সঠিক নীতি, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব। আজ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে চ্যালেঞ্জ কেবল জীবন রক্ষা নয়; বরং মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ এখন আর শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক ও জাতীয় বিনিয়োগ। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হবে অসুস্থতা ও বৈষম্যের বোঝায় নুয়ে পড়া এক সমাজ, নাকি আরো সুস্থ, সহনশীল ও সমৃদ্ধ এক জাতির দিকে দৃঢ় অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে লাখ লাখ জীবন রক্ষা করেছে। এখন সময় এসেছে সবার জন্য কল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বজনীন সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার। কারণ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠীই কেবল আগামীর স্থানীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটি উন্নত, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ: সিনিয়র জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; চেয়ার, গাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটি এবং টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা