ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে যদি কেবল লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যকার ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সম্ভবত এ নির্বাচনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রাজনৈতিক আখ্যানটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। কারণ এবারের নির্বাচনে শুধু একজন প্রার্থী, একটি রাজনৈতিক পরিবার কিংবা একটি দল আলোচনার কেন্দ্রে নেই। একটি চলচ্চিত্রও নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্রটির নাম ডার্ক হর্স।
জাইর বলসোনারোর জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ চলচ্চিত্রের অর্থায়ন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা দ্রুত সাংস্কৃতিক পরিসর অতিক্রম করে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। ব্যাংকো মাস্টারের সাবেক মালিক দানিয়েল ভোরকারোর সঙ্গে ফ্লাভিও বলসোনারোর যোগাযোগ, চলচ্চিত্রটির জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং সেই অর্থের উৎস নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন ব্রাজিলের নির্বাচনী আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৬১ মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান রিয়ালের অর্থায়ন তদন্তের আওতায় এসেছে। ফ্লাভিও বলসোনারো অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তদন্ত এখনো চলমান। ফলে অভিযোগকে এরই মধ্যে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে নির্বাচনের দৃষ্টিকোণ থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্যত্র। ডার্ক হর্স কি ব্রাজিলের ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে?
প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, এর উত্তর সম্ভবত ইতিবাচক। বিতর্কটি প্রকাশ্যে আসার পর ফ্লাভিওর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। বিরোধীরা তার আর্থিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং বলসোনারো পরিবারের বিস্তৃত ক্ষমতার নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। নির্বাচনী রাজনীতিতে এ ধরনের একটি কেলেঙ্কারি সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য বড় রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে ব্রাজিলের মতো দেশে, যেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা বহু বছর ধরেই জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ফলাফল ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এনেছে। ফ্লাভিও বলসোনারো প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে লুলার প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটকে পেছনে ফেলেছেন। কোনো প্রার্থী অর্ধেকের বেশি ভোট অর্জন করতে না পারায় দুজন ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি হবেন। ভোটের আগে বেশকিছু জরিপে লুলাকে সামান্য এগিয়ে রাখা হলেও বাস্তব ফলাফলে ফ্লাভিও প্রত্যাশার তুলনায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। এখানেই ডার্ক হর্স বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা নিহিত। কেলেঙ্কারিটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির প্রভাব সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি পুরনো অনুমান হলো, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতি কিংবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হলে ভোটার তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন। নতুন তথ্য জনসমক্ষে আসবে, ভোটার সেই তথ্য মূল্যায়ন করবেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদকে পুরস্কৃত অথবা শাস্তি দেবেন। গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ব্রাজিলের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখাচ্ছে, বাস্তবতা এত সরল নয়।
গভীরভাবে মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে ভোটার শুধু প্রার্থীর কর্মকাণ্ড বিচার করে সিদ্ধান্ত নেন না। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক বিভাজন এবং প্রতিপক্ষ সম্পর্কে পূর্ববর্তী ধারণাও তার ভোটের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একজন ভোটার যদি নিজেকে দৃঢ়ভাবে বলসোনারোপন্থী শিবিরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে ডার্ক হর্স ঘিরে ওঠা অভিযোগ তার কাছে ফ্লাভিওকে পরিত্যাগ করার জন্য যথেষ্ট কারণ নাও হতে পারে। বরং কখনো কখনো বিপরীত প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে।
বিরোধীরা যে ঘটনাকে দুর্নীতির নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে, সমর্থকরা সেটিকেই রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবে দেখতে পারেন। কেউ তদন্তকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আবার কেউ একই তদন্তকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। অর্থাৎ তথ্য একই থাকে, কিন্তু তার রাজনৈতিক অর্থ একই থাকে না। মেরুকরণের শক্তি এখানেই।
ডার্ক হর্স তাই শুধু একটি আর্থিক বিতর্ক নয়। এটি ব্রাজিলের রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি আয়না। একই ঘটনা এক দল ভোটারের কাছে অনিয়মের আলামত, অন্য দলের কাছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রমাণ। বাস্তবতা একটি হলেও সেই বাস্তবতার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্রচার এ প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করেছে। আজকের রাজনৈতিক নেতারা আর প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ব্যাখ্যার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নন। তারা সরাসরি নিজেদের সমর্থকদের কাছে পৌঁছতে পারেন। অভিযোগের বিকল্প ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তদন্তকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। ফলে কোনো কেলেঙ্কারির অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা আর শুধু সাংবাদিক, আদালত কিংবা তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজনৈতিক দল, নেতা, অনলাইন প্রভাবক এবং সমর্থকদের নেটওয়ার্কও একই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করে। এর ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে।
কেলেঙ্কারি এখন শুধু নতুন তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি ভোটারের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করার উপাদান হিসেবেও কাজ করে। নতুন তথ্য পুরনো বিশ্বাসকে দুর্বল করার বদলে কখনো কখনো সেই বিশ্বাসের চারপাশে আরো শক্ত প্রতিরক্ষা তৈরি করে। ফ্লাভিওর প্রথম দফার ফলাফল এ পরিবর্তনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। ব্যাংকো মাস্টার বিতর্কে তার নাম এসেছে, ডার্ক হর্স নিয়ে তদন্ত হয়েছে, বিরোধীরা বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করেছে, তার পরও তিনি প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। একই বিতর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকজন রাজনীতিবিদের নির্বাচনী সাফল্যও ইঙ্গিত করে যে কেলেঙ্কারি এবং নির্বাচনী শাস্তির সম্পর্ক সব সময় সরল নয়। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভোটার দুর্নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। বরং এর অর্থ হলো, দুর্নীতি তাদের ভোটের সিদ্ধান্তের বহু বিবেচনার মধ্যে একটি মাত্র।
অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, জননিরাপত্তা এবং বর্তমান সরকারের প্রতি অসন্তোষও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন ভোটার ডার্ক হর্স বিতর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েও অর্থনীতি কিংবা নিরাপত্তার প্রশ্নে ফ্লাভিওকে সমর্থন করতে পারেন। অন্যদিকে আরেকজন ভোটার লুলা সরকারের কোনো নীতিতে অসন্তুষ্ট হয়েও বলসোনারোপন্থী রাজনীতির প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে লুলাকে ভোট দিতে পারেন। এখানেই ভোটের যুক্তি বদলে যায়। প্রশ্নটি আর শুধু থাকে না—কোন প্রার্থী বেশি সৎ? বরং প্রশ্ন হয়ে ওঠে, কোন রাজনৈতিক শিবিরকে আমি কম অপছন্দ করি, কোন ঝুঁকিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কোন পক্ষকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া আমার কাছে বেশি উদ্বেগের, অথবা কোন রাজনৈতিক ফলাফল প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি?
আধুনিক মেরুকৃত গণতন্ত্রে এ নেতিবাচক দলীয় পরিচয় অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষ অনেক সময় নিজের প্রার্থীর প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে নয়, প্রতিপক্ষের প্রতি গভীর বিরোধিতার কারণেও ভোট কেন্দ্রে যায়। সমর্থনের রাজনীতি তখন ধীরে ধীরে প্রতিরোধের রাজনীতিতে রূপ নেয়। ব্রাজিলের বাধ্যতামূলক ভোট ব্যবস্থা এ বাস্তবতাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। রাষ্ট্র নাগরিকের একটি বড় অংশকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর একজন নাগরিক কোন তথ্যকে বিশ্বাস করবেন, কোন অভিযোগকে গুরুত্ব দেবেন, কোন বিষয়কে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখবেন, তা রাষ্ট্র নির্ধারণ করতে পারে না।
গণতন্ত্রের গভীর পরিহাস সম্ভবত এখানেই। ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক করা যায়, কিন্তু যুক্তিসংগত ভোট বাধ্যতামূলক করা যায় না। তথ্য প্রকাশ করা যায়, কিন্তু সবাই সেই তথ্য একইভাবে ব্যাখ্যা করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কেলেঙ্কারি উন্মোচিত করা যায়, কিন্তু সেই কেলেঙ্কারি ভোট বদলে দেবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। এ কারণেই ডার্ক হর্স ব্রাজিলের ২০২৬ সালের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি হয়তো সরাসরি নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেনি। কিন্তু এটি দেখিয়েছে, মেরুকৃত গণতন্ত্রে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিরও সীমা আছে। ফ্লাভিও বলসোনারোকে ঘিরে প্রশ্ন আছে। তদন্ত আছে। বিরোধীদের আক্রমণ আছে। তার পরও প্রথম দফায় তার প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। চলচ্চিত্রটির নাম ডার্ক হর্স। কিন্তু ব্রাজিলের এ নির্বাচনে প্রকৃত ডার্ক হর্স সম্ভবত চলচ্চিত্রটি নয়। প্রকৃত ডার্ক হর্স হলো ভোটারের মন।
কারণ রাজনৈতিক পরিচয় যখন মানুষের উপলব্ধির গভীরে প্রবেশ করে, তখন কেলেঙ্কারি সব সময় সত্যকে বদলে দেয় না। কিন্তু সেই সত্যের অর্থ, গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক পরিণতি বদলে দিতে পারে।
মো. আল-আমিন: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি ছাত্র, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র।