বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘ফোর্বস’ মাঝে মাঝেই নানা বিষয়ের ওপর সমীক্ষা প্রকাশ করে থাকে, এটা আমাদের সবারই জানা। দেশ-বিদেশের নানা অজানা তথ্যও বেরিয়ে আসে মাঝেমধ্যে। প্রায়ই সময় করে তাই বিশ্বখ্যাত সাময়িকীর ওয়েবসাইটে ঢুঁ দেয়া হয়। হঠাৎই একদিন একটি আর্টিকেল চোখে পড়ে—বিশ্ব ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহর। সে তালিকায় বাংলাদেশের একটি শহরও রয়েছে। মূলত আজকে লিখতে বসেছি বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া একটি শহর নিয়ে। বলছি ঐতিহাসিক মসজিদের নগরী, খলিফাতাবাদ বা বর্তমান বাগেরহাট শহরের কথা। বাগেরহাট শহরের পূর্ব নাম ছিল ‘খলিফাতাবাদ’। এ জেলাকে ‘ঐতিহাসিক মসজিদের নগরী’ও বলা হয়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে বাগেরহাট জেলার অবস্থান। বাগেরহাট খুব পুরনো ভূখণ্ড না হলেও বাগেরহাটের ইতিহাস উপমহাদেশের বহু প্রাচীন জনপদের সমকালীন ও সমপর্যায়ের। ইউনেস্কো ঘোষিত বাংলাদেশে যে তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান রয়েছে, তার দুটির অবস্থান এ জেলায়। একটি হচ্ছে ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ, অন্যটি প্রকৃতির অপার বিস্ময় সুন্দরবন।
প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাগেরহাট জেলায় রয়েছে শত শত বছরের প্রাচীন মঠ, মন্দির, মসজিদ ও সমাধিসৌধ। তবে যে কারণে বাগেরহাট জেলার খ্যাতি, তা হচ্ছে এখানে রয়েছে সাড়ে পাঁচশ বছরের প্রাচীন একটি চিত্তাকর্ষক সমাধিসৌধ এবং খাঞ্জালি দিঘি। হজরত খানজাহান আমলে নির্মিত ইসলামী স্থাপত্যরীতির মসজিদগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৫ সালে বাগেরহাট জেলাকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষণা এবং ৩২১তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে ইউনেস্কো। এর মধ্যে বাগেরহাটের ১৭টি স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করা হয়। তালিকাভুক্ত স্থাপনা ছাড়াও বাগেরহাটে আরো অনেক পুরাকীর্তি ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা রয়েছে। সম্প্রতি বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় আরো ১৬৩টি প্রত্নস্থান (সাইট) শনাক্ত করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
ষাটগম্বুজ মসজিদটি বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইউনেস্কো ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। মসজিদটি বাইরের দিক দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ ফুট লম্বা। মসজিদটির কোনো শিলালিপি না থাকায় ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে খানজাহান ১৫০০ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এ মসজিদে ব্যবহৃত পাথরগুলো রাজমহল থেকে আনা হয়েছিল।
হজরত খানজাহান (র.)-এর সময় এ অঞ্চলের দিঘি খননকালে বিশেষ করে ‘খাঞ্জেলী দিঘি’ খননকালে পাওয়া ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি থেকে অনুমিত হয় হজরত খানজাহান (র.)-এর আগমনের অনেক আগে থেকেই বাগেরহাটে এক বিস্তৃত জনপদ ছিল। বর্তমানে সেই বুদ্ধমূর্তি বাগেরহাটের শিববাড়ি থেকে স্থানান্তর হয়ে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধবিহারে রক্ষিত আছে। বাংলার শাসক যখন নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৪২-১৪৫৯) তখন হজরত খানজাহান (র.) এ অঞ্চল আবাদ করে নামকরণ করলেন ‘খলিফাত-ই-আবাদ’ বা প্রতিনিধির অঞ্চল। মানুষের কল্যাণে তিনি তৈরি করলেন ষাটগম্বুজসহ অসংখ্য মসজিদ, দিঘি, রাস্তা ও পত্তন করলেন অগণিত হাট-বাজার। হজরত খানজাহান (র.)-এর আগমনকাল না জানা গেলেও এ সাধক পুরুষ পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বহু ধর্মপ্রাণ অনুসারীকে সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন যশোর জেলার বারোবাজার হয়ে ভৈরব নদ অতিক্রম করে বাগেরহাট পৌঁছান। বঙ্গেশ্বর নসরৎ শাহের খলিফাতাবাদ টাঁকশাল বাগেরহাট শহরের সম্ভবত মিঠাপুকুরের কাছে অবস্থিত ছিল। মিঠাপুকুর পাড়ে সে আমলের একটি মসজিদ আছে। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সময়ে নির্মিত এক আকর্ষণীয় মঠ যাত্রাপুরের অযোধ্যায় (কোদলা) অবস্থিত।
বাগেরহাট এমন একটি জেলা, যেখানে ঘুরলে প্রকৃতি-প্রাচীন স্থাপনা, নদী-খালবিল, সমুদ্র বন্দর সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায়। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে পর্যটন শিল্পে এ জেলার অপার সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিনেও নিশ্চিত করা যায়নি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে বিশ্ব ঐতিহ্যে জায়গা করে নেয়া মসজিদের এ নগরী। শহরটিতে ট্যুরিস্ট বাস, আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেলের ব্যাপক সংকট রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে নানা সংকটে দিন দিন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে সম্ভাবনাময় এ জেলার পর্যটন শিল্প। এ জেলায় অনেক সময় বিদেশী এবং উচ্চবিত্ত মানুষেরা বাগেরহাটে ভ্রমণে আসে, কিন্তু তাদের চাহিদা অনুযায়ী আবাসিক ব্যবস্থা না থাকায় তারা খুলনা চলে যান। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগও ভেস্তে যাচ্ছে বলে দাবি করে থাকেন অনেকে। যদিও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ষাটগম্বুজের সামনের বিশ্রামাগার নির্মাণকাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ বিশ্রামাগার জেলায় আগত দর্শনার্থীদের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বেসরকারিভাবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি বাগেরহাটে হোটেল-মোটেল নির্মাণ করে তাহলে উদ্যোক্তারা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি স্থানীয়রাও লাভবান হবেন। কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার মান দিন দিন আরো উন্নত হবে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু হওয়ায় বাগেরহাটে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটা সহজ হয়েছে। এখন তাই পুরনো এ শহরকে বিশ্বদরবারে নতুন করে দেখানোর সময় এসেছে। এমতাবস্থায় রাস্তাঘাট, আবাসিক ও খাবার হোটেল, ট্যুরিস্ট পরিবহন, নিরাপদ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ যেমন দরকার তেমনি প্রয়োজন আমাদের মধ্যে সচেতনতা। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারলে বিশ্ব ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া এ শহরকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
মো. শফিকুল আলম, ম্যানেজিং পার্টনার অ্যান্ড সিইও, শফিকুল আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, চেয়ারম্যান, বিজ সলিউশন পিএলসি