বিশ্ব বাস্তবতা

সর্বজনীন ভ্যাকসিন উৎপাদনের শক্তিশালী ব্যবস্থা নেয়া প্রসঙ্গে

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু বৌদ্ধিক সম্পত্তির মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের দাবির অধীনে করোনা টিকার মেধাস্বত্ব ছাড়ের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি স্বাগত পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিও বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ‘কভিড-১৯ মহামারীর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আমাদের অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু বৌদ্ধিক সম্পত্তির মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের দাবির অধীনে করোনা টিকার মেধাস্বত্ব ছাড়ের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি স্বাগত পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিও বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারীর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আমাদের অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়। বাইডেন প্রশাসন বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার সুরক্ষায় পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্বাস করে’—বিষয়টি নিশ্চিতের পাশাপাশি তিনি যোগ করেন, তবে বিদ্যমান মহামারীটি শেষ করার লক্ষ্যে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের বিষয়টিকে সমর্থন করছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সম্ভবত ইউরোপের অন্যান্য ধনী দেশের সমর্থন পাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো এরই মধ্যে বিষয়টিকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।

আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে স্বল্প সময়ে সফলভাবে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে বাধা এবং বিতরণ সম্পর্কিত অসমতার কারণে এটি কলঙ্কিত হয়েছে। মে পর্যন্ত, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতাংশও টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণে সমর্থ হয়নি। অথচ বিশ্বের ১০টি ধনী দেশের ৮০ শতাংশ জনসংখ্যারই টিকা প্রদান সম্পন্ন। বৈষম্যের কারণ শুধু এই নয় যে ধনী দেশগুলো উৎপাদিত সব ভ্যাকসিন ক্রয় তা মজুদ করে বসে আসে, বরং প্রয়োজনমাফিক ভ্যাকসিন উৎপাদনের বিষয়টিতেও তারা ভেটো দিচ্ছে।

তাই বলব টিকার সংকট মূলত কৃত্রিম। কেননা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছে টিকার প্রযুক্তি, অভিজ্ঞান উৎপাদনের বিষয়গুলো এখনো সীমাবদ্ধ। তাছাড়া অনুমোদিত ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো জনভর্তুকি জন অর্থায়িত গবেষণা থেকে উপকৃত হলেও তারা একচেটিয়াত্ব বজায় রাখতে পেটেন্ট সুরক্ষার সুযোগ নিয়েছে, নিজস্ব কারখানার মধ্যে উৎপাদন সীমিত রাখছে এবং নির্বাচিত কয়েকটি মাত্র সংস্থাকে লাইসেন্স দিয়েছে। তবে পেটেন্টগুলো আন্তর্জাতিকভাবে বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকারবিষয়ক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য চুক্তি টিআরআইপিএসের (ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) মাধ্যমে সংরক্ষিত প্রবর্তিত; যা সরবরাহকারী দেশগুলো অর্থাৎ যারা বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্স সরবরাহ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং পেটেন্ট মালিকের সম্মতি ছাড়াই অন্য দেশকে ওই পেটেন্টকৃত পণ্যটি উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতের অনুমতি দেয়। বিষয়টি কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত উন্নত দেশগুলোর আইনি পদক্ষেপের বিপরীতে হুমকিস্বরূপ; বিশেষ করে যারা কভিডের ওষুধ, টিকা, রোগ নির্ণয়সহ মহামারী মোকাবেলার ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বের অস্থায়ী ছাড়ের প্রস্তাব রাখছে। আর সামান্য পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার  টিআরআইপিএস কাউন্সিলে আটকে আছে। কারণ বেশির ভাগ উন্নত দেশই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বকে উপেক্ষা করে বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে মনোযোগী।

এখানে মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের প্রসঙ্গটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা ভারতে ভাইরাসটির তাণ্ডবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রাণহানির ঘটনা থামছে না। আরো ভয়াবহ দিকটি হলো, ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিকাশ হয়েছে বিপজ্জনক আরো নতুন ভ্যারিয়েন্টের। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন প্রতিরোধী নতুন ভ্যারিয়েন্ট বিকাশের আগেই আমাদের যতটা সম্ভব সবাইকে টিকার আওতায় আনাটা জরুরি।

সাময়িকভাবে বৌদ্ধিক সম্পত্তির মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তবে যা কেবলই একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। কেননা মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের চুক্তিটিকে পরবর্তী ধাপের জটিল আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব একটি সর্বজনীন ভ্যাকসিন ব্যবস্থা সবার জন্য উপলভ্য করার লক্ষ্যে মুহূর্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।

এর পরের ধাপটি হচ্ছে ভ্যাকসিনের প্রযুক্তি অভিজ্ঞান সরবরাহের জন্য চাপ প্রয়োগ করা। কানাডা থেকে শুরু করে বাংলাদেশভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও তাদের অনুমোদন প্রদান প্রযুক্তি জ্ঞান সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিও টিকা উৎপাদনের অভিজ্ঞান প্রযুক্তি সরবরাহবিষয়ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ কভিড-১৯ টেকনোলজি অ্যাকসেস পুলে (সি-ট্যাপ) যোগদান করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশের সরকার যেহেতু অনুমোদিত ভ্যাকসিনগুলো বিকাশের জন্য কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের অনুদান দিয়েছে, তাই জনগণের অর্থ থেকে প্রদত্ত অনুদানের বিপরীতে তারা কিন্তু কোম্পানিগুলোকে ভ্যাকসিনের প্রযুক্তি অভিজ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার বিষয়ে চাপ দিতে পারে এবং তা উচিতও।

আমরা জানি, এটা করা সম্ভব। কারণ বাইডেন প্রশাসন এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানিকে মার্ক অ্যান্ড কোংয়ের সঙ্গে তাদের এক ডোজের ভ্যাকসিন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য রাজি করিয়েছে। তাই অবশ্যই অন্য যেসব কোম্পানি জন অর্থায়নের সুবিধা পেয়েছে, তাদেরও সারা বিশ্বের উৎপাদকদের সঙ্গে একই কাজ করার জন্য চাপ দেয়া যেতে পারে।

আর ততক্ষণে মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের মাধ্যমে অন্যান্য উপায়ে ভ্যাকসিনের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। মডার্না যেমন প্রায় সম্পূর্ণভাবেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। কোম্পানিটি এরই মধ্যে তাদের মেধাস্বত্ব ছাড়ের বিষয়ে ঘোষণাও দিয়েছে। তবে তাদের এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরিতে এমন কিছু জ্ঞান ব্যবহার করা হয়েছে, যা তারা অন্য একটি সংস্থার কাছ থেকে অর্থ প্রদান সাপেক্ষে অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই অন্য কেউ যদি তাদের ভ্যাকসিনটি উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়, সেক্ষেত্রে অনুমতি প্রদানকারী কোম্পানিটি নতুন উৎপাদনকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। বিশ্বব্যাপী টিকার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এখানে মামলার বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে টিআরআইপিএস। মডার্নার তরফ থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ তারা এককভাবে তিন বিলিয়ন টিকা উৎপাদন করতে পারবে। বেশি পরিমাণ উৎপাদনের জন্য এমআরএনএ ভ্যাকসিনগুলো দৃশ্যত যথেষ্ট উপযুক্ত। তাছাড়া এটাও বলা হচ্ছে, নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিপরীতেও টিকাগুলো অনেকটাই কার্যকর। 

এখন -জাতীয় ভ্যাকসিনের অবাধ উৎপাদনের বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শক সংস্থা পিআরইপিফোরএএলএল উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তার প্রত্যেকটি দিন কভিড-বিষয়ক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার পেছনে খরচ না করে তারা বরং এমআরএনএ ভ্যাকসিনের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিপূর্বক এক বছরের জন্য বিশ্বের সব মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় কীভাবে আনা যায়, সে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। যেখানে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিনের মূল্য মাত্র ডলার।

সর্বজনীন ভ্যাকসিন উৎপাদনের বিষয়টি তখনই আরো জোরালো হবে যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব, বেসরকারি ভ্যাকসিন উৎপাদকরা বিদ্যমান বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের বিপরীতে আর্থিকভাবে একদমই ক্ষতিগ্রস্ত হতে উৎসাহী নয়। তবে মহামারীটি একবার নিয়ন্ত্রণে চলে এলে স্বাভাবিকভাবে ভ্যাকসিনের চাহিদা কমে একটি স্বাভাবিক স্তরে ফিরে যেতে পারে। ততক্ষণে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে আমাদের অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশকেও সর্বজনীন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কভিড-১৯-কে আমরা যখন কাবু করে ফেলতে সক্ষম হব, তখন এসব সক্ষমতাকে ভবিষ্যৎ মহামারী প্রতিরোধের কাজে লাগাতে হবে।

মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব প্রত্যাহার এবং টিকা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান প্রযুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আরো শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণের বড় প্রয়োজন এখন। তাছাড়া ভবিষ্যতে সমান বিপরীত অবস্থার জন্যও আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু জরুরি। যে অভিজ্ঞানের ওপর আমাদের স্বাস্থ্য সমৃদ্ধি নির্ভরশীল, তা অবশ্যই জন অর্থায়িত এবং সবার জন্য উন্মুক্ত হতে হবে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

জয়তী ঘোষ: নির্বাহী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থনীতি

অর্থনীতির অধ্যাপক, ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট ইউনিভার্সিটি

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও