জ্বালানি

জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট উত্তরণে প্রয়োজন জ্বালানি রূপান্তর

ক্রমেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট প্রকট হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায়, শিল্প খাতের মালিকরা পূর্ববর্তী দুই-তিন বছরের মতো ২০২৫ সালেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ক্রমেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট প্রকট হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায়, শিল্প খাতের মালিকরা পূর্ববর্তী দুই-তিন বছরের মতো ২০২৫ সালেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার ভর্তুকির চাপ সামলানো সরকারের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও প্রতি বছরের শুরুতে এবং বাজেট ঘোষণার আগে জ্বালানি রূপান্তরে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং খরচ কমাতে নানা উদ্যোগের কথা আলোচনায় আসে, গতানুগতিকের বাইরে খুব বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার পরিবর্তে আমদানি শুল্ক, জ্বালানি রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করছে। সংকট উত্তরণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করেই জ্বালানি রূপান্তরের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

চেনা সমস্যাগুলো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে: জানুয়ারি এলেই আশঙ্কা তৈরি হয় গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ থাকবে কিনা। প্রতি বছরই সরকার প্রথমে পর্যাপ্ত ডলার ছাড়ে উদ্যোগ নেয়, যাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বকেয়া শোধ করে কোনোভাবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়। তথাপি পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ অনেকাংশেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার যেহেতু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, প্রতি বছর বাজেট-পূর্ববর্তী সময়ে গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন অংশীজন জোরেশোরে দাবি তোলেন। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন খুব একটা হয় না। ফলে খরুচে এলএনজিতে নির্ভরশীলতা বেড়েছে, যা সরকারকে বাধ্য করেছে শিল্প খাতে জ্বালানির মূল্য বাড়াতে।

জ্বালানি খাতে প্রত্যাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে গত দেড় বছরে নতুন কোনো ইউটিলিটি-স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প পাইপলাইনে সংযুক্ত হয়নি বলা চলে। তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যেখানে দ্রুততার সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারত, সেখানেও অস্বাভাবিক রকমের ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই বহুদিন ধরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রাংশে আমদানি শুল্ক মওকুফ করতে দাবি জানিয়ে আসছেন। বাস্তবতা হলো, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানি করতে এখনো ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা ১ শতাংশ শুল্ক দিয়ে এ ধরনের প্রকল্পে যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারলেও অন্যান্য শিল্প-কারখানা কিংবা ভবন এ ধরনের সুবিধা পায় না। বাড়তি এ খরচ খাতটিতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

আবার জ্বালানি সাশ্রয়ী এলইডি বাতির যন্ত্রাংশ এবং ইনভার্টার যুক্ত কম্প্রেসরের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক, জ্বালানি দক্ষ বাতি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রূপান্তরবিহীন জ্বালানি খাতে বাড়ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি: একটি উপযুক্ত রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সফল না হওয়ায় মাত্রাতিরিক্তভাবে আমদানিনির্ভরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়েছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভরতা ৪০-৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রাথমিক জ্বালানির (বাণিজ্যিক) আমদানি প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব বিভিন্ন খাতের ওপর পড়ে। শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় জানুয়ারি ২০২৩ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত শিল্পে গ্যাসের মূল্য ২৩৪-২৭১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। আর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৬২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাসের মূল্য প্রতি ঘনমিটার ১৪ টাকা ৭৫ পয়সা হওয়ায় আগামী দিনে যে এর মূল্য সমন্বয় করা হবে—এমনটি ধারণা করা যায়। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে বিদ্যুৎ খাতে। মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিদ্যুৎ খাতের রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে।

প্রয়োজন জ্বালানি রূপান্তরে সুদৃষ্টি: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না—এমন অনুমান বেশ কয়েক বছর আগেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের যে ভর্তুকি ছিল ৭ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকায়। তার পরও গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। লক্ষণীয় এ সময়ে বেশ কয়েকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও রাজস্ব ঘাটতি আরো দ্রুত বেড়েছে। কাজেই শুধু মূল্য সমন্বয় আমাদের সমাধান দেবে না। বরং জ্বালানি রূপান্তরে দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। দেশের বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের প্যাটার্ন বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবায়নযোগ্য টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-জ্বালানির পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

এ রূপান্তরে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন—নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে গ্রিডের আধুনিকায়ন, গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর শিল্প খাতের নির্ভরশীলতা বাড়ানো, খরুচে এলএনজিতে নির্ভরশীলতা নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে লস কমাতে হবে। সর্বোপরি জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে হবে। যদিও আইইইএফএর গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে, এখনো জ্বালানি সাশ্রয়ের অনেক সুযোগ রয়ে গেছে। মনে রাখা প্রয়োজন, যে দেশগুলো শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা সবাই জ্বালানি দক্ষতায় বেশ গুরুত্ব দিয়েছে।

জ্বালানি রূপান্তরবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে

জ্বালানি রূপান্তরে পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে তা বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ খাতে যখন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ও লোকসানসহ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে, তখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ থেকে বার্ষিক অল্প কয়েক কোটি টাকা আমদানি শুল্ক নেয়া খুব বেশি লাভজনক নয়। বরং শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে দ্রুত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ কমানো যাবে। উদাহরণস্বরূপ এক মেগাওয়াট সক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত আমদানি শুল্কের চেয়ে বার্ষিক সাশ্রয়কৃত জ্বালানি তেলের আর্থিক মূল্য বেশি। লক্ষণীয় হলো সরকার আমদানি শুল্ক একবার পেলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জ্বালানি তেল সাশ্রয় করবে ২০-২৫ বছর। তেমনি জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতি থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধা তাদের জীবদ্দশাজুড়েই পাওয়া যাবে। কাজেই জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হলে জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতিতে জ্বালানি অদক্ষ যন্ত্রপাতির তুলনায় আমদানি শুল্ক কমানো উচিত। একইভাবে গ্রিড আধুনিকায়নে এবং এলএনজি আমদানি কমাতে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনে সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকার আগ্রহী হলে আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি সম্প্রতি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাছাইকৃত সৌরবিদ্যুতের যে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেয়া হলো, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কিছুটা আস্থা ফিরে আসতে পারে।

সময় এখন প্রমাণভিত্তিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক এমন একটি জ্বালানি রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়ার। এক্ষেত্রে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা প্রয়োজন। তবে এ রূপান্তরে সময়ক্ষেপণ করলে আগামী বছরগুলোয় ব্যয়বহুল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে আরো বেশি ভোগাবে।

শফিকুল আলম: ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত

আরও