বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভারত এগিয়ে আসেনি

বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছয় বছর জেলে ছিলেন। চিকিৎসার অভাবে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। তারেক রহমান সাহেব দেশের বাইরে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী। ছিলেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ফেডারেশন অব সাউথ এশিয়ান এক্সচেঞ্জেসের প্রথম প্রেসিডেন্ট। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারসহ নানা ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন

আপনি বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়াদি দেখেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো কী?

বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছয় বছর জেলে ছিলেন। চিকিৎসার অভাবে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। তারেক রহমান সাহেব দেশের বাইরে। বহু বছর তার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মী মিথ্যা মামলার শিকার। এছাড়া হাজার হাজার কর্মী গুম ও খুন হয়েছেন। বিএনপির হাজার হাজার কর্মী পুলিশের কাস্টডিতে সাফার করেছেন, পঙ্গু হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, জেলখানায় চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। এ ত্যাগগুলো স্বীকার করেছে সম্মিলিতভাবে পুরো জাতি। শেখ হাসিনাকেও বিদায় করেছি আমরা সবাই মিলে। এখানে কোনো বিদেশী শক্তির অবদান নেই। এটি বাংলাদেশের গণমানুষ করেছে। এটি বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষকে একটা শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ থাকতে হবে এবং পরস্পরের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে। বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ আমাদের কাম্য নয়। অন্য দেশের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছাও আমাদের নেই। এ তিন বিষয়ের ভিত্তিতে অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ভারত হোক বা যুক্তরাষ্ট্রই হোক, সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক চিন্তা হতে হবে।

কেউ কেউ বলছেন অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে আছে, আপনার কি মনে হয়?

বর্তমান সরকার কোন দেশের দিকে ঝুঁকে আছে, সেটি অন্যরা ভালো বলতে পারবে। পারস্পরিক সম্মানবোধ, পারস্পরিক স্বার্থ সুরক্ষা ও একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা—এ তিন ভিত্তির ওপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত। বিএনপিও এমন নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর কথা বলে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আসলে কোনদিকে যাচ্ছে বলে আপনার মত?

ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী হলেও তাদের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট করে কোনো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, এমন নয়। তবে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা আমাদের জন্য সবদিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আমাদের সুসম্পর্ক থাকাটা জরুরি। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশসহ অন্য দেশের সঙ্গেও বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ক্ষেত্র বিবেচনায় আমাদের সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আগেও যেমনটা বলেছি, সম্পর্ক হতে হবে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ, স্বার্থ সংরক্ষণ এবং কোনো রকম অযাচিত হস্তক্ষেপহীন।

বিএনপির সঙ্গে ভারতের একটা দূরত্বের কথা শোনা যায়। বিশেষ করে দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা। অন্যদিকে আবার বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে?

ভারত যদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ব্যক্তি বা কোনো একটি দলকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় রাখতে চায় এবং এটিকেই যদি ভালো মনে করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, তাহলে আমি মনে করি না বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নতির কোনো সুযোগ রয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্রসহ আরো অনেক কথা বলে যদি একে অন্যকে দোষারোপ করা হয়, বিগত দিনের মনোমালিন্য বয়ে বেড়ানো হয়, তবে সম্পর্ক উন্নয়ন বেশ কঠিন হবে। এখন বাংলাদেশকে বলতে হবে যে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামে লোকজনকে অস্ত্র দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে, অনুপ্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয় আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বহুদিন ধরে বৈদেশিক বাণিজ্যে শুল্ক অ-শুল্ক (ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ) প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। তারা আমাদের ন্যায্য পানির হিস্যা দিচ্ছে না। সীমান্তে আমাদের মানুষকে তারা গুলি করে মারছে। ভারতের বিরুদ্ধে এ রকম এন্তার অভিযোগ করা যাবে। ভারতও হয়তো তাদের কথা বলবে। কিন্তু সম্পর্কের উন্নতি করতে চাইলে ওই তিনটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। সুসম্পর্ক যদি করতে হয়, পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সম্মানবোধ অপরিহার্য। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটা দেশ যদি অন্য একটা দেশের নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে মেরে ফেলে, এটাকে কোনোভাবেই সম্মান প্রদর্শন করা বলে না। বিশ্বের কোন জায়গায় এমনটা দেখা যায়? একটা দেশের নাগরিককে গুলি করে মেরে ফেললে তার জবাবদিহিতা তো থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরস্পরের স্বার্থের বিষয়টি থাকতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপন হলেও হিসাব করে দেখতে হবে, আমরা এখানে কতটুকু লাভবান হচ্ছি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শুধু ভারত লাভবান হবে, বাংলাদেশের লাভ হবে না—এটা হওয়া যাবে না। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ওই তিন বিষয় মাথায় রাখা লাগবে। পরস্পরের স্বার্থ সংরক্ষণ, সম্মানবোধ এবং হস্তক্ষেপ না করা। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই ব্যবসা-বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা আশা করেছিলাম ভারত একটা ভূমিকা রাখবে। পশ্চিমা দেশগুলো ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, আইনের শাসনের জন্য। কিন্তু ভারত সেখানে এগিয়ে আসেনি। তাই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় বিবেচনা করার আছে। যেমন সর্বজনীন মানবাধিকারের বিষয়গুলো। এটা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। তার পরও সেখানে ভারত এগিয়ে আসেনি। কেন এগিয়ে এল না? জাতিসংঘের ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস প্রত্যেক দেশের জন্য প্রযোজ্য। এখানে পশ্চিমা দেশগুলো এগিয়ে আসছে, ভারত এগিয়ে আসেনি। এটা বিএনপির ভাবার বিষয় নয়। এটা বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার বিষয়। মানুষের মনে এ প্রশ্ন জেগেছে। বিএনপির মনে এ প্রশ্ন জাগেনি।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ভারতের অবস্থানকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা গোষ্ঠী কিছু ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে এবং নিরাপত্তা ইস্যু সামনে আনার চেষ্টা করে তারা। মৌলবাদীরা সব নিয়ে গেল—এ রকম একটি বয়ান আনতে চায় তারা। কেবল আওয়ামী লীগের হাতেই ভারতের স্বার্থ নিরাপদ বলে মনে করে তারা। এই ন্যারেটিভেরই পুনরাবৃত্তি করে আসছে। নয়াদিল্লি যদি এই ইকোসিস্টেম থেকে বের হতে না পারে, আমি মনে করি, তাহলে স্বাভাবিক সম্পর্ক খুবই ডিফিকাল্ট হবে।

দেশ থেকে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বেশকিছু রাষ্ট্র আশ্রয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে বলে জানা যাচ্ছে। ভারতে তাকে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

শেখ পরিবার ও আওয়ামী লীগের হাতে নয়াদিল্লির স্বার্থ নিরাপদ। তারা এখনো ওই ন্যারেটিভেই আস্থা রাখছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যদি এখনো সে জায়গায় থাকে তাহলে সেটা কোনো সম্পর্কই না। এটা হচ্ছে একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট, রিলেশনশিপ নয়। আমি তো রিলেশনশিপের কথা বলছি, এখন তারা (ভারত) যদি অ্যারেঞ্জমেন্টের কথা বলে তাহলে তো রিলেশনশিপের বিষয় আলোচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গে অ্যারেঞ্জমেন্ট রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে রিলেশনশিপ সম্ভব নয়। ১৫ বছর শেখ হাসিনার সঙ্গে অ্যারেঞ্জমেন্টেই ছিল ভারত। বাংলাদেশের জনগণ সেটাই মনে করে। আমি কী বলেছি সেটি বড় কথা নয়, বাংলাদেশের জনগণ কী ভাবছে সেটিই বড় কথা।

গত ১৫ বছরে মূলধারার রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার ব্যবসায়ীদের সংসদ তথা সরকারে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য কমানোর ব্যাপারে বিএনপির ভাবনা কী?

সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিক্য অবশ্যই কনসার্নের বিষয়। সংসদ হচ্ছে একটা প্রতিনিধিত্বশীল জায়গা। বাংলাদেশের সব ধরনের মানুষের একটা সঠিক প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত সংসদে। এখন কোনো ব্যবসায়ী যদি তার ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনীতি করতে আসেন, তিনি তো আর রাজনীতিবিদ হতে পারবেন না। সেখানেই আমাদের সমস্যা হয়ে গেছে। গত ১৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী সংসদে গিয়েছেন, তাদের একটা বড় অংশই রাজনীতি করতে আসেননি, তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এসেছেন। বাংলাদেশে একটা অলিগার্কিক সিস্টেম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এই অলিগার্করা শুধু ব্যবসায়ই নিয়ন্ত্রণ করেনি, রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে এরা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এমন স্বৈরাচার তৈরি করেছে যে তারা বাংলাদেশের মানুষকে গুম, খুন করেও ক্ষমতায় থাকতে চায়। এদের স্বার্থ চলে গেছে জনগণের ওপরে। এটা ব্রেকিং পয়েন্ট। এমনটা হতে দেয়া যাবে না। জনগণকে সেবা করতে আসছেন আপনি রাজনীতিতে। সেটির বাইরে কোনো কিছু করতে দেয়া যাবে না।

শেখ হাসিনা পালানোর পর বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা অনেকেই কিন্তু অনুধাবন করতে পারছেন না। তাদের আকাঙ্ক্ষা, তাদের ভাবনা, তাদের চিন্তা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গেছে। রাজনীতিবিদরা যদি সেটি বুঝতে না পারেন, তাদের আচার-আচরণে, রাজনীতিতে, চিন্তায়, পলিসিতে যদি সেটার প্রতিফলন না ঘটে, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। শুধু রাজনীতিবিদ নয়, আমি বলব ব্যবসায়ী, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, সরকারি কর্মকর্তা সবাইকে জাগতে হবে। গত ১৫ বছরে অনেকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। জন আকাঙ্ক্ষার কাছে সবাইকে আসতে হবে। আমি এবং আমার দল এটার সঙ্গে পুরোপুরিভাবে, দর্শনের দিক থেকে বলেন, চিন্তার দিক থেকে বলেন, আমরা পুরোপুরিভাবে অনুধাবন করে বিএনপিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তারেক রহমান সাহেব সেই দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

সুশাসনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়েই কি বিএনপি সামনের দিকে এগোবে?

গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটটা ধারণ করতে হবে। জনগণ তো বাংলাদেশের মালিক। তার মালিকানা ফিরিয়ে দিতেই তো এত বছর বক্তৃতা করেছি। এখন বক্তৃতায় বললে তো হবে না, সেই কাজগুলোও আমাদের করতে হবে।

আরও