বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণায় শোনা যায় দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান আর বেকারত্ব নিরসনকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থ পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যা জনগণের পিছু ছাড়ে না। যেহেতু পৃথিবীব্যাপী এ সমস্যা বিরাজমান তাই মুক্তিও সহজ নয়। একমাত্র দেশের জনগণকে নিয়ে যদি পরিকল্পনা করা যায় তাহলে সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে এগিয়ে যাওয়ার পথ পাওয়া যেতে পারে বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে একমাত্র দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করেই দেশের ১৭ কোটি মানুষের ৩৪ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করা যাবে।
সত্যি কথা বলতে দেশে প্রাথমিকভাবেই মানবসম্পদ পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল যা জনগণের প্রতিনিধিরা একবারও মনে করেনি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়েছে, অদ্যাবধি দেশের মানবসম্পদ পরিকল্পনা না করার ফলে সাধারণ মানুষ জানে না কোন পেশার কতজন মানুষ প্রয়োজন। পরিকল্পনাহীনতার ফলে যার যা ইচ্ছা, যার যেমন ভাবনা সেভাবেই মানবসম্পদ তৈরি চলমান। দায়িত্বপ্রাপ্তরা জনগণের সামনেই ঘোষণা দেয় দেশ বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হচ্ছে। অথচ সেই কারখানা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেই বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা সদাতৎপর। তাই অবিলম্বে মানবসম্পদ পরিকল্পনা করে জনশক্তি তৈরির ব্যবস্থাপনাটা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। জনকল্যাণের সদিচ্ছা নিয়ে সরকার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় স্থাপনে উদ্যোগী হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা জনগণকে অভিজাত চিকিৎসক দিয়ে সেবা করাতে গিয়ে এলএমএফ কোর্স বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার বাইরে নিয়ে গেছে। সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছে তার যতটা কাজীর খাতায় আছে তার কত শতাংশ গোয়ালে আছে—এ প্রশ্ন কার কাছে রাখলে উত্তর পাওয়া যাবে কেউ বলতে পারে না। দেশে চিকিৎসকস্বল্পতা বিবেচনা করে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় ঠিকই কিন্তু জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরো যে বিভিন্ন শ্রেণীর জনশক্তির প্রয়োজন পড়ে সে কথা কেউ মনেও করে না। একজন চিকিৎসকের বিপরীতে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে ন্যূনতম পাঁচজন নার্সের প্রয়োজন যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আর সহকারী তো তারও পাঁচ গুণ লাগে। কিন্তু দেশে এখন দুজন নার্সের বিপরীতে একজন চিকিৎসক সেবা দেন আর সহকারীদের কোনো হিসাব আছে বলে শোনা যায় না। মানবসম্পদ পরিকল্পনা না করে স্বপ্নের সেবা চালু রাখতে গিয়ে বিচিত্র এক হ-য-ব-র-ল জনশক্তি তৈরি কার্যক্রম চলমান। এতে করে চিকিৎসাসেবা দেশে সোনার হরিণ। স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রকৌশল ক্ষেত্রেও জনশক্তি তৈরির পিরামিড কিছুটা আছে কিন্তু তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জনশক্তি পরিকল্পনা ভাবনার অনুরূপ নয়। ফলে শিক্ষানুযায়ী কর্মের কোনো সুযোগ এখানে নেই। দেশের পিরামিডের মাথায় থাকা ডিগ্রি প্রকৌশলীদের কাজ বিদেশীদের সহায়তার করে এনে ডিগ্রি প্রকৌশলীদের দিয়ে মধ্যম স্তরের জনশক্তির জন্য নির্ধারিত কাজ করানো হয়ে থাকে। এ যেন অনেকটা বিমান চালানার জন্য পাইলট তৈরি করে বাসচালকের দায়িত্ব পালন করানোর মতো অবস্থা। মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাবে সৃষ্ট নিদর্শনগুলো সারা দেশেই এভাবে প্রকাশ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
তাকাই শিক্ষা কাঠামোর দিকে। শিক্ষাসংশ্লিস্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিদেশ সফর করে এবং স্বপ্ন দেখে তার ভিত্তিতেই দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটা পরিচালনা করছেন। ফলে স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করে এসেও যদি কেউ বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়ে জনকল্যাণের জনশক্তি তৈরি সম্ভব হচ্ছে না তাহলে কি খুব অবাক হতে হবে? কারণ আমাদের দেশে পুরা জনশক্তি তৈরির কাঠামোটাই উল্টো পুরাণের যুগে রয়ে গেছে। আমরা হয়তো ভুলেই গেছি, আমাদের পুরা শিক্ষা ব্যবস্থাটাই বেসরকারি উদ্যোগের ওপর দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে পরে তা সরকারীকরণ হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নমুনা বিরল। সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক তবে তার বৃহদাংশই বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিজ্ঞজনদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট পূরণ করে না। তার পরও যদি এসব জনশক্তি দিয়ে জনকল্যাণ ও সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো তাহলেও সাধারণ জনগণ বিষয়টা অন্যভাবে ভাবতে পারত কিন্তু তা কি হচ্ছে? সব শিক্ষার্থী গবেষণা করবে, সব শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে তা কোনো শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। সে কারণেই দেশে চলমান শিক্ষানীতিতে গবেষণা ও শিক্ষকতা ছাড়া আর সব চাকরির জন্য স্নাতককে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা আছে কিন্তু আমাদের অভিভাবক সন্তানদের বেকার বাড়িতে বসে থাকা পছন্দ করেন না বলে বাধ্য হয়ে নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে রেখে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যায়। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেয়ার আগে থামার কোনো সুযোগ নেই। আর তাই দেশের শিক্ষা নব্যবস্থা আমাদের অভিভাবকদের এই মানসিকতাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরে ফেলছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই এরই মধ্যে সনদ বিক্রির কারখানা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি বেসরকারি পলিটেকনিক স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যেখানে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য যে নিয়ম-নীতি মানতে হয় তার কানাকড়িও মানতে হয় না। সরকার নিজে যেখানে সরকারি পলিটেকনিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্যবহারিক কাজের মালামাল, শিক্ষক, পাঠাগারে বই সরবরাহ করতে পারে না সেখানে বেসরকারি পলিটেকনিকগুলো ঢালতলোয়ারবিহীন হয়ে সনদ বিক্রির কারখানা হবে না তো কি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে দেশ ও জাতিকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে? সরকার বয়সের বার তুলে দিয়ে, জিপিএ কমিয়ে দক্ষতা অর্জনকে অবাদ করার কথা বলছে, কিন্তু এসব ব্যবস্থাই ব্যবসায়ীদের জন্য স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে।
দেশে প্রতি বছর যে সংখ্যায় তরুণ প্রজন্ম চাকরির বাজারে আসে তার অর্ধেকের বেশি বেকার থেকে যায়। বেকারত্ব নিরসনে মানুষ পাগলের মতো বিদেশে ছুটতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হোঁচট খাচ্ছে। কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় সাগর পাড়ি দিচ্ছে, কেউ বিমানের ল্যাগেজের মধ্যে উঠে বসছে, কেউ দালালের পাল্লায় পড়ে বনজঙ্গলে ঘুরে বেডাচ্ছে আর না হলে ব্যবসায়ীদের পাতা ফাঁদে মাথা দিয়ে জবাই হয়ে যাচ্ছে। অথচ কারো ভাবনার মধ্যেই নেই এ মানুষগুলো সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বিদেশ যেতে পারলে তাদের কর্মসংস্থান হবে, দেশের বেকারত্ব নিরসন হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শুধু এই শ্রেণীর মানুষগুলোই একমাত্র দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায় যা আমাদের রিজার্ভকে স্ফীত করে।
দেশের সর্বত্র আজ ব্যবসায়িক মানসিকতার উন্মেষ ঘটানোর যে প্রক্রিয়া চলমান সেখানে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, দায়বদ্ধতার আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করা ভিন্ন আর কি? তরুণ সমাজের মধ্যে আজ বেকারত্ব নিরসনের দাবিতে আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সিংহভাগ ব্যবসায়ীনির্ভর সরকার এ ব্যাপারে নীরব থেকে ব্যবসার পথ সুগম করে দেয়। সরকার খুব ভালো করেই জানে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষের যত কষ্টই হোক না কেন, এরা বিদেশে গিয়ে যে কাজই করুক তা থেকে যে রোজগার হবে তার সিংহভাগ তারা পরিবারের নামে দেশে পাঠাবেই। সরকারের চাওয়া তো এই সামান্যই। দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে বেশি আয় করার চেয়ে বেশি জনবল পাঠিয়ে বেকারত্বের পরিসংখ্যানের উন্নয়ন। আর তাই এইরূপ অদক্ষ প্রান্তিক জনগণকেই সরকারের অনেক অনেক বেশি প্রয়োজন।
দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বেকারত্বের অভিশাপ মুক্তি জরুরি। অনেকে বলে থাকেন সবাই চাকরি করতে পারবে এটা আশা না করে বরং চেষ্টা করা প্রয়োজন উদ্যোক্তা হওয়া। কিন্তু উদ্যোক্তা হতে গেলে যে পরিকাঠামো দরকার তার কোনো সুব্যবস্থা দেশে দেখতে পাওয়া যায় না। তাই অনক্ষর অনভিজ্ঞ মানুষগুলো প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনা না করেই একটা কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারপর কয়েক দিন পর সব শেষ করে হাতে ভিক্ষা পাত্র তুলে নেয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যা স্বাক্ষর মানুষগুলো নিয়ে, তারা না পায় চাকরি, না পারে কোনো ব্যবসার পুঁজি জোগাড় করতে, না পারে ভিক্ষা করতে। তাদের মধ্যে এমন কোনো দক্ষতাও নেই যা তাকে হাতে-কলমে কাজ করতে উৎসাহিত করবে। এই মানুষগুলোর জন্য প্রকৃত বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষার দরকার যে দক্ষতা কাগুজে বাঘ হবে না। সাধারণ জনগণের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করেও সেই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলো না। দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদ অভিধায় ভূষিত করে আর লোকসানের নামে একটার পর একটা ভারী বৃহৎ শিল্প বন্ধ করে দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ ও ট্রেডিং ব্যবসার দুয়ার খুলে আর যাই হোক বেকারত্ব নিরসন হবে না তা দিনে দিনে পরিষ্কার। তাই প্রথমে মানবসম্পদ পরিকল্পনা করে তারপর কোনো বিষয়ে কত জনবল প্রয়োজন তা নিশ্চিত হয়ে অন্য সব পরিকল্পনা করলে সাফল্য আসবে। নতুন বাজেট সমাগত প্রায়। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান আর বেকারত্ব নিরসনকে গুরুত্ব দিয়ে স্বপ্নের যে অর্থ পরিকল্পনা দেশের মানুষ কামনা করে, তার স্বপ্নযাত্রা না হয় এবারের বাজেট থেকেই হোক।
এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি,
ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)