আলোচনা সভা পারস্পরিক মতবিনিময়ের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। তবে আলোচনা থেকে যদি আমরা এক-দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিই এবং ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করি, তাহলে সেটি হবে প্রকৃত অর্জন। আমাদের অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু সেগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আমি মূলত কয়েকটি খাতের সঙ্গে যুক্ত—বিশেষ করে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংক ও আবাসন খাত। তাই এসব খাতের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে চাই।
আমার প্রাথমিক উদ্বেগ বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এটি দেশের জন্য বড় উদ্বেগের। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ তরুণ; জনসংখ্যার মধ্যম বয়স ২৭ বছর। এ জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে না পারলে তা ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আমরা যখন নীতি প্রণয়ন, সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করি, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু ও ভবিষ্যতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এজন্য কপ৩১-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের দৃঢ় অবস্থান থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ ও দৃঢ় আলোচক প্রয়োজন, যারা দেশের স্বার্থে কার্যকর দরকষাকষি করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশ নেয়ার আগে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৮-৯ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি, অথচ বৈশ্বিক দূষণ ও কার্বন নিঃসরণের দায় খুবই সামান্য। ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়া চাই।
সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি সম্মেলনে নেপালের তরুণ প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছেন এবং বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, তা থেকে আমাদেরও শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তি তুলে ধরতে হবে, জোরালোভাবে দরকষাকষি করতে হবে এবং ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ন্যায্য অংশ আদায় করতে হবে।
এবার উৎপাদন খাতের দিকে লক্ষ করা যাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প অনেক অর্জন করেছে। বিশ্বে আমাদের লিড (এলইইডি) প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যা অন্যতম সর্বোচ্চ।
লিড সনদ মূলত পরিবেশবান্ধব ভবন ও স্থাপনার মান যাচাইয়ের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাস্তবতা হচ্ছে, এ সনদ অর্জনের জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ করলেও ক্রেতারা সাধারণত এর জন্য আলাদা করে বাড়তি মূল্য দিচ্ছেন না। তার পরও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে করছাড়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বর্তমানে ৫০০টির বেশি কারখানা লিড সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং ২৬৫টির বেশি কারখানা এরই মধ্যে এ সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি কারখানা লিড প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত। ফলে সবুজ উদ্যোগ এখন আমাদের শিল্পের পরিচিতি ও ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতেও এটি সহায়ক।
২০১৩ সালের পর অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স এবং বর্তমানে আরএসসির কার্যক্রমের মাধ্যমে কারখানার নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়নে আমরা ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছি। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানার কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব অর্জনকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা। আমাদের সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে বাংলাদেশের এ অগ্রগতির কথা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে হবে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা, যাতে নাইকি, অ্যাডিডাসের মতো ব্র্যান্ডসহ আরো প্রিমিয়াম ক্রেতা এ দেশে উৎপাদনে আগ্রহী হয়। এসব ব্র্যান্ড বাংলাদেশে উৎপাদন না করলেও পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিনিয়োগ ও উদ্যোগের পরও কেন আমরা আরো বেশি প্রিমিয়াম ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে পারছি না? আমাদের কোথায় ঘাটতি রয়েছে? কীভাবে বিনিয়োগের ইতিবাচক সুফল পাওয়া সম্ভব?
প্রতিটি বিনিয়োগেরই প্রত্যাশিত সুফল থাকা প্রয়োজন। আমরা যখন পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণ, সনদ অর্জন ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছি, তখন তার বিনিময়ে বাজার সম্প্রসারণ, ভালো ক্রেতা আকর্ষণ এবং অধিক মূল্য সংযোজনের সুযোগও তৈরি হওয়া উচিত।
তাই উদ্যোক্তাদের প্রতি আমার আহ্বান, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় আরো জোরালোভাবে দরকষাকষি করুন। বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে হবে এবং এ কাজে সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে অর্জনগুলোও তুলে ধরতে হবে। দেশের স্বার্থে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের উৎপাদন কারখানাগুলোয় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আশীর্বাদে পরিণত হচ্ছে। গত ১০ বছরে সৌর প্যানেলের দাম ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। আমি হিসাব করে দেখেছি, আমার কারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৬ সেন্টেরও কম। এটি জাতীয় গ্রিড থেকে কেনা বিদ্যুতের খরচের প্রায় অর্ধেক।
অর্থাৎ সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের পক্ষে পরিবেশগত যুক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। সরকার বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতের ওপর কর কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, এ ধরনের সহায়তা আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইডকল, ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে জিটিএফসহ (গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড) দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া গেলে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ উদ্যোক্তাদের জন্য আরো বাস্তবসম্মত ও লাভজনক হবে।
আমাদের হিগস ইনডেক্সসহ বিভিন্ন পরিমাপ ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে কারখানার পরিবেশগত প্রভাব ও কার্বন নিঃসরণ মূল্যায়ন করা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান কঠোর বিধিবিধান, বিশেষ করে রুলস অব অরিজিন-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হলে আমাদের প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্ব সবাই জানি। নতুন ইলেকট্রনিকসসহ অন্যান্য শিল্প খাতের বিকাশ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে একই সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং এর প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগানোও জরুরি। এ খাতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও কমপ্লায়েন্সে বিনিয়োগ শুধু আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি উন্নত করার জন্য নয়; বরং প্রতিযোগীদের তুলনায় এগিয়ে থাকা এবং বিনিয়োগের যথাযথ সুফল অর্জনের জন্যও প্রয়োজন।
সম্প্রতি অনন্ত গ্রুপ নরসিংদীতে একটি উৎপাদন ইউনিট চালু করছে। এটি একটি বিশেষায়িত সিনথেটিক মিল, যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়ন রয়েছে। এ ধরনের অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে এবং নতুন পণ্যশ্রেণীতে প্রবেশে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করে।
কারখানাটি নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি, পানির পুনর্ব্যবহার এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। কারখানাটির ছাদের আয়তন প্রায় ৬ লাখ বর্গফুটের বেশি। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি পূরণ করা যাবে বলে আমরা আশা করছি।
আমরা এ ধরনের সম্ভাবনা চিহ্নিত করে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের অন্য উদ্যোক্তারাও এসব উদ্যোগকে উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, জ্বালানি সাশ্রয়, পানির পুনর্ব্যবহার ও নতুন পণ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
আবাসন খাতেও আমার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, ২০১৬ সাল থেকে এ খাতের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা। অনন্ত ব্র্যান্ডের অধীনে আমরা একটি গেটেড কমিউনিটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। প্রায় ১৫ একর জমিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিবেশবান্ধব নির্মাণ ও আবাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন মান অনুসরণের চেষ্টা করছি।
প্রকল্পটির ক্ষেত্রে আমরা লিড সনদের জন্য নিবন্ধন করেছি। এটি লিড প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত আবাসন প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ। এর আওতায় বাগান ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের কাজে ব্যবহৃত পানির পুনর্ব্যবহার, পয়োনিষ্কাশনের পানির পুনঃপ্রক্রিয়াজাত এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এমনকি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের বায়ুর মান বা একিউআইও স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।
আবাসন খাতে এ ধরনের উদ্যোগ অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। কারণ আমাদের নগরায়ণের প্রচলিত ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একটি বড় আবাসিক প্লট বা ১০ কাঠা জমিতে এক পরিবারের বসবাসের জন্য নির্মিত বাড়ি ভেঙে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এভাবে এক পরিবারের আবাসস্থলকে বহু পরিবারের আবাসস্থলে রূপান্তর করা হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পরিবেশ, পয়োনিষ্কাশন, পানি ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার উন্নয়ন হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
গুলশান ও বারিধারার মতো এলাকাতেও এখন পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার বা এসটিপি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অথচ অতীতে অপরিকল্পিতভাবে অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোয় প্রয়োজনীয় পরিশোধন ব্যবস্থা নেই। এর ফলে পয়ঃবর্জ্য সরাসরি বারিধারা লেকে গিয়ে পড়ছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যার সমাধানে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। নগর কর্তৃপক্ষের উচিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় উপযুক্ত বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা এবং নিশ্চিত করা যে অপরিশোধিত বর্জ্য কোনোভাবেই জলাশয়ে গিয়ে পড়বে না। বড় প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নাগরিক জীবনের এ মৌলিক প্রয়োজনগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে হবে।
আমাদের শহরের বায়ুমান সূচক বা একিউআই স্কোর অনেক সময় ৪০০ পর্যন্ত উঠে যায়। অথচ ১৫০ ওপরে এ মান গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার নিয়ম রয়েছে বিশ্বে। তাহলে কি এমন পরিস্থিতিতেও আমরা উদ্বিগ্ন নই? আমাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ এবং নিজেদের জীবনযাপনের পরিবেশ নিয়ে কি আমাদের ভাবা উচিত নয়? আমরা যারা এ দেশে বিনিয়োগ করছি, আমাদের এখানেই বসবাস করতে হবে। অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সুযোগ সবার নেই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বেতন দেয়া দায়িত্ব রয়েছে। তাই দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা আমাদের দায়িত্বের অংশ।
আমরা যদি এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে না পারি, যেখানে আমাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে ফিরে এসে গর্বের সঙ্গে বসবাস করতে পারবে, তাহলে সেটি হবে আমাদের দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
তাই আবাসন ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের প্রতি আমার আহ্বান, আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প নির্মাণ করতে হবে। শুধু জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার বা ভবনের সংখ্যা বাড়ানোকে উন্নয়ন হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির পুনর্ব্যবহার, জ্বালানি সাশ্রয় এবং মানুষের সুস্থভাবে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের এমন প্রকল্প নির্মাণ করতে হবে, যা বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনও পূরণ করবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করতে হবে। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
গণপরিবহননির্ভর স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকা শহর প্রতিদিন এখানে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। তাই শহরের ওপর চাপ কমাতে হবে, যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শহরের বাইরে নতুন নগর কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। গণপরিবহনের সঙ্গে সংযুক্ত স্যাটেলাইট সিটি ও পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনন্ত টেরাসের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে শহরের মধ্যে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে রাজস্ব নীতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। গুলশান, বারিধারা ও অন্যান্য অভিজাত এলাকায় পৌরকর তুলনামূলকভাবে কম। লন্ডনসহ বিশ্বের বড় শহরগুলোতে পৌর কর্তৃপক্ষের কর ও চার্জ শহরতলির তুলনায় চার থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। আমাদেরও স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা উচিত, যাতে এলাকার আর্থিক সক্ষমতা ও সেবার প্রয়োজন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা যায়। এ ধরনের উদ্যোগকে আমাদের সামগ্রিক রাজস্ব নীতি ও নগর পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
ব্যাংক খাতের প্রসঙ্গে বলতে চাই, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। ২০৪০ সালের মধ্যে নেট জিরো অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। প্রতি বছর আমরা সাসটেইনেবিলিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করছি, যেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও অগ্রগতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
আমরা এরই মধ্যে আমাদের গ্রাহকদের কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের উদ্যোগ নিয়েছি। যথাযথ মূল্যায়ন ও পরিমাপের মাধ্যমে আমাদের বিনিয়োগের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে কীভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা যায়, সেটিও বিবেচনা করছি।
এক্ষেত্রে কার্বন ক্রেডিট গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে পৃথক কারখানা বা বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। সম্মিলিতভাবে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের উদ্যোগ নেয়া গেলে এর সুফল সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের (জিটিএফ) মতো সুবিধা রয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের কারণে অনেক ব্যাংক এসব অর্থায়ন কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, যাতে অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার থাকা ব্যাংকগুলোও এ ধরনের অর্থায়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ব্যাংক খাতের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রফতানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমদানি কার্যক্রমেও ব্যাংকটির সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে দায়িত্বশীল বিনিয়োগ ও খাতভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর এবং টেকসই শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থা ও শিল্পের উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) গুরুত্বের ওপর জোর দিতে চাই। বিশ্বজুড়ে এআই খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে। আমরা যদি এ প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।
ব্যাংক খাতে আমার অভিজ্ঞতায় একটি বড় সমস্যা হলো, ক্লাউড প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সব ক্ষেত্রে অবাধে এআই ব্যবহার করতে পারছি না। এ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ ব্যাংকিং থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রতিটি খাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আমাদের কারখানাগুলোতেও ব্যাক-অফিসের বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও এআই ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠান ব্যাটারির পাশাপাশি পুরো শহরের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় স্মার্ট প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান দিচ্ছে। আমাদেরও এসব প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিবেচনা করে গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং ভবিষ্যতের চাহিদা আরো কার্যকরভাবে পূরণ করা সম্ভব।
আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এটি নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যায্য প্রত্যাশা। চীন কিংবা ভিয়েতনামের মতো শিল্পোন্নয়নমুখী দেশগুলোতে সরকার শিল্পের জন্য জমি, গ্যাস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, জ্বালানি ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা কর দিই, তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা ও শিল্পায়নের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে জমির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে বড় আকারে জমি সংগ্রহ করা কঠিন। সরকার যদি উপযুক্ত জমি ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়, তাহলে বেসরকারি খাত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারবে। এডিবি ও অন্যান্য উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থা এ ধরনের প্রকল্পে আগ্রহী। তাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
সরকার জমি সরবরাহ বা অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারে, আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে পারে। কৃষিজমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষির স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। উপযুক্ত জমিতে কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সঠিক পরিকল্পনা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি মনে করি। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আশাবাদী। একটি গণতান্ত্রিক সরকার আমাদের নতুন সম্ভাবনার আশা জোগাতে পারে। সরকারে যোগ্য মানুষ রয়েছেন, বেসরকারি খাতে দক্ষ উদ্যোক্তা রয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় একটি দেশ। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার, বেসরকারি খাত, ব্যাংক, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানসহ আরো অনেক কোম্পানি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে চায়। এজন্য পারস্পরিক সহযোগিতা, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ ও বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। আমরা একে অন্যকে সহযোগিতা করলে এবং দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে কাজ করলে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নেয়া সম্ভব।
শরীফ জহীর: চেয়ারম্যান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও অনন্ত গ্রুপ
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]