মশা দমনে ব্যবহৃত কীটনাশকের ক্রিয়াশীল উপাদানের নিরীক্ষা জরুরি

ডেঙ্গু হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত একটি নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিস। অর্থাৎ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যারা বিশ্ব পরিক্রমায় অনুমিত বাসস্থানের সুবিধায় নিজেদের উপনীত করতে ব্যর্থ মূলত তাদের রোগ।

ডেঙ্গু হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত একটি নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিস। অর্থাৎ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যারা বিশ্ব পরিক্রমায় অনুমিত বাসস্থানের সুবিধায় নিজেদের উপনীত করতে ব্যর্থ মূলত তাদের রোগ। মশা-মাছির জন্য যে পরিবেশ অনুকূল, নিশ্চিতভাবে বলা যায় মানুষের জন্য সেই পরিবেশ অনুপযুক্ত, যার অর্থ পরিবেশ দূষণ, পানি ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন প্রভৃতি বাংলাদেশের নগরায়ণের নিত্যসঙ্গী। এ দেশের সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলোর প্রধানতম সমস্যা বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা। এ সুযোগে ভেক্টর বা মশা রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তার ঘটায় এবং মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।

মশাবাহিত রোগ বর্তমানে বর্ষাকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং ঢাকার গণ্ডিতেও আবদ্ধ নয়। পরিসংখ্যান হতে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় দেশের ইতিহাসে তাণ্ডবলীলার ঘটনা ঘটে ছিল ২০২৩ সালে। যেখানে বর্ষা-পরবর্তী সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সারা বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এ মাসে হয়েছিল এবং মোট মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। অক্টোবরও ছিল খুবই ভয়ার্ত। নভেম্বরেও ডেঙ্গুতে একই রকম ভয়াবহতা লক্ষ করা যায়। একইভাবে ২০২৪ সালেও ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ আক্রান্ত লক্ষ করা যায় অক্টোবর এবং নভেম্বরে, যার মধ্যে নভেম্বরের কার্ভটি ছিল একেবারে শীর্ষে।

চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও এর কার্ভ শুরু হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আরো তিন মাস এ ভয়াল কার্ভ বেড়েই চলবে। এর লাগাম থামানোর যতগুলো প্যারামিটার রয়েছে তার এক-তৃতীয়াংশও যদি সক্রিয়ভাবে কাজ করত তাহলে এমন নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হতো না। মশক নিধন কার্যক্রমের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সার্বিক দিক বিবেচনায় কীটনাশক একটি আপৎকালীন কার্যকর পদ্ধতি। মশক দমনের জন্য ব্যবহৃত কীটনাশক মশার জীবনচক্রের লার্ভাল স্টেজে লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্ট স্টেজে অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হয়। যদি সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় তবে অবশ্যই মশার ঘনত্ব কমবে। মশার ঘনত্ব কমলে নিশ্চিতভাবে কমবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুহার। তবে কীটনাশকের গুণগত মান, গুদামজাত প্রক্রিয়া, প্রস্তুতকরণ পদ্ধতি, মেয়াদোত্তীর্ণ বিষাক্ত কীটনাশকের পরিবহন ডিসপোজাল পদ্ধতি সবকিছুই হতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে। একটি কার্যকর আইনের মাধ্যমে এসওপি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর অনুসরণ করে। এ দিকগুলো বিবেচনায় বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োগকৃত কীটনাশক কি আসলেই কীটনাশক না অন্য কিছু। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হয়তোবা নিজেরাও বিষয়টি আঁচ করে থাকবেন। এটি যদি যথাযথভাবে সমাধান করা না হয় তবে বছরের পর বছর অকার্যকর বা মেয়াদোত্তীর্ণ অথবা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডেন্ট ও ফর্মুলেন্ট-বিহীন কীটনাশকের ব্যবহার শুধু মশার সেকেন্ডারি পেস্ট আউট ব্রেকই ঘটাবে না, প্রকৃতির ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ যদি সঠিক ও কার্যকর মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ না হয় তবে উপকারী কীটপতঙ্গ মারা যাবে, যা মশা বা ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের দৌরাত্ম্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি করবে।

এমন কথাও শোনা যায়, যেখানে কীটনাশক ক্রয়ের সময় যে নমুনা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং মাঠে যে কীটনাশক নিয়মিত প্রয়োগ করা হয় তার গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে বিস্তার পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার কেনার পর কি প্রক্রিয়ায় তা গুদামজাত করা হয়েছে তার ওপরও এর কার্যকারিতার হেরফের হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এসব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে পারে ব্যবহৃত কীটনাশকের ক্রিয়াশীল উপাদানের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

তবে পরীক্ষাটি হতে হবে কোনো অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব হতে। একই সঙ্গে নমুনা একটি বিশেষজ্ঞ টিমের উপস্থিতিতে দৈব চয়ন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করতে হবে এবং তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওই ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত কার্যকার উপাদানের সঠিকতার পরিমাপ না করা হবে, ততদিন মশার ঘনত্ব কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হবে না বলে অনেকের ধারণা। সম্ভব হবে না মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুহার কমানো।

বাংলাদেশের মতো এমন জনবহুল দেশে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব যেমনভাবে উপেক্ষিত, উপেক্ষিত নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাও। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ডামাডোলে মানুষের মৌলিক বিষয়গুলো চাপা পড়ে যায় গুরুত্বের তালিকা হতে। মনে রাখা প্রয়োজন প্রতিটি জীবনই অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরোধযোগ্য কোনো রোগ যদি একটি জীবনও কেড়ে নেয় তা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্তই এর জন্য দায়ী থাকবে।

কীটনাশকের কার্যকরী উপাদান পরীক্ষা আরো অন্য কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত ম্যালাথিয়ন এরই মধ্যে তার বিষাক্ততার কারণে প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছে বলে বিভিন্ন দেশে প্রমাণিত। আমরা জানি যে কোনো বিষাক্ত পদার্থ পেস্টিসাইড হিসেবে একাদিক্রমে পাঁচ বছর ব্যবহৃত হলে তার কার্যকারিতা ও টার্গেট পোকামাকড়ের প্রতিরোধী হয়ে ওঠার মাত্রা কীটনাশকের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। আমাদের মনে থাকার কথা, ১৯৩৯ সালে যখন পল হ্যারম্যান মুলার ডিডিটি আবিষ্কার করেন, তখন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে তাকে মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তার এ জগৎ বিখ্যাত আবিষ্কার মানবজাতির অভিশাপের পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি, যার বিস্তর প্রমাণ মেলে রাসেল কার্সনের সাইলেন্ট স্প্রিং বইটিতে। তাই প্রচলিত বিষাক্ত পদার্থের কার্যকরী উপাদান পরীক্ষার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল উপাদানগুলোর প্রয়োগের ওপর জোর দেয়ার সময় এসেছে। পরিবেশ ও মানবজাতির সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত কীটনাশকগুলোর বৈজ্ঞানিক এবং বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

আরও