মিরপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতাল

জনবল সংকট দূর ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিতে মনোযোগ প্রয়োজন

সময়ের পরিক্রমায় দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে নানা সংকটও প্রকট হয়েছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সংকট, কোনোটাতেই নেই পর্যাপ্ত জনবল।

সময়ের পরিক্রমায় দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে নানা সংকটও প্রকট হয়েছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সংকট, কোনোটাতেই নেই পর্যাপ্ত জনবল। বিশেষত সরকারি হাসপাতালগুলোয় এসব সংকটে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেকটাই খুঁড়িয়ে চলছে সরকারি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে মানসম্মত সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। আবার সেবা নিম্নমানের হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতি মানুষ ঝুঁকছে, যদিও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। তাছাড়া এদেশে একজন রোগীর স্বাস্থ্য খাতে পকেট ব্যয় প্রায় ৭৩ শতাংশ। আবার হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে রোগীদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় জনবল সংকট আরো বেশি হতাশার উদ্রেক ঘটায়। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানসংলগ্ন লালকুঠি এলাকায় অবস্থিত ২০০ শয্যার মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতাল তেমনই এক বিশেষায়িত হাসপাতাল।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মিরপুরের ১০ তলাবিশিষ্ট মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে স্বল্প মূল্যে মানসম্মত সেবা দেয়া হলেও চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও প্রচারের অভাবে ২০০ শয্যার এ হাসপাতালের সব শয্যা এখনো পুরোপুরিভাবে চালু করা যায়নি। এতে এখানকার ৬০-৮০ শতাংশ শয্যাই থাকে ফাঁকা। জনবল ঘাটতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেবাকাজও।

রাজধানীতে মা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। এর মধ্যে মিরপুরের এ হাসপাতাল একটি। এখানে বিশেষভাবে মা ও শিশুকে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা প্রসব কার্যক্রম চালু থাকে। যেখানে রাজধানীর অন্য বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে রোগী ভর্তি হন, সেখানে মিরপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে শয্যা ফাঁকা থাকার মতো ঘটনা দুঃখজনক। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে ঈদের কারণে বর্তমানে রোগীর চাপ কম। অন্যান্য দিন বহির্বিভাগে ৩৫০ জনের মতো রোগী দেখা হয়। শয্যাও পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু এর আগেও এ হাসপাতালে জনবল সংকট ও রোগী সেবা না নিয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার এ হাসপাতাল সূত্রেই জানা গেছে, ২০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ আছে ৫৪টি, নার্সের পদ ৬৬টি। পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীসহ মোট ১৬১টি পদ আছে। বর্তমানে চিকিৎসক আছেন ৪৯ জন। তবে তাদের মধ্যে অনেকে সংযুক্তিতে রয়েছেন। নার্স আছেন ৩৬ জনের মতো। এমন পরিস্থিতিতে সহজেই অনুমেয় যে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া রোগী যত দ্রুত সম্ভব এখানে জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন এবং হাসপাতালটির প্রচার-প্রচারণায় মনোযোগ দিতে হবে, যাতে রোগীরা এখানে যেতে আগ্রহী হন এবং মানসম্মত সেবা পেতে পারেন।

২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর মিরপুরের লালকুঠিতে অবস্থিত মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (এমসিএইচটিআই) এ হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালে এ হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। সেই থেকে পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসূতি সেবা, শিশুসেবা ও বয়ঃসন্ধিকালীন সেবা দেয়া হয়। ক্রমে হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু রোগীরা যেন সেখানে যান, সেজন্য তাদের কাজের প্রচার-প্রসার হওয়া দরকার। এজন্য উদ্যোগ নিতে হবে এবং কাজের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা অনস্বীকার্য।

মিরপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, মিরপুরের হাসপাতালটি দেশের প্রথম ডিজিটাল হাসপাতাল। পুরো হাসপাতালটি অটোমেশন করা আছে। ১০ টাকা দিয়ে প্রথমবার টিকিট দেয়ার পর একটি কার্ড দেয়া হয়। প্রত্যেকের চিপসংবলিত আলাদা কার্ড ও নম্বর অনুযায়ী সব তথ্য জমা থাকে মূল সার্ভারে। এরপর প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষা, বিনামূল্যের ওষুধ সবই পাওয়া যায় ডিজিটাল প্রক্রিয়ায়। জনবল পেলে সম্পূর্ণ হাসপাতালটি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মডেল হতে পারে। এছাড়া হাসপাতালটিতে ভর্তুকি কম আসে। অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে না। নেই নিজস্ব কোনো ব্লাড ব্যাংকও। হাসপাতালটিতে লোকবলের অভাব দূর করার পাশাপাশি তাই প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংস্থানের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী, আর্থিক বা অন্যান্য সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা দরকার।

মাতৃ স্বাস্থ্যের ওপর শিশুর স্থাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভর করে। কথায় আছে, ‘সুস্থ মা, নীরোগ শিশু’। তাই যেমন মানসম্মত সেবা প্রয়োজন, পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার নিয়ন্ত্রণে রাখতেও চাই মানসম্মত সেবা। আর এ সেবা নিশ্চিত করার কাজ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা হাসপাতালগুলোর ওপর বেশি বর্তায়। তাদের সেবা মানসম্মত না হলে স্বাভাবিকভাবে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এদিকে এরই মধ্যে দেশে নবজাতক মৃত্যুহার বেড়েছে। প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায় বলে বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদনে (২০২৩) দেখা গেছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি হাজারে নবজাতক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬। পাঁচ বছর আগে তা ছিল ১৫। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৩ জন। ২০২২ সালে ছিল ৩১ জন। পাঁচ বছর আগে ছিল আরো কম, ২৮ জন।

‘বিশ্ব অপরিণত নবজাতক দিবস’ উপলক্ষে গত বছরের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল নিউবর্ন হেলথ প্রোগ্রাম, ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর আয়োজনে এক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, দেশে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা সীমিত। জেলা পর্যায়ে নবজাতকের চিকিৎসাসেবায় পৃথক কোনো ইউনিট নেই। এখনো বাড়িতে অহরহ প্রসবের ঘটনা ঘটে এবং পর্যাপ্ত ফলোআপ চিকিৎসার অভাব, অপর্যাপ্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ জন্মতথ্যসহ আরো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সবার চাওয়া স্বাস্থ্য খাতের এসব চ্যালেঞ্জ দূর হোক। সুলভ ও সহজে মানসম্মত সেবা পাক সবাই। মা ও শিশু সুস্থ থাকুক। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের অনুরোধে বিবিএস পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ কম হওয়ায় চিকিৎসায় মানুষের ব্যক্তিগত খরচ বাড়ছে। এ খরচ কমাতে (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) কমাতে ৯২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ চায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ বাড়ানো হোক। দেশের ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ চায় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হোক, যাতে সবাই স্বাস্থ্যসেবা পান। এসব জরিপের ফলাফল সরকারের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সর্বসাধারণের স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের ভাবতে হবে।

আরও