দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এক শত্রু এডিস মশা, আর তার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এখন আমাদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে প্রতি বছরই দেশে কমবেশি ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী। ডেঙ্গু রোগ ও এডিস মশা সম্পর্কে দেশের সরকার ও মানুষ এখন অনেকটাই জানে। রোগটি কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়—এসব তথ্য আমাদের জানা। এমনকি সরকার, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ নানা উদ্যোগও নিয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সবকিছু জানার পরও আমরা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার? এ ব্যর্থতার পেছনে কোথায় ঘাটতি, কাদের দায় আর কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় এ ঘূর্ণিচক্র। এখন সময় এসেছে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, এ বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ১২ হাজার মানুষ। সরকারি হিসাবমতে এরই মধ্যে ৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ, কারণ অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে বাসায় বা এমন হাসপাতালে যেগুলোর রিপোর্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে যায় না। এ পরিসংখ্যানগুলো আমাদের সামনে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা যদি এখনই মোকাবেলা করা না যায়, তাহলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশের অনেক জেলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ডেঙ্গু রোগ ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে, বিশেষ করে Aedes aegypti ও Aedes albopictus প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে। এডিস মশা সাধারণত সকালে ও বিকালে বেশি কামড়ায়। তবে দিনে বা রাতে যেকোনো সময়ও তারা কামড়াতে পারে। এ মশাগুলো জমে থাকা স্বচ্ছ বা অস্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে এবং তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব নির্দেশক ‘ব্রেটো ইনডেক্স’ ২০-এর ওপরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোনো এলাকায় যদি এ সূচক ২০ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেই এলাকায় ডেঙ্গুর মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি।
বর্তমানে বরিশাল বিভাগ, বিশেষ করে বরগুনা ও বরিশাল জেলার অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমাদের গবেষণা ফোরকাস্টিং মডেলের ভিত্তিতে বলা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, গাজীপুর, পিরোজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর ও মাদারীপুর জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিতে পারে। মে মাসের তুলনায় জুনে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বাড়ায় এ প্রবণতার ভয়াবহতা নির্দেশ করে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গু প্রবৃদ্ধি জ্যামিতিক হারে বাড়বে, যা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে হারে বেড়ে চলেছে, তা আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে একাধিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন। দেশের শহরাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকায় অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের ফলে তৈরি হচ্ছে মশার প্রজননের আদর্শ পরিবেশ। নির্মাণাধীন ভবনে খোলা ড্রাম, বালতি, পানির ট্যাংক কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে দিনের পর দিন জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেখানে অনায়াসে এডিস মশাবংশবিস্তার করে। বহুতল ভবনগুলোর বেজমেন্টে গাড়ির পার্কিং এবং গাড়ি ধোয়ার জায়গায় সৃষ্টি হচ্ছে মশার আদর্শ প্রজননস্থল। কিছু এলাকায় পানির সংকট থাকার কারণে বৃষ্টি বা সাপ্লাইয়ের পানি ড্রাম, বালতি ও অন্যান্য পাত্রে ধরে রেখে নাগরিকরা সৃষ্টি করছে মশার অনন্য বাসস্থান।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় ডেঙ্গু সংক্রমণ খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। একটি ভবনে একজন আক্রান্ত হলে অল্প সময়েই সেই রোগ আশপাশের অনেককে সংক্রমিত করে ফেলে। শহরের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক বোতল, ফুলের টব, ক্যান বা প্যাকেটজাত খাবারের খালি কৌটা—সবই মশার ডিম পাড়ার জন্য যথেষ্ট। নগরজীবনে প্যাকেটজাত ও ক্যানজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ায় এ ধরনের জিনিসপত্র যত্রতত্র ফেলে দেয়া হচ্ছে, যা মশার বংশবিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির ফলে তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতা ও উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। মশা খুব অল্প পানিতেও ডিম দিতে পারে এবং মাত্র পাঁচ-সাতদিনের মধ্যেই সেই ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা জন্মে। এভাবে টানা বৃষ্টি ও অনিয়ন্ত্রিত পানি নিষ্কাশনের অভাব ডেঙ্গুর বিস্তারকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে তোলে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে শহরের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় পাত্রে পানি জমে থাকে, যা সময়মতো ধ্বংস না করা হলে মশা নিয়ন্ত্রণের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হতে বাধ্য।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে লার্ভা ধ্বংস সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলেও দেশে অনেক এলাকায় নিয়মিত মনিটরিং বা লার্ভা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। জনবল সংকট, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনগুলো এ কাজে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। ফলে অনেক এলাকায় নিভৃতে লার্ভা বেড়ে উঠছে এবং তা ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও ডেঙ্গু মোকাবেলায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই জানেন না কোথায় মশা ডিম পাড়ে, কীভাবে লার্ভা ধ্বংস করতে হয় কিংবা এডিস মশা কখন কামড়ায়। কেউ কেউ জানলেও দায়িত্ববান আচরণ করেন না, বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা আঙিনায় জমে থাকা পানির প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করেন না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন এখন এডিস মশার বিস্তারকে আরো ত্বরান্বিত করছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার ওঠানামা ও আর্দ্রতার তারতম্য এডিস মশার জীবনচক্রে সহায়তা করছে এবং ভাইরাস সংক্রমণ আরো দ্রুত হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতে যখন বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্রে পানি জমে থাকে, তখন তা দ্রুত মশার প্রজননস্থলে রূপ নেয়। অতএব ডেঙ্গুর বর্তমান এ পরিস্থিতি শুধু একটি রোগ নয়, বরং এটি জলবায়ু, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্মিলিত সংকট, যার সমাধান জরুরি। এ সংকট মোকাবেলা ব্যাপক ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত কৌশল। এটি কেবল ফগিং বা কীটনাশক ছিটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এডিস মশার প্রজননচক্র ধ্বংস করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। এজন্য প্রথমেই যেটি জরুরি, তা হলো মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, বেজমেন্ট, বারান্দা, আঙিনা, বাথরুম, রান্নাঘর কিংবা আশপাশে যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির ছাদ বা আঙিনায় রাখা ফুলের টব, বালতি, কৌটা, পানির ড্রাম কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে বৃষ্টির পানি জমা হতে না দেয়ার বিষয়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে খোলা জায়গায়, রাস্তার পাশে, নির্মাণাধীন ভবন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চত্বরে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
ডেঙ্গুর হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। যেসব বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে অন্তত ২০০ মিটারের মধ্যে ফগিং, লার্ভিসাইড ছিটানো এবং লার্ভা সার্ভে চালানো আবশ্যক। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশে উড়ন্ত এডিস মশা বেঁচে থাকলে তারা সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিলেই চলবে না, তাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাকেই মশামুক্ত রাখতে হবে।
এডিস মশা নির্মূলে রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তাই পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ লার্ভিসাইড ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ড, মহল্লা বা ইউনিয়নে নিয়মিত লার্ভা পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মশার ঘনত্ব, আবহাওয়া ও রোগীর তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে আগাম পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি গ্রহণ করাও একটি সময়োপযোগী কৌশল হতে পারে। প্রয়োজনে বাংলাদেশের স্বনামধন্য গবেষকদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। এ সমস্যার কার্যকর সমাধানে জনগণের সক্রিয় ও সচেতন অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ পরিবার, পাড়া-মহল্লা এবং কর্মস্থলে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসে উদ্যোগী হতে হবে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গুবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কীটতত্ত্ববিদ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করতে হবে। কারণ ডেঙ্গু কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—এটি একটি জাতীয় সংকট, যার সমাধান একমাত্র সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব।
ড. কবিরুল বাশার: কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়