ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের পর আগামী ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু করেছে। সরকারের কাছে সংগতই বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষত উত্তরাঞ্চলে আখ চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষক এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলের চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই, চিনিকলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও জীবনজীবিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর তুলনায় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় কয়েকটি চিনিকল ছাড়া তেমন কোনো ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। নেই কর্মসংস্থানের আলাদা কোনো সুযোগ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ১৫টি চিনিকলের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান বলেছিলেন, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলের বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকল ও রেশম কারখানা পুনরায় চালুসহ উত্তরাঞ্চলকে একটি আধুনিক শিল্প ও আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) হাবে রূপান্তর করা হবে। দেশীয় চিনিকলগুলো চালু করা হলে বিদেশ থেকে চিনি আমদানি কমবে। এভাবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয় হবে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এক্ষেত্রে বলে নেয়া ভালো, গত পাঁচ বছরে চিনিকলগুলো বন্ধ ছিল। তাই কারখানার যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া এসব চিনিকলের আশপাশের কৃষিজমি থেকে আখ চাষও উঠে গেছে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গুড় উৎপাদন ও বিপণনে। যেসব জমিতে আখ চাষ করা যায়, সেগুলোয় এখন ভুট্টা, আলুর মতো রবিশস্যের চাষ হচ্ছে। আবার শীত মৌসুমে অন্য সবজি উৎপাদন করলেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
আখ চাষের কিছু সুবিধা রয়েছে। খরা-বন্যা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাছাড়া সরকার নির্ধারিত দামে ফসলটি বিক্রি করা যায়। চিনিকলগুলো এক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্রেতা। তারা শুধু ফসল হিসেবে আখ কেনে এমন নয়। কৃষকদের সহজ শর্তে আখ উৎপাদনে ঋণও দিয়ে থাকে। আবার আখের বীজ, সার ও কীটনাশকও সরবরাহ করে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও চিনিকলের গুরুত্ব অপরিসীম। চিনিকলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই চাষীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এভাবে আখ উৎপাদন হয়, এমন অঞ্চলগুলোয় অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়। কারণ অন্য ফসলের তুলনায় আখ চাষে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন। জমিতে আখ উৎপাদন থেকে শুরু করে তা পরিবহন, বিপণন, প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গেও অনেক শ্রমিক জড়িত থাকেন। ফলে আখ চাষের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশের কর্মসংস্থান জড়িত।
স্মরণে আছে, ২০০১ সালে যখন বন্ধ ঘোষিত রংপুর চিনিকল পুনরায় চালু করা হয়, তখন আমি ওখানে দায়িত্ব নিই। তখন পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট ও শ্যামপুর সুগার মিল থেকে বীজ এনে আখ উৎপাদন করতে হতো। এটি যে কত কঠিন তা ভালোভাবেই জানি। প্রচলিত পদ্ধতিতে এক একর জমিতে আখ রোপণে আড়াই টন বীজ প্রয়োজন। আখ ছাড়া অন্য কোনো ফসলে এত বীজ লাগে না। এ ফসল উৎপাদনে প্রথমে উপযুক্ত জমি ও কৃষক নির্বাচন আবশ্যক। সময়মতো আখ উৎপাদনকারী কৃষকের মধ্যে প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও বালাইনাশক এবং নগদ ঋণ বিতরণও করতে হয়। এসবের জন্যও সংশ্লিষ্ট সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হয়।
আমাদের অর্থনীতির নানা সমস্যা বিবেচনা করলে বন্ধ ঘোষিত ছয়টি চিনিকল চালু করা হয়তো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে দুটি চিনিকল চালু করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। অগ্রাধিকার তালিকায় থাকতে পারে সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর ও পাবনা চিনিকল। বাংলাদেশে চালু নয়টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলো কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠানের লাভের মূল কারণ পণ্য বহুমুখীকরণ। আখ থেকে উৎপাদিত চিনির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অনেক আয় করে। আখ থেকে চিনি উৎপাদনের পর উপজাত হিসেবে পাওয়া চিটাগুড়, ব্যাগাস ও প্রেসমাড থেকে বিভিন্ন মূল্যবান পণ্য উৎপাদন হয় চিনিকলটির। উপজাত থেকে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে দেশী-বিদেশী মদ, ভিনেগার, স্পিরিট, জৈব সার ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার উল্লেখযোগ্য। ২০১৪ সাল থেকে স্বর্ণের দানা নামে কেরুজ জৈব সার পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। মিলটির বছরে সার উৎপাদনক্ষমতা পাঁচ হাজার টন এবং প্রতি কেজি সারের মূল্য মাত্র ১০ টাকা। এ জৈব সার আখচাষীদের জমি ও বাণিজ্যিক খামারে ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি ও আখের ফলন বাড়ছে বলে জানা যায়। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সফলতাকে সামনে রেখে আমরা পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বন্ধ চিনিকলগুলো লাভজনক অবস্থায় চালু করতে চাই। এজন্য আখ থেকে শুধু চিনি নয়, কেরুর মতো আখের উপজাত প্রেসমাড থেকে জৈব সার, চিটাগুড় থেকে অ্যালকোহল, জৈব জ্বালানি, ভিনেগার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধসহ নানা পণ্য উৎপাদন করতে হবে।
দেশে চিনিকলগুলোর প্রধান সমস্যা কাঁচামাল বা মাড়াইযোগ্য আখের অভাব। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি আখের কম ফলন। পৃথিবীর অন্যান্য চিনি উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় চিনি আহরণ হারও কম। দেশে বেশি আহরণ করা যায় এমন জাতের আখও কম। পুরনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংরক্ষণ এমনকি প্রক্রিয়াজাত ভালো হয় না। ফলে প্রক্রিয়াজাতের খরচও বাড়ে। যে পরিমাণ আখ আমরা আহরণ করি, তার বিপরীতে বিক্রিমূল্য অনেক কম। এমন আরো বহু সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। শুধু পরিকল্পনা নিলেই হবে না। এর বাস্তবায়ন করতে হবে।
বর্তমানে সরকারি চিনিকলগুলোয় মিলগেটে প্রতি কেজি বস্তাজাত চিনির মূল্য ১২৫ ও প্যাকেটজাত চিনির মূল্য ১৩০ টাকা। অন্যদিকে র-সুগার মিলে উৎপাদিত প্রতি কেজি বস্তাজাত চিনির খুচরা মূল্য ১০০ ও প্যাকেটজাত চিনির মূল্য ১০৫ টাকা। র-সুগার মিলে উৎপাদিত প্রতি কেজি চিনির মূল্য ২৫ টাকা কম হওয়ায় সরকারি মিলে উৎপাদিত চিনি বিক্রি না হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশে যে ক’টি চিনিকল চালু রয়েছে, সেগুলোয় উৎপাদন কম। তাই বিক্রি খরচ বেশি। আবার উৎপন্ন চিনিও সময়মতো বিক্রি হচ্ছে না। এজন্য আখচাষীরা আখের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। চিনিকলগুলোও ব্যয়ভার নির্বাহ করতে পারছে না। সময়মতো আখের মূল্য না পাওয়ায় কৃষকও আখ উৎপাদনে আগ্রহী থাকেন না। অনেক কৃষক বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আবার যারা চাষ করেন তারা উন্নত ও দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী থাকেন না। এগুলো চিনি শিল্পের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই। চিনির মূল্যনির্ধারণে তাই সরকারি-বেসরকারি র-সুগার মিলের সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যথাযথ কার্যকর ভূমিকা কাম্য।
নিতাই চন্দ্র রায়: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন