পৃথিবী পৃষ্ঠের স্থলভাগের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রায় ৩০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন বছর আগে। বিজ্ঞানীদের দাবি, ওই সময় আফ্রিকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থলভাগ ছিল মাত্র একটি। যাকে বলা হয় প্যানজিয়া। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই স্থলভাগে রাজত্ব করত অতিকায় ডাইনোসর। একসময় সেটি ভেঙে যায়, সৃষ্টি হয় লরেশিয়া ও গন্ডোয়ানাল্যান্ড নামক দুটি মহাদেশ। গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ ছিল অ্যান্টার্কটিকা। সঙ্গে আরো ছিল দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। পরবর্তী সময়ে ভারত ভেঙে গিয়ে ভেসে আসে পৃথিবীর অন্য পাশে, ধাক্কা খায় ইউরেশিয়ার সঙ্গে; জন্ম হয় হিমালয়ের। সে অবশ্য অন্য গল্প। এবারের আলোচনার বিষয় অ্যান্টার্কটিকা। দক্ষিণ মহাসাগর দিয়ে ঘেরা এ মহাদেশে লুকিয়ে আছে কত শত অজানা রহস্য, যার সন্ধানে ছুটে গেছেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট, রোয়াল্ড আমুন্ডসেনের মতো প্রবাদপ্রতিম অভিযাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের শত শত বিজ্ঞানী।
নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত থেকে শুরু করে আগ্নেয়গিরি—অ্যান্টার্কটিকার চারদিক ঢেকে রেখেছে শুভ্র বরফের চাদর। তার ভেতর উঁকি দিচ্ছে কচি পাতা, ফুল। শুষ্ক শীতের পর যে দৃশ্য বসন্তের আগমন মনে করিয়ে দেয়। অথচ এ অঞ্চলের ৯৮ ভাগ অংশই ঢাকা রয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার পুরু বরফে। দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা তাই মাইনাস ১০ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর সেখানে সূর্যের দেখা মেলা ভার। গোধূলির মতো সামান্য আলো ছড়ায় কেবল মে, জুন ও জুলাইয়ে। ফলে ভয়াবহ ঠাণ্ডার সঙ্গে যেসব উদ্ভিদ ও প্রাণী লড়াই করতে পারে তারাই শুধু অ্যান্টার্কটিকায় টিকে থাকে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে কিলার বা খুনে তিমি, এম্পেরর পেঙ্গুইন, সিল মাছ, কুমেরু চিংড়ি, কৃমি জাতীয় প্রাণী, বিভিন্ন ধরনের শৈবাল ও মাইক্রোঅর্গানিজম এবং সহস্রাধিক প্রজাতির ছত্রাক।
তীব্র শীতল এ অঞ্চলে এত দ্রুত কখনো কোনো উদ্ভিদের বাড়বাড়ন্ত ছিল না। এখন কেবল বৃদ্ধিই নয়, চরম শীতল আবহাওয়ায় ফুলও ফুটতে শুরু করেছে। অ্যান্টার্কটিকায় ফুল ফুটেছে—খবরটি আনন্দের মনে হলেও বাস্তবে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞানীদের মাঝে। কেননা এ ঘটনা প্রমাণ করছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে পড়েছে বরফরাজ্য।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা সারা বছরই হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকায় সেখানে মস ও লিচেন জাতীয় শৈবালের জন্ম হয়। মূলত এরাই কুমেরু অঞ্চলের পুরনো বাসিন্দা। কিন্তু এবার নতুন ধরনের উদ্ভিদের দেখা মিলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সেখানে নতুন ধরনের উদ্ভিদের জন্ম হচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এতে কোপ পড়তে পারে সেখানকার মস ও লিচেনের বৃদ্ধিতে। ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে আন্টার্কটিকার বাস্তুতন্ত্র। মাটির চরিত্র বদলে যেতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
অজানা অ্যান্টার্কটিকায় গবেষক ও অভিযাত্রীদের ভিড় বাড়ছে ক্রমবর্ধমান। তাই মানুষের পায়ে পায়ে হিমশীতল মহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে একাধিক উদ্ভিদের বীজ। প্রবল ঠাণ্ডায় সেগুলো এতদিন অঙ্কুরিত হতে পারেনি। কিন্তু দূষণের কারণে সেখানকার হিমবাহ-হিমশৈলগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ দ্রুত হারে গলতে শুরু করেছে। তাই উদ্ভিদগুলো জন্ম নিতে পারছে। ফুল ফুটছে। আর এ ফুল ফোটা কি তবে অ্যান্টার্কটিকার বাস্তুতন্ত্র বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত?
খুব একটা দূর অতীত নয়, মাত্র সোয়া লাখ বছর আগেকার কথা। গলতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের বিশাল বিশাল খণ্ড। ৩০ ফুটেরও বেশি ওঠে এসেছিল সবক’টি মহাসাগরের পানির স্তর। ভূপৃষ্ঠের প্রায় পুরোটাই চলে গিয়েছিল পানির তলায়। ঠিক তেমনটাই হয়তো ঘটতে চলেছে আবার। পার্থক্য কেবল একটাই, আগেরবার বরফ গলে যাওয়ার পেছনে মানবসভ্যতার কোনো হাত ছিল না। যেটা ছিল একেবারেই প্রাকৃতিক ঘটনা। আর এবার ঘটতে চলেছে আমাদের জন্যই। উষ্ণায়নের কারণে। আর এভাবে চলতে থাকলে পাঁচ থেকে সাত শতকের মধ্যেই পৃথিবীকে ডুবিয়ে দেয়ার মতো মহাপ্লাবনের আশঙ্কা অন্তত ৭০ শতাংশ। ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সায়েন্স বিভাগের একটি গবেষণায় মিলেছে ভয়াবহ সেই অশনিসংকেত।
এদিকে ওজোন স্তরের ফাটল ক্রমেই বাড়ছে। নাসা জানাচ্ছে, অ্যান্টার্কটিকার বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোনের স্তরে ওই ফাটল ধরেছে অনেক দিনই। প্রতিদিন সেই ফাটল বাড়ছে রীতিমতো রেকর্ড হারে। ভূপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলের ২৫ কিলোমিটার উঁচুতে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন স্তরের অবস্থান। সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে সেই বলয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে ক্রমে বাড়ছে উষ্ণায়ন। কয়েক দশক ধরে বাতাসে বেড়েছে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি), ব্রোমিন, ক্লোরিন। ফলে বড় হচ্ছে ওজোন স্তরের ছিদ্র, যার প্রভাব পড়েছে জীবজগতে।
বছর তিনেক আগে উত্তপ্ত হতে হতে কুমেরুর একটি অংশে পারদ চড়েছিল ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনের ফলে চরম বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে অ্যান্টার্কটিকার এম্পেরর প্রজাতির পেঙ্গুইন। এখন পর্যন্ত এ বিপর্যয়ে প্রায় ১০ হাজার পেঙ্গুইনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে চলতি শতকের শেষ নাগাদ শতকরা ৯০ শতাংশেরও বেশি পেঙ্গুইনের কলোনি বা বসতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
‘দ্য ক্রায়োস্ফিয়ার’ জার্নালে ২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বরফ, বরফ খণ্ড ও হিমবাহের মধ্যে প্রায় ২৮ ট্রিলিয়ন টন গলে গেছে। তিন দশক আগে যে হারে বরফ গলত, বর্তমানে তা ৫৭ শতাংশ দ্রুত হারে গলছে। নাসা গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিকায় প্রতি বছর গড়ে ১৫০ বিলিয়ন টন বরফ গলছে এবং গ্রিনল্যান্ডে গলছে ২৭০ বিলিয়ন টন হারে। কুমেরু ও সুমেরুর এ বরফ গলা পানি বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ অবদান রাখছে।
জার্মানওয়াচ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম; যদিও গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা অতিনগণ্য। মূলত শিল্পোন্নত এবং বড় বড় উন্নয়নশীল দেশের কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। কাজেই বিশ্বের বড় বড় দেশের কার্বন নিঃসরণ হ্রাসই এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
‘প্রজেকশন অব সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট অব ইটস সেক্টরাল (এগ্রিকালচার, ওয়াটার অ্যান্ড ইনফ্রাস্টাকচার) ইমপ্যাক্টস’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেছে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকি নিরূপণের লক্ষ্যে প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড। গবেষণায় প্রাপ্ত ফল থেকে জানা যায়, তিন দশ ধরে দেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার প্রায় ৩ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার। আর এভাবে চলতে থাকলে চলতি শতকের শেষে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১২ দশমিক ৩৪ থেকে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ সমুদ্রে ডুবে যাবে। ধান উৎপাদন কমবে ৫ দশমিক ৮ থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত।
অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য ও দৃশ্যপটের দ্রুত বদল পুরো পৃথিবীর জন্যই যে অশনিসংকেত, সে বিষয়ে বারবারই সতর্ক করে যাচ্ছেন পরিবেশবাদী ও বিজ্ঞানীরা। তবে এখনো আশা শেষ হয়ে যায়নি, কার্বন নিঃসরণ যদি কমিয়ে আনতে পারি প্রকৃতি ফিরে পাবে তার আপন ঠিকানা। আর যদি ব্যর্থ হই, তাহলে পৃথিবীর অনেক বাসিন্দাকেই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাব আমরা।
ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক