সময়ের ভাবনা

স্বপ্ন যাবে বাড়ি, কিন্তু নিরাপদে ও স্বস্তিতে বাড়ি পৌঁছবে তো!

বিজ্ঞাপনের গান ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ এখন দেশের মানুষের কাছে ঘরে ফেরার গান। বিশেষত ঈদ এলেই মনে-আনমনে সবাই গুনগুন করে গায় এ গান। স্বপ্ন পূরণের পথে ছুটে চলা মানুষের একমাত্র স্বপ্ন তখন বাড়ি ফেরা। তবে আজকের কথা গান নিয়ে নয়। যে কথা বলতে চাই, শুরুটা সে কথা শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় ভূমিকা মাত্র। আসল কথাটি হলো স্বপ্ন (আমরা) বাড়ি যাবে, কিন্তু কীভাবে? কিংবা নিরাপদে

বিজ্ঞাপনের গান ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ এখন দেশের মানুষের কাছে ঘরে ফেরার গান। বিশেষত ঈদ এলেই মনে-আনমনে সবাই গুনগুন করে গায় এ গান। স্বপ্ন পূরণের পথে ছুটে চলা মানুষের একমাত্র স্বপ্ন তখন বাড়ি ফেরা। তবে আজকের কথা গান নিয়ে নয়। যে কথা বলতে চাই, শুরুটা সে কথা শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় ভূমিকা মাত্র। আসল কথাটি হলো স্বপ্ন (আমরা) বাড়ি যাবে, কিন্তু কীভাবে? কিংবা নিরাপদে ফিরতে পারবে তো?

কীভাবে যাবে প্রশ্নটির উত্তর বেশ সহজ। কেউ বাস, কেউ ট্রেন, কেউ লঞ্চ, কেউ-বা উড়োজাহাজে চেপে বাড়ি ফিরবে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত যানবাহনে ফিরবে—চার চাকার গাড়ি, দুই চাকার মোটরসাইকেল ইত্যাদি। কিন্তু গণপরিবহনের টিকিট কাটা একধরনের যুদ্ধ আর নিরাপদে বাড়ি ফেরা যেন অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় কর্মজীবী মানুষ যারা আছে, ঈদের আগের দিন বাড়ি ফেরা তাদের কাছে ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা যেন। ঈদযাত্রা এখন ব্ল্যাক টিকিট, চড়া দাম, ভোগান্তি, হয়রানির প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ট্রেন, বাস, লঞ্চ পরিবহনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যেত টিকিট কেনার জন্য। বর্তমানে এ ভোগান্তি লাঘব হয়েছে অনলাইনভিত্তিক টিকিট কেনার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। কিন্তু বেড়েছে কালোবাজারি টিকিটের ব্যবসা কিংবা টিকিটের নামে যাত্রীদের লুটতরাজ। ব্যাপারটিকে টিকিট সন্ত্রাস নামে অভিহিত করলে ভুল বলা হবে কি?

একদিকে বাসের টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া করে দেয় মালিকরা, অন্যদিকে সাশ্রয়ী ট্রেনের টিকিট হয়ে যায় দুর্লভ বস্তু। ট্রেন যাত্রা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হয় বলে ঈদের সময় মানুষের সবচেয়ে বেশি ঝোঁক দেখা যায় ট্রেনযাত্রার প্রতি। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে ট্রেনের টিকিট কাটা নিয়ে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হয়ে আসছে মানুষ। অনেক সময় দেখা যায় টিকিট মিলেছে কিন্তু সিট নেই কিংবা বগি নেই। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১০টি দুর্নীতির খাত চিহ্নিত করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির খাতগুলোর একটি ছিল টিকিট বিক্রয়। ওই সময় দুদক রেলওয়ের সঙ্গে বৈঠক করে দুর্নীতি কমাতে ১৫টি সুপারিশ করেছিল। কিন্তু পুরো রেলওয়ে ব্যবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। আর টিকেটিং ব্যবস্থা্র দুর্গতি বলে শেষ করা যাবে না। ৫ কিংবা ১০ দিন আগে দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট দেয়া শুরু হলে আধা ঘণ্টার মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। একটি চক্র সারা বছর সিস্টেম করে কালোবাজারে টিকিট বিক্রি করে পকেট ভারী করে। গত বছর টিকিটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টিকিট কালোবাজারি রোধে ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু টিকিট কাটার অনলাইন সিস্টেম থেকে দুর্নীতির হাত অপসারণ করতে না পারলে এ নীতির বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব নয়। নিরুপায় যাত্রীরা বাধ্য হয় চড়া মূল্যে কালোবাজার থেকে টিকিট কিনতে। আর যারা টিকিট কিনতে পারে না, তাদের শেষ উপায় ট্রেনের ছাদ কিংবা বিনা টিকিটে ভ্রমণ। ফলে প্রতি বছর কমবেশি দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে সড়কপথে। অতিরিক্ত দাম দিয়ে মানুষ যেন ঈদের টিকিট নয়, মৃত্যুর টিকিট কেনে। 

শেষ দিকে রাস্তায় দূরপাল্লার গাড়ি, মোটরসাইকেল, ট্রাক, মাইক্রোবাসে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখা যায়। প্রতি বছরই ঈদের আগে সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্টদের বলতে শোনা যায়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা রুট পারমিটবিহীন গাড়ি মহাসড়কে নামতে দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। অতিরিক্ত ও বেপরোয়া গাড়ির চাপে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বাড়ে ঈদের সময়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে পবিত্র ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। তাদের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ঈদযাত্রায় ঈদের আগে ও পরে ১৫ দিনে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৮৪৪ জন আহত হয়। সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ৪০২টি দুর্ঘটনায় ৪৪৩ জন নিহত ও ৮৬৮ জন আহত হয়। ২০২২ সালে ঈদযাত্রায় ৩৭২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৪১৬ জন, আহত হয় ৮৪৪ জন। ২০১৯ সালে সারা দেশে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন মারা গেছে এবং ৮৪৯ জন আহত হয়েছে। অর্থাৎ স্বপ্ন বাড়ি যাবে, কিন্তু অক্ষত, জীবিত নাকি মৃত—সে নিশ্চয়তা আমাদের নেই। যাত্রাপথে আমরা কতটা অনিরাপদ, ঈদযাত্রা চোখে আঙুল দিয়ে প্রতি বছর আমাদের জানিয়ে যায়। 

এ তো গেল ‍টিকিট ও সড়ক দুর্ঘটনার কথা। যাদের বাড়ি ফিরতে অগ্রিম টিকিট কাটতে হয় না, তাদের ভোগান্তি বাসে উঠতেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী জানেই না কখন বাসে উঠতে পারবে কিংবা বাস রওনা দেবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর বাস কাউন্টারে ঈদের সময় এ চিত্র সুপরিচিত সবার কাছে। বাড়তি সমস্যা তৈরি হয় নারীদের জন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি হয় ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে। তাই নারী শিক্ষার্থীরা ঈদযাত্রার ভিড় এড়িয়ে বাড়ি যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু কর্মজীবী নারী, বিশেষত গার্মেন্টসে কর্মরত নারীরা যাত্রায় ভোগান্তির শিকার হন সবচেয়ে বেশি। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে অধিকাংশ নারী যাত্রাপথে নানা শারীরিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়, সেখানে ঈদযাত্রা তাদের জন্য বিভীষিকাময় হয়; হয়রানির ঘটনাগুলো বেড়ে যায়। নাড়ির টানে ঘরে ফেরা নারীর নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা কোথায়? নাকি হয়রানি ও অনিরাপত্তার ভয়ে নারীরা ঘরে ফিরবে না? 

আমাদের যাত্রাপথের নীতি আছে; কিন্তু বাস্তবায়ন নেই, সুব্যবস্থাপনা নেই। যাত্রীরা উপায় না পেয়ে অসদুপায়ের দ্বারস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঈদে চাহিদার তুলনায় পরিবহন কম থাকে।

১ এপ্রিল প্রকাশিত নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির ঈদপূর্ব পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বৃহত্তর ঢাকার প্রায় দেড় কোটি মানুষ স্বজনদের কাছে যাবে। এসব মানুষ ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করে। এ বিপুলসংখ্যক ঈদযাত্রীর ৬০ শতাংশ যাবে সড়কপথে। এ হিসেবে সড়কপথের যাত্রীসংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ মানুষ নৌ ও রেলপথে ঢাকা ছাড়বে। রোজার শেষ দু-তিনদিনে ১০-১৫ লাখ মানুষ বাড়ি ফেরে। প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষের ঈদযাত্রার জন্য কোনো বিকল্প না থাকায় তারা বিভিন্নভাবে ট্রেনের-বাসের ছাদে করে যেতে বাধ্য হয়। একদিকে সুব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই, অন্যদিকে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা নেই। এর সঙ্গে ঈদযাত্রায় যোগ হয় কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য। এগুলো দূর করা না গেলে ঈদযাত্রা কখনো আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে না। ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সক্রিয় হওয়া জরুরি। কীভাবে সড়ক ও মহাসড়কে যানজট নিরসন করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ঈদের আগে-পরে যেন কোনোভাবেই মহাসড়কে অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ের টোলপ্লাজাগুলোয় যেন ভোগান্তি না হয় তার কৌশল ঠিক করা যেতে পারে। বাসের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ট্রেনের ওপর চাপ কমতে পারে। আর ট্রেনযাত্রায় দুর্ভোগ কমাতে রেলওয়ে ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার বিকল্প নেই। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিগুলো দূর করা গেলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। তখন নিশ্চিন্তে সবাই গাইতে পারবে—‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’।

সাবরিনা স্বর্ণা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও