সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। ২০০৯ সালের ১ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। সিনিয়র সচিব পদে দীর্ঘ এক যুগ চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করে ২০২১ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগে দীর্ঘ ৩৫ বছর সরাসরি অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১), ষষ্ঠ (২০১১-১৫), সপ্তম (২০১৬-২০) ও অষ্টম (২০২১-২৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তার নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে প্রণীত হয়। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০১১-২১) এবং বাংলাদেশের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র (২০১৫-২০২৫), শতবর্ষী বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণীত হয়েছে (২০১৮)। রূপকল্প ২০৪১ ভিত্তিক বাংলাদেশ দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়েছে। কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে দক্ষতা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি ১৬তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ২০১৮ সালে ড. আলমকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় মুজিব বর্ষ ২০২০-এ বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পদক “একুশে পদক”প্রাপ্ত হন। দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, কৃষির ভবিষ্যৎ সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এদিকে আবার খাদ্য আমদানিতে আমাদের অবস্থান তৃতীয়। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে?
খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে আমরা বিশ্বে একেক রকম অবস্থানে আছি। চাল, মাছ ও বিভিন্ন ফসল; বিশেষত প্রধান কৃষিশস্য উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে আমাদের অবস্থান। আমি মনে করি, আমাদের কৃষি ব্যবস্থার সাফল্য অত্যন্ত স্মরণীয়। স্বাধীনতার পর থেকে কাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমে এক ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে কৃষি ক্ষেত্রে। ষাটের দশকের মাঝামঝি সবুজ বিপ্লব শুরু হয়। ওই বিপ্লব সত্তরের দশকে এসে আমাদের দেশে পরিণতি পায়। উচ্চ ফলনশীল ধান, সার ও পানি ইত্যাদি মিলিয়ে সেচভিত্তিক বোরো ধান চাষ শুরু হলো দেশে। এটি ধান উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। আমরা এক কোটি টন কিংবা ১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করেছিলাম। বর্তমানে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন বা ৩৯ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। আগে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা। অর্থাৎ প্রায় সোয়া দ্বিগুণ বেড়েছে। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ১ হাজার ১৫০ জন। অন্যদিকে ভারতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৪৪ জনসংখ্যার বাস। আমাদের ভারতের চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষকে খাওয়াতে হচ্ছে। সুতরাং ভূমির বহন ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে উৎপাদন করেও আমরা শতভাগ স্বনির্ভর হতে পারিনি। কেননা স্বনির্ভর হতে পারলে চাল আমদানি করতে হতো না, বরং চাল রফতানি করতে পারতাম। ৩ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে আমাদের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ টন। সে হিসেবে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু বস্তুত চাল আমদানি করা হয়নি—এমন বছর নেই বললেই চলে। গড়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়। আমরা যখন গবেষণা করতাম, তখন উৎপাদনের ১৪ শতাংশ বাদ দিতাম। কারণ মানুষ চালের বিকল্প ব্যবহারও করে। যেমন পশুখাদ্য, বীজ, বিভিন্ন রকমের অপচয়। সেটা যদি ২০ শতাংশও ধরি, তাতেও কিন্তু ৪০-৫০ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকে। বস্তুত আমরা ১০ বা ১১ লাখ টন চাল আমদানি করি। আমরা যে উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য পাচ্ছি সেগুলোর আরো বিচার-বিশ্লেষণ করা দরকার। আমরা ভারত থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করি, এমনকি মোটা চালও আমদানি করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশেই যদি চাল স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকে তাহলে মোটা চাল আমদানি কেন। কৃষিতে অনেক সাফল্য রয়েছে, অনেক দুর্যোগের সময় কৃষি আমাদের সাহায্য করেছে। কভিড মহামারীতেও কিন্তু কৃষি আমাদের স্বস্তির জায়গা ছিল। কোনো খাদ্যাভাব দেখা যায়নি।
তাহলে আমাদের এত বিশাল অংকের খাদ্যশস্য আমদানি কেন? এমনকি পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচের মতো জিনিসও আমদানি করছি কেন?
আমরা যে পরিমাণ প্রাথমিক কৃষিপণ্য আমদানি করি এমন দেশ কম। ভারত কিংবা শ্রীলংকাও না। নেপাল কিছু গম আমদানি করে কিন্তু আমাদের মতো তেল, গুঁড়া দুধ বা মসলা, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনিসহ সব আমদানি করে না। খাদ্যনিরাপত্তার অনেক দিক আছে। খাদ্যের প্রাপ্তি, সরবরাহ ও ব্যবহার—সব মিলেই খাদ্যনিরাপত্তা। কিন্তু আমাদের সরবরাহে ঘাটতি আছে। উৎপাদনের তথ্যটি নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। এই কাজটি যথাযথভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোই (বিবিএস) করতে পারে। কারণ বিবিএসই আইনগতভাবে তথ্যের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। যারা উৎপাদন করে তাদের তথ্য অনেক সময় প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে যায়। কারণ চাহিদা ও সরবরাহের হিসাবে মিলে না। যেমন—পেঁয়াজের কথা বলা যায়। প্রত্যেক বছর আমাদের পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। যখন পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা কেজি হয়েছিল, সেবার বলা হয়েছিল, আমাদের উৎপাদন ২৪ লাখ টন হতে যাচ্ছে। সবাই ধরে নিয়েছিল, আমাদের মোটামুটি পেঁয়াজ উৎপাদন ভালো হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা আমদানির পরিকল্পনা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু সেবার ১৮ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল। যখন হুহু করে দাম বেড়ে গেল। ১৫০-২০০ টাকা পেঁয়াজের কেজি হলো তখন চতুর্দিকে হইচই পড়ে যায়। বিদেশ থেকে তড়িঘড়ি করে আমদানি করে কোনোভাবে মুখ রক্ষার চেষ্টা হয়েছিল। উৎপাদন ও চাহিদা নিয়ে আগাম কথা বলার কারণে বাজারে এ রকম অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল।
সেজন্য আমি মনে করি, ভোক্তা, ব্যবসায়ী বা দেশবাসীর সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। এক্ষেত্রে বিবিএস তথ্য তৈরি করার সময় উৎপাদনের তথ্য যাদের কাছ থেকে নেয় তাদের দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করবে। তা না হলে তথ্যের এ রকম হেরফের হতে থাকবে। প্রকৃত পক্ষে আমাদের হয়তো ২৭-২৮ লাখ টন পেঁয়াজ প্রয়োজন। আমরা হয়তো সর্বোচ্চ ২০ লাখ টন উৎপাদন করি। ভালো উৎপাদন হলেও ছয়-সাত লাখ টনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এ রকমভাবে চাল, পেঁয়াজসহ রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসলা সবই তো আমদানি করছি। প্রাথমিক কৃষি পণ্যের বড় অংকের এ ঘাটতি পৃথিবীতে খুবই কম দেশে আছে। এই আমদানিনির্ভরতা কৃষি পণ্যের মূল্য অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
অনেকেই বলছেন, চালের উৎপাদনের ওপর অতি মনোযোগের কারণে অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে জোর দিতে পারছি না। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?
চালের ওপর জোর দেয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে আমরা খাদ্য সমস্যায় পড়েছিলাম। সেই থেকেই খাদ্য উৎপাদনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো চাল। কারণ চাল থাকলে লবণ-মরিচ দিয়েও খেতে পারে। অর্থাৎ চাল মৌলিক পণ্য হওয়ায় শুরু থেকেই এর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে পরবর্তী প্রায় সব সরকারই এটা বহাল রেখেছে। চাল রাজনৈতিক পণ্য। দেশে এ পণ্যের সংকট হলে অনেক মূল্য দিতে হয়। সে হিসেবে সব সরকারই খাদ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার কৃষির জন্য অনেক বেশি প্রতিশ্রুত। তবে এর জন্য অন্য ফসল উৎপাদন কমে গেছে, তা নয়। আমাদের জমি-জমা যেগুলো রয়েছে, চাইলেই সব জায়গায় ধান উৎপাদন করা যায় না। ধান উৎপাদনে কিছু নির্দিষ্ট জমি আছে। আর কিছু জমি আছে যেখানে ধান কিংবা পাট উৎপাদন করা যায়। কিছু কিছু জমি আছে যেগুলো কেবল নির্দিষ্ট শস্য উৎপাদনে উপযুক্ত।
সবুজ বিপ্লব আসার পর কিছু রবিশস্য বাদ দিয়ে নতুন বোরো চালু হলো। যেখানে যেখানে ধান করা সম্ভব সেখানে ধান উৎপাদনের চেষ্টা হয়েছে। তবে সমানতালে অন্যান্য ফসলও উৎপাদিত হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিষয় হলো, সব ফসল সব জমিতে করা যায় না। যেমন—পেঁয়াজ সব জমিতে করা যায় না। কিছু নির্দিষ্ট জমি নির্দিষ্ট ফসলের জন্য উপযুক্ত। এখন ডালের দাম যদি ৫০০ টাকা কেজিও হয় এর উৎপাদন রাতারাতি বাড়িয়ে দেয়া যাবে তা কিন্তু নয়। যে জমিতে ডাল উৎপাদন করা হবে তা ডালের উপযোগী জমি হতে হবে। বিলের কোনো জমিতে ডাল হবে না, মধ্যম উঁচু বা কান্দা জমি লাগবে। একইভাবে যেখানে চীনাবাদাম হবে, সেখানে আবার ডাল হবে না। তবে চালের কারণে অন্যান্য ফসল উৎপাদন কমে গেছে এমনটা মনে করি না।
আমাদের গম উৎপাদন তো অনেক কমেছে। একসময় প্রায় ২০ লাখ টন উৎপাদন হলেও এখন ১০ লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে কেন? ইউক্রেন যুদ্ধ কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছে আমদানিনির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
জনবহুল দেশ হিসেবে আমাদের ঝুঁকিটা থেকে যাবে যদি না বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসি। কৃষিপণ্যের উৎপাদন না বাড়াতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যা হবে। আবার আমরা চাইলেই কিন্তু কৃষিজমি বাড়াতে পারব না। এটা সত্য একসময়ে ভালো গম উৎপাদন হলেও এখন এর উৎপাদন কমেছে। গমের জমিতে এখন বোরো হচ্ছে, ভুট্টা হচ্ছে। আগের যে দেশীয় বোরো জাত ছিল তা হতো জলাভূমিতে। এখন বোরো একটু উঁচু জমিতে হয়। এছাড়া গম শীতকালীন ফসল। ফুল আসার পর যদি গরম পড়ে তাহলে গম নষ্ট হয়ে যায়। গম কিন্তু আমাদের স্থানীয় পণ্য নয়, আমরা বিদেশ থেকে এটা এনেছি। আবার শাকসবজির দাম বৃদ্ধিতে অনেক ধানি জমিতেও কিন্তু শাকসবজি চাষ হচ্ছে। কেউ কেউ ধানের জমিতে ড্রাগন ফল, আম, কাঁঠাল, লটকন চাষ করছে।
উচ্চমূল্যের ফসল চাষে যদি জমি ব্যবহার করা হয় তবে আয় বাড়বে। এই বিষয়টাও দেখতে হবে। এটা আটকে রাখা যাবে না। যেহেতু গমের জমির প্রাপ্যতা সীমিত, ধানের জমির প্রাপ্যতা সীমিত, সেহেতু প্রযোজনে আমদানি করতে হবে। তবে প্রযুক্তি বিপ্লব, ন্যানো টেকনোলজির মাধ্যমে প্রতিটি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। আবহাওয়ানির্ভর ফসল থেকে বের হতে হবে। একই জমিতে কয়েক স্তরে ফসল ফলাতে হবে। বাণিজ্যিক কৃষিতে যেতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে, পুঁজিপতিদের এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশ হচ্ছে। পরিবারভিত্তিক বা খোরপোশনির্ভর কৃষি অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
আগে আমরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছি, দেশের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ কৃষক। কিন্তু বর্তমানে গ্রামে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে আগে যারা উৎপাদক ছিল তারা এখন ভোক্তায় পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশের আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস ও অন্যান্য দেশের তুলনায় কৃষিতে উৎপাদন হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় কী?
অনিয়ন্ত্রিতভাবে বসতবাড়ি নির্মাণের ওপর এখনো আমাদের দেশে কোনো নিয়ম নির্ধারণ করা হয়নি। যে যেখানে খুশি মাটি ফেলে ভরাট করে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে ফেলছে। এটি অতীব দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। গ্রামগুলোয় পরিকল্পিত উপায়ে একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন প্রয়োজন। যেমন—শহরে বাড়িঘর নির্মাণে অনুমতি নিতে হয়, নকশা পাস করাতে হয়, নানা রকম বিধিমালা মানতে হয়। ঠিক প্রতিটি গ্রামের জন্যও এখন এ রকম নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে। সেটি না করা হলে আরো কৃষিজমি নষ্ট হবে। একটা পর্যায়ে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া দুষ্কর হবে। সেজন্য যত্রতত্র বাড়িঘর না তুলে গ্রামেও উলম্বভাবে ভবন নির্মাণ করতে হবে, দুইতলার জায়গায় চারতলা করতে হবে। বারবার বসতবাড়ি পাল্টানো যাবে না, যেখানে বাড়ি আছে সেখানেই নতুন করে মেরামত বা ভবন তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশে জনসংখ্যা সবসময়ই বিশাল সমস্যা, এখনো প্রতি বছর প্রায় ২০-২২ লাখ লোক যুক্ত হচ্ছে খাদ্য চাহিদায়। এই লোকগুলোর খাদ্যের জোগান দিনকে দিন আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
আমাদের আরেকটি প্রতিবন্ধকতার জায়গা বা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আরবানাইজেশন বা নগরায়ণ। কয়েক দশকের মধ্যেই এ দেশের ৪৫ বা ৫০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। এ রকম নগরায়ণের দিক মাথায় রেখে শহরকেন্দ্রিক কী কী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়?
রূপকল্প-৪১ অনুযায়ী ২০৪১ সালের পর ৬০ শতাংশ মানুষ শহরবাসী হবে। অর্থাৎ মানুষ শুধু প্রতিষ্ঠিত শহরগুলোতেই আসবে না, একই সঙ্গে গ্রামগুলোও শহরের মতো হবে। এখনই অধিকাংশ গ্রামে-শহুরে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন—বিদ্যুৎ, স্যাটেলাইট টিভি, এসির ব্যবহার। নগরায়ণ এখন আর শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়।
শহরকেন্দ্রিক কৃষি নিয়ে ভাবনার পরিসর রয়েছে। ছাদে তৈরি বাগান এই ধরনের উৎপাদনের মূল স্থান। ছাদে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে শাকসবজি, নানা জাতের ফলমূলের ভালো ফলন হতে পারে, কিন্তু আমাদের ছাদকৃষির মূল সমস্যাটা হলো এখানে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু যতক্ষণ না এ ধরনের উৎপাদন পদ্ধতিতে আমরা ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত ছাদকৃষিকে উৎসাহিত করা ভয়ংকর। শহরের পানির স্তর এমনিতেই বছরে দুই-তিন মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে, সেরূপ পরিস্থিতিতে এ ধরনের কৃষিকাজ আরেকটা বিপর্যয় টেনে আনবে। কাজেই ছাদকৃষি নিয়ে পরিকল্পনার আগে আমাদের প্রয়োজন যথাযথ উপায়ে পানির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেয়া, যেখানে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করতে হবে কিংবা ‘গ্রে-ওয়াটার’ বা ধোয়ামোছার কাজে ব্যবহৃত কিন্তু দূষিত নয় এমন পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সে রকম ব্যবস্থা তো গ্রহণ করা হচ্ছে না। সেজন্য সরবরাহের পানির ওপরই শহরভিত্তিক ছাদকৃষি নির্ভরশীল, যেটা যথাযথ উপায় তো নয়ই অধিকন্তু ভবিষ্যতে ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ হবে। এর চেয়ে বরং শহরের অসংখ্য ছাদ ব্যবহার করে সোলার প্যানেল নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে, যা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের একটা বিরাট উৎস হবে। বিকল্প কৃষি হিসেবে ছাদকৃষি নিয়ে চিন্তা করার পূর্বশর্তই হলো আমাদের হাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বা ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পদ্ধতি সহজলভ্য করা। এই দিকটাই এখন সর্বপ্রথম বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জমিতে আমাদের কৃষি উৎপাদন সমমানের অনেক দেশের তুলনায় কম। আমরা কেন কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পারছি না?
আমরা কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে ধানকেন্দ্রিক অর্থনীতি হওয়ার কারণে নতুন নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন ও উৎপাদন গুরুত্ব পেয়েছে। এজন্য অন্যান্য ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা তুলনামূলক কিছুটা পিছিয়ে। এমনকি ধানের উৎপাদনেও আমরা কিছু কৃষিপ্রধান দেশের থেকে পিছিয়ে। উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা বলা যায়, ওরা যেখানে হেক্টরপ্রতি সাড়ে পাঁচ টন ধান উৎপাদন করে আমরা সেখানে চার থেকে সাড়ে চার টন ধান উৎপাদন করি। তার মানে দক্ষতার দিক থেকে আমরা ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে। কাজেই এখানেও আমাদের আরো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি গবেষণায় অনেক বেশি জোর প্রদান করতে হবে; প্রায়োগিক কৃষি বা সমস্যা সমাধানমূলক কৃষি নিয়ে কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে; কৃষি উৎপাদনে খরচ কমানোর পদ্ধতিগুলোর উন্নয়ন করতে হবে; উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।
মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ফসল উৎপাদনে কৃষকের খরচ কমানোর প্রতিও আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় ভর্তুকির ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষি ব্যবস্থাপনা, উন্নতমানের ফসলের জাত ব্যবহার করে যাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা যায় সেসব নিয়ে কাজ করার পরিসর আরো বাড়াতে হবে। সর্বোপরি বলা যায়, কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আমরা এই মূল্যস্ফীতিকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।
কৃষিকে লাভজনক এবং কৃষির শিল্পায়নে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। সেক্ষেত্রে আমাদের চ্যালেঞ্জের জায়গা কোথায়?
কোনো দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, কৃষির বৈচিত্রায়ণ হয়েছে তা সত্ত্বেও আমরা অন্যান্য দেশের চেয়ে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতায় পিছিয়ে যা আগেই উল্লেখ করেছি। শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে হলে কৃষিতে যথেষ্ট উদ্বৃত্ত পণ্য থাকতে হবে। নানা ফসল, শাক-সবজি, মৎস্যসম্পদ, ডেইরি, অর্থকরী শস্যে আমাদের উদ্বৃত্ত থাকতে হবে তাহলে সেসব থেকে প্রক্রিয়াজাত করে শিল্পায়িত পণ্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এখনো এসব কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণে পিছিয়ে আছি। একটি উদাহরণ দিই, যেমন—আমাদের নিকটবর্তী দেশ থাইল্যান্ডে ‘আম’-কে এমনভাবে ভ্যাকুয়াম ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে প্রক্রিয়াকরণ করা হয় যেটা পরবর্তী ছয় মাস বা আরো সময় পর পানিতে দিলে আবার আগের তাজা আমের চেহারা ফিরে পায়। অর্থাৎ সারা বছরই তারা আমটা খেতে পারে। এভাবে নানা রকম ফল তারা সংরক্ষণ করে সারা বছর বাজারে জোগান দিতে পারে। এ রকম ব্যবস্থা আমাদের নেই। কৃষিপণ্যকে শিল্পপণ্যে রূপান্তরিত করার জন্য প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মৌসুমি ফলগুলোকে যদি এমন কোনো ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হতো তাহলে সারা বছরই সেগুলো বাজারে সহজলভ্য থাকত। এতে পুষ্টিচাহিদা মেটার পাশাপাশি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবেও দেশের অর্থনীতিতে এসব ফলমূল অধিক ভূমিকা রাখত।
কাজেই আমাদের শিল্প নীতিতে প্রক্রিয়াকরণের ওপর বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিশেষ করসুবিধা বা ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তাছাড়াও খাদ্য প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করার জন্য এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কিত শিল্পে উন্নত দেশগুলোয় পাঠিয়ে উন্নত ধারণা গ্রহণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও সরকারিভাবে করতে হবে। রফতানিযোগ্য কৃষির প্রধান শর্তই হলো প্রক্রিয়াকরণ করা। আমাদের কৃষিপণ্যনির্ভর শিল্পকে এখন ‘রেডি টু কুক’ ফুডনির্ভর প্রক্রিয়াকরণে যেতে হবে। সেজন্য শাক-সবজি, ফলমূলকে অবশ্যই প্রস্তুতকৃত ‘প্যাকেটজাত’ বা ‘মোড়কজাত’ খাদ্যপণ্যে রূপান্তরিত করার শিল্প স্থাপন ও বিপণনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে বৈচিত্রায়নে ও মানের নিশ্চয়তায় গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। আমাদের দেশে ভোগবাদের বিকাশ ঘটায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু প্রক্রিয়াকরণ করা পণ্য নিয়ে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও সন্দেহ আছে। যেমন—পাস্তুরিত দুধ, জ্যাম-জেলি, মসলা ইত্যাদির মান ও খাঁটিত্ব নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন থাকে। সেক্ষেত্রে এই মান নির্ধারণে আমাদের আরো সচেতন হবে। সর্বোপরি এ জায়গাটিতে এখনো আমাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা দুই-ই রয়েছে।
যে মানের জায়গাটি নিয়ে আপনি বলছেন তা নিশ্চিত করতে বিএসটিআইয়ের ভূমিকা রয়েছে। সংস্থাটি ভোক্তাদের আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেনি কেন?
শুধু বিএসটিআই নয়, বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপরই জনগণের আস্থার অভাব রয়েছে। তাদের প্রচার-প্রচারণায়ও ঘাটতি রয়েছে। পেশাদারত্বের জায়গাটির অভাব প্রায় ক্ষেত্রেই। এখন যেহেতু মানুষের আয় বেড়েছে তাই বাংলাদেশে বিশাল একটি ভেক্তাশ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে। সুতরাং দেশে প্রক্রিয়াকরণ পণ্যের বড় বাজারও সৃষ্টি হয়েছে। তারা মান সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। মূলত এই নিরীক্ষণ গোষ্ঠীই এখন পারে এ আস্থার জায়গাটি তৈরি করতে, ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বেশি দায়বদ্ধ ও দক্ষ হয়ে উঠতে বাধ্য হবে। এর বাইরে গুণগত মান নিশ্চিতকরণে কর্তৃপক্ষেরও আরো সচেতন হতে হবে। এখানে বিএসটিআই ছাড়াও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ দাম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গঠিত নানা কমিশনের দায়িত্বশীলতার জায়গাটিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে অংশগ্রহণকারী এই বিশাল ভোক্তাশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এখন বাজারে যথাযথ মূল্যে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ বর্তমানে সময়ের দাবি।
কৃষি উৎপাদন ক্ষমতায় আমরা যেমন পিছিয়ে, তার চেয়েও আমরা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণে আরো বেশি পিছিয়ে। এর একটি প্রধান কারণ বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব। তাই এ আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটি খুবই প্রয়োজনীয় যে দেশীয় বাজারে দেশীয় শিল্পে উৎপাদিত এসব প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য সবই খাদ্যোপযোগী এবং স্বাস্থ্যসম্মত। এ বিশ্বাসের জায়গাটি গড়ে তুলতে পারলে বাজারে বিদ্যমান বিশাল চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চাহিদা আরো বর্ধিত হবে এবং পাশাপাশি আমরা আমাদের দেশের উৎপাদিত এসব কৃষিপণ্যকে শিল্পপণ্যে পরিণত করে রফতানিও করতে পারব।