বিশ্ব পরিবেশ দিবস

প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি প্লাস্টিক দূষণ

চলতি বছর ৫ জুন সরকারি ছুটি থাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় আজ বুধবার বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৫’ পালিত হচ্ছে।

চলতি বছর ৫ জুন সরকারি ছুটি থাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় আজ বুধবার বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৫’ পালিত হচ্ছে। ‘প্লাস্টিক দূষণ আর নয়, বন্ধ করার এখনই সময়’ স্লোগানে পালন হচ্ছে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ ভয়াবহ মাত্রা ধারণ করেছে। ফেলে দেয়া বা ব্যবহার করা প্লাস্টিক থেকে বেশ ভালো মাত্রায় দূষণ ছড়ায়। এটি সাধারণত মাটির সঙ্গে মেশে না। প্লাস্টিকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যান্সার, কিডনির জটিলতা, উচ্চরক্তচাপসহ নানা ধরনের ব্যাধির অন্যতম কারণ প্লাস্টিক। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে জৈব পচনশীল পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পঞ্চশের দশকে সাশ্রয়ী ও টেকসই হিসেবে প্লাস্টিক বিশ্বজুড়ে শিল্প, কৃষি, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়। কিন্তু কৃত্রিম এ বস্তু যখন বিপুল হারে উৎপাদিত হয়ে ব্যবহারের পর ব্যবস্থাহীনভাবে পরিবেশে মিশতে থাকে, তখন সেটি এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেয়। প্লাস্টিক এখন শুধু শহরের ড্রেন বা সাগরের পাড়েই নয়, মানুষের খাদ্যচক্রে, এমনকি রক্ত ও হৃৎপিণ্ডে জায়গা করে নিচ্ছে। ২০২৫ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) তাই ‘প্লাস্টিক দূষণ আর নয়’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আহ্বান জানিয়েছে, তা নিছক প্রতীকী কোনো আয়োজন নয়, বরং এটি সময়ের এক কঠিন বাস্তবতা।

বিগত কয়েক দশকে বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন বেড়েছে কয়েকশ গুণ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৪৩০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন করা হচ্ছে, যার মধ্যে ২৮০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য। বাংলাদেশে দৈনিক সংগৃহীত ৬ হাজার ৪৬৪ টন বর্জ্যের মধ্যে ১০ শতাংশ হলো প্লাস্টিক (৬৪৬ টন দৈনিক)। প্লাস্টিকের বিরাট অংশই শেষ পর্যন্ত জমা হয় পরিবেশে—নদী, সাগর, বন কিংবা উন্মুক্ত জমিতে—যেখানে তা শত শত বছর অবিকৃত অবস্থায় থেকে যায়। প্লাস্টিকজাতীয় পণ্য কখনো পচে না, যার কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এসব প্লাস্টিক ক্ষয়ে ক্ষয়ে পরিণত হয় মাইক্রোপ্লাস্টিকে এবং তা সহজেই জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে এবং খাদ্যচক্র পেরিয়ে মানুষের শরীরেও ঢুকে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে এটি বাতাসে ভেসে দূরবর্তী এলাকায় চলে যেতে পারে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া আকারে ছোট হওয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের পৃষ্ঠে ধাতু, অ্যান্টি-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ সহজে আটকে যেতে পারে, যা পরিবেশে এ ক্ষুদ্র কণাগুলোর প্রভাবকে আরো মারাত্মক করে তুলছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ তাই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ, যেমন থ্যালেট, পলিব্রোমিনেটেড ডাইফিনাইল এস্টার ও বিসফেনলে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এসব রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে প্রজনন, স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন ও জেনেটিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এদিকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণও ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। মিঠাপানির জলাশয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যাপকভাবে উপস্থিতি এবং মাছ ও উভচর প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, একে খাবারের মতো ভুল করে খেয়ে নিচ্ছে, যা তাদের জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর অন্তত ১০ লাখ সামুদ্রিক পাখি এবং এক লাখ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে বা প্লাস্টিকে জড়িয়ে মারা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের তলদেশ ও উপরিভাগ প্লাস্টিক দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করছে প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যাগ। বর্তমানে সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি তিনটি মাছের মধ্যে একটির পেটে প্লাস্টিক দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মাছ, লবণ এমনকি শাকসবজিতেও পাওয়া যাচ্ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

প্লাস্টিক ড্রেন, খাল, নদীতে জমা হয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত করে এবং বন্যা বা জলাবদ্ধতার জন্যও দায়ী। স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। একই সঙ্গে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও প্রশাসনের নাকের ডগায়ই সবকিছু চলছে প্রকাশ্যে। আইনের বাস্তবায়নের অভাবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। পরিবেশ দূষণ রোধে প্লাস্টিকের বেআইনি উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করা হলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও মৌসুমি অভিযানে পলিথিন ব্যাগ জব্দ ও জরিমানা করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এসব পণ্য আমদানি, ব্যবহার বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে। তাছাড়া অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও মানুষ প্রতিদিনই এ দূষণে অবদান রাখছে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রাকৃতিক পলিমারের মাধ্যমে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে। দেশে পাট, বাঁশসহ নানা প্রাকৃতিক ফাইবার ব্যবহারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল, তবে এক্ষেত্রে পরিকল্পিত গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

দেশের সুনীল অর্থনীতির প্রাকৃতিক সম্পদ বঙ্গোপসাগর আজ প্লাস্টিক দূষণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। ভারত ও নেপাল থেকে উৎসারিত হওয়া অর্ধশতাধিক নদী এ দেশের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এসব নদী উজানের দেশগুলো এবং বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য বহন করে নিয়ত বঙ্গোপসাগরকে বিপন্ন করে তুলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আঞ্চলিক উদ্যোগ জরুরি।

প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে আনতে হলে বাজারে পাট, বাঁশ বা কাপড়ের তৈরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। পাতলা পলিথিন বর্জন করা দরকার। দুধ-পানীয় কাচের বোতলে বাজারজাত করতে হবে। সিটি করপোরেশনকে প্রতিটি বাড়ি থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সংকট মোকাবেলায় নাগরিক সমাজ, সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং উৎপাদনকারীদের সম্মিলিত উদ্যোগই একমাত্র পথ।

শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি পরিবেশ ভালো থাকে, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে বলে আশা করা যায়। ফলে মানুষ ফুসফুসের বিভিন্ন জটিল রোগ থেকে মুক্তি পাবে। সুস্থ পরিবেশ গড়ার জন্য জরুরি পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। পরিবেশ বাঁচানোর প্রথম পদক্ষেপ আমাদেরই নিতে হবে। প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষরোপণ করে সামাজিক বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। এছাড়া বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফাংশনাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন করে বর্জ্য বা আবর্জনাকে দ্রুত পচনশীল করার মাধ্যমে সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা যেতে পারে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য যে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত কয়েকটি শহরের মধ্যে অন্যতম ঢাকা। ঘর থেকে বের হলেই আমাদের মুখোমুখি হতে হয় ভয়ানক ক্ষতিকর পরিবেশের সঙ্গে। এ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য শিল্প-কারখানাই বেশি দায়ী। এছাড়া বিজ্ঞানীরা আটটি শীর্ষ কার্বন নির্গমনকারী খাত চিহ্নিত করেছেন, যা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কারণ প্লাস্টিকের ব্যাগ শতকরা ১০০ ভাগই কৃত্রিম পলিথিনের, যা তৈরি হয় অপরিশোধিত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। এগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে অন্তত ৫০০-৬০০ বছর সময় লাগবে, যা মানবজীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি প্লাস্টিক দূষণ। তাই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য হলেও এ দূষণ থেকে নিজেদের ও দেশকে রক্ষা করতে হবে।

আরও