ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন আসছে, তেমনি সমাজের দুর্বল অংশকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্বও বাড়ছে সরকারের। এ লক্ষ্যেই প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা; মোট জাতীয় বাজেটের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫২ শতাংশের কাছাকাছি। এ বিপুল অর্থ মূলত দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও সামাজিকভাবে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। যখন সরকারের ভর্তুকি দেয়া চাল বা পণ্য প্রকৃত অভাবীর কাছে না পৌঁছে ভুয়া অভাবীর হাতে চলে যায়, তখন খাদ্যনিরাপত্তা শব্দটিই হয়ে ওঠে নিছক উপহাস। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ সংকটের শিকড় শুধু ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গভীরেও প্রোথিত। দুর্নীতির জাল এতটাই বিস্তৃত যে এর কারণে সরকারি অর্থের একটি বিশাল অংশ অপচয় হচ্ছে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদ পোর্টাল এবং সাম্প্রতিক জরিপ ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। এর মূল কারণ হলো যাচাই-বাছাইয়ের অসংগতি, তথ্যপ্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং জবাবদিহিতার চরম অভাব। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর প্রায় ৪৩ শতাংশ সুবিধাভোগীই প্রকৃত অর্থে অযোগ্য। ইউনিসেফ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপে উঠে এসেছে যে বয়স্ক ভাতার ৩০ শতাংশের বেশি এবং বিধবা ভাতার ৩৩ শতাংশের মতো সুবিধাভোগী এ ভাতার জন্য অনুপযুক্ত। অর্থাৎ যাদের জন্য এ অর্থ বরাদ্দ, তাদের একটি বড় অংশই এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতার মতো সংবেদনশীল কর্মসূচিগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি ব্যবহার করে তালিকা তৈরির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। পাবনার চরতারাপুর ইউনিয়নে একজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে মৃত ব্যক্তির নামে ভাতা উত্তোলনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে স্থানীয়রা বলছেন, অনেক প্রকৃত দরিদ্র মানুষই বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায়। ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে প্রতিবন্ধী নন এমন ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ভাতা গ্রহণ চরম অনিয়মের উদাহরণ। গাইবান্ধার সাঘাটা এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এমন ঘটনা ধরা পড়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং স্থানীয় প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
মাতৃত্বকালীন ভাতা, যা দরিদ্র মায়েদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা, সেখানেও ঘুস ও স্বজনপ্রীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্র মায়েরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০২২ সালে মাদারীপুরে এ ধরনের অভিযোগগুলো স্থানীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে ভিজিডি ও ভিজিএফ কর্মসূচিতেও অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ কম নয়। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ভিজিডি কার্ড বিতরণে ঘুস নেয়া ও রাজনৈতিক প্রভাবের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। নড়াইলে বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাতের অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাও প্রমাণ করে কীভাবে গরিবের হক মেরে নিজের পকেট ভারী করছেন কিছু জনপ্রতিনিধি। এমনকি দেশের সূর্যসন্তানদের জন্য বরাদ্দ মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা আত্মসাতের ঘটনাও নজর এড়িয়ে যায়নি। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এমন অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানের শামিল। সম্প্রতি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায়ও টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড, যা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার কথা, সেখানেও ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। এ কার্ডগুলো বহুক্ষেত্রে সচ্ছল ব্যক্তিদের হাতে চলে যাচ্ছে, এমনকি পাঁচ-সাততলা বাড়ির মালিকরাও এর সুবিধা নিচ্ছেন। কার্ড বিতরণের প্রাথমিক তালিকা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় স্বজনপ্রীতি ও দলীয় বিবেচনা এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ডিলারদের বিরুদ্ধেও নির্ধারিত পরিমাণে পণ্য না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যায়।
এ ব্যাপক দুর্নীতির মূলে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক দুর্বলতা। প্রথমত, দুর্বল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং তথ্যের গোপনীয়তা দুর্নীতিবাজদের সুযোগ করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার চরম অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন, যা ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব এ সমস্যাকে আরো গভীর করেছে। অনেক সময় দালাল ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা সরকারি সুবিধা নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের স্বার্থে তা বিকৃত করেন। এছাড়া স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর ও অসহায় সুবিধাভোগীরা সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, বিশেষত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ভাতা বিতরণে পিন জালিয়াতি ও তথ্যের অপব্যবহারের ঘটনা বেড়েছে।
দুর্নীতির এ দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। শুধু বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো বা নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কঠোর বাস্তবায়ন এবং সকল স্তরে ডিজিটাল নজরদারি। এর জন্য প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানাভিত্তিক সরকারি ওয়েবসাইটে কার্ডধারী ও তাদের পণ্য বিতরণের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক। শুধু নাম নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, পরিবারের আয়সহ পণ্যের পরিমাণ ও বিতরণ কেন্দ্রসহ সব তথ্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এতে নাগরিক নজরদারি বাড়বে এবং কোনো অনিয়ম দ্রুত ধরা পড়লে অনিয়মকারীরা ভয় পাবে।
একটি সহজ ও কার্যকর অভিযোগ চ্যানেল স্থাপন করাও অত্যন্ত জরুরি। মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব ফরমের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি যেন সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন—তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগকারীর গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। টিসিবি পণ্য বিতরণে মোবাইলভিত্তিক ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) যাচাইকরণ চালু করলে কার্ডের অপব্যবহার বন্ধ হবে। কার্ডধারীর মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হবে এবং এটি ছাড়া কেউ পণ্য নিতে পারবে না। একইভাবে গুদাম থেকে বিতরণ কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করলে পণ্য চুরি বা কালোবাজারে বিক্রি অনেকাংশে কমে আসবে। সব শেষে কার্ডধারীদের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি এবং তাদের অধিকার-কর্তব্য বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লে তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘সোশ্যাল মনিটর’ হিসেবে কাজ করতে পারবে এবং তাদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হতে পারবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জীবন রক্ষাকারী এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণ যত বড়ই হোক, তা সঠিকভাবে কাজে না লাগলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। দুর্নীতির এ ভয়াবহ চিত্র স্পষ্টতই আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ম্লান করে দিচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। সরকার, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন। তাই দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। নীরবতা নয়, সক্রিয়তা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমেই আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারব এবং সবার জন্য ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে পারব।
আকরাম হুসাইন: সাবেক ডাকসু নেতা ও প্রধান সমন্বয়কারী, ঢাকা মহানগর উত্তর, জাতীয় নাগরিক পার্টি