কিন্তু এ পর্যন্ত এসব লক্ষ্যপূরণে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকটি; প্রত্যাশামাফিক প্রবাসীবান্ধব হতে পারেনি। সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, নিজস্ব ব্যবস্থায় রেমিট্যান্স দেশে আনয়নের যে লক্ষ্য নিয়ে ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করে, আজ পর্যন্ত সেই সক্ষমতাও অর্জন করতে পারেনি। নিজস্ব অথরাইজড ডিলার লাইসেন্স, পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অবকাঠামো কিংবা আধুনিক কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আনতেও অন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থাৎ যে কারণে বিশেষায়িত হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, সেটিই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে।
অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি, ঘুসের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক তদবিরে ঋণ অনুমোদন, অর্থ আত্মসাৎ এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্তমানে এ ব্যাংকের ৬১ শতাংশ ঋণ খেলাপির খাতায়। এর কারণ অনুসন্ধানে গেলে শুরুতেই সুশাসনের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির অভাব এবং দুর্বল সুশাসনের প্রতিফলন। বিভিন্ন শাখায় ভুয়া ঋণ সৃষ্টি, গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ, ঘুসের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক সুপারিশে ঋণ অনুমোদন এবং নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ দেখায় যে সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক। যখন একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ব্যাংকটি গ্রাহকের আস্থা হারায়।
অবশ্য কেবল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নয়, দেশের পুরো ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি বর্তমানে এমনই। যে কারণে দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিতরণকৃত ঋণের ৩২ শতাংশের ওপরে বর্তমানে খেলাপি। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পাশাপাশি পুরো ব্যাংক খাত কাঠামোগত সংস্কারের আওতায় আনা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন মূলধনের জোগান দেয়া হয়েছিল প্রবাসীদের অর্থ থেকেই। যে কারণে এ ব্যাংকের ঝুঁকিতে থাকার অর্থ হলো প্রবাসীরা ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আবার সরকারও এখানে মূলধন জোগান দিয়েছিল, যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার যদি ব্যাংকটির কাঠামোগত সংস্কার না করে মূলধন জোগান দিতে থাকে তা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অপচয়ই হবে। সরকারি সহায়তা তখনই কার্যকর হবে যখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা হবে। অন্যথায় নতুন করে মূলধন বা প্রণোদনা দেয়া কেবল পুরনো অদক্ষতা ও দুর্নীতির ক্ষত সারিয়ে তুলতেই ব্যয় হয়ে যাবে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যাহত রয়ে যাবে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো, ব্যাংকটির পরিচালন ব্যবস্থা ও ঋণ ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পেশাদার ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করা। সব পরিচালনা পর্ষদে ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ও স্বাধীন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনার পরিবর্তে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঋণ অনুমোদন, তদারকি ও আদায়ের প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কঠোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতীতে যেসব কর্মকর্তা ও গ্রাহক জালিয়াতি, আত্মসাৎ কিংবা ঘুসের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তির নজির ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে তার মূল লক্ষ্যেও ফিরিয়ে আনতে হবে। বিদেশগামী কর্মীদের দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত ঋণসেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবসম্মত ঋণপণ্য চালুর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচিও প্রয়োজন। প্রকৃত প্রবাসী ও তাদের পরিবার যেন ব্যাংকের সেবা থেকে বাস্তব সুবিধা পান, সেটিই হতে হবে প্রতিষ্ঠানের সফলতার প্রধান মানদণ্ড।
একই সঙ্গে ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর অপরিহার্য। আধুনিক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার, অনলাইন ঋণ আবেদন, রিয়েল টাইম ঋণ পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল অডিট ট্রেইল, বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজের সঙ্গে পূর্ণ সংযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন দুর্নীতি ও জালিয়াতির সুযোগ কমাবে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স গ্রহণ ও গ্রাহকসেবার সক্ষমতাও বাড়াবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ব্যাংককে পুরোপুরি প্রবাসীবান্ধব হতে হবে। বহু মানুষ বিদেশে যাওয়ার আগে উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে দালালের শরণাপন্ন হন। অথচ তাদের সহজ শর্তে দ্রুততম সময়ে ঋণ দেয়ার জন্যই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুতরাং অভিবাসী কর্মীরা যেন দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্তভাবে ঋণ পান, বিদেশফেরত কর্মীরা যেন পুনর্বাসনের সুযোগ পান এবং তাদের পরিবারের জন্য কার্যকর আর্থিক সেবা নিশ্চিত হয়—ব্যাংকের প্রতিটি নীতিতে সেই লক্ষ্যই প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রবাহ বাড়াতে অবদান রাখতে পারে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। তবে এ প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য বর্তমানে উদ্যোগ প্রয়োজন। সুশাসন, জবাবদিহি, পেশাদার পরিচালনার মাধ্যমে এর পুনর্গঠন করতে হবে।